
জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর মো. সোহাগ ইসলাম—যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'ভাতিজা' নামে সমধিক পরিচিত—রাজধানী ঢাকায় আত্মহত্যা করেছেন। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকার একটি বাসা থেকে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার সন্তান সোহাগ সোশ্যাল মিডিয়ায় কৌতুক ও বিনোদনমূলক কনটেন্ট তৈরি করে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ‘তালেব ভাইজান’-এর বিভিন্ন ভিডিওতে 'ভাতিজা' চরিত্রে নিয়মিত অভিনয় করতেন। পরবর্তীতে জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুর খবরে পরিবার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
রাজধানী ঢাকার নাগরিকদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনবহুল মেগাসিটির বায়ুদূষণ সূচক (একিউআই) সহনশীল মাত্রায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যৌথভাবে ১০ দফা বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম জোরদার করেছে। শীত ও শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে প্রতিবছর ধূলিকণা ও ধোঁয়ার বিপজ্জনক চাদরে ঢাকা পড়ে রাজধানী। এই চিরচেনা সংকট থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে এবার সমন্বিত ও বহু-সংস্থাগত এই অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের আওতায় প্রতিদিন ভোর ও বিকেলে আধুনিক হাই-ক্যাপাসিটি ওয়াটার বোসার ও সুইপার ট্রাকের মাধ্যমে ভিআইপি ও সংযোগ সড়কগুলোতে পানি ছিটানো হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সেন্ট্রাল এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং স্টেশনের সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরুর মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে ভাসমান সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম ২.৫ এবং পিএম ১০ এর উপস্থিতি প্রায় ২৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে সংসদ ভবন এলাকা, ধানমন্ডি, গুলশান ও মিরপুর করিডোরে বায়ুর মানে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাস্তার পাশের উন্মুক্ত নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে কঠোরভাবে ডাস্ট-নেট ও নিরাপত্তা শেড স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং আইন অমান্যকারী একাধিক রিয়েল এস্টেট কোম্পানিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস রাজধানীর চারপাশের অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। পরিবেশ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে বিষাক্ত কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী অর্ধশতাধিক ড্রাম চিমনি ও ফিক্সড চিমনি ইটভাটা সম্পূর্ণ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা মহানগরীতে চলাচলকারী মেয়াদোত্তীর্ণ, কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী গণপরিবহন ও ভারী ট্রাকের রুট পারমিট তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করছে বিআরটিএ-র যৌথ টাস্কফোর্স। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই তড়িৎ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানিয়েছেন। বাংলাদেশ বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সিনিয়র চিকিৎসকরা জানান, শুষ্ক মৌসুমে প্রতিবছর শ্বাসকষ্ট, ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি এবং শিশুদের নিউমোনিয়ার প্রকোপ মারাত্মক রূপ নেয়। বাতাসের মান উন্নত হওয়ায় হাসপাতালে এ বছর এ ধরনের রোগীর ভর্তির হার অতীতের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কম লক্ষ্য করা গেছে। চিকিৎসকরা নিয়মিত মাস্ক ব্যবহারের পাশাপাশি নগরীর বনায়ন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই কর্মসূচি কোনো সাময়িক অভিযান নয়; বরং পুরো বছরজুড়ে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রুটিন হিসেবে চলবে। নগরীর প্রধান সড়কগুলোর মিডিয়ান ও ফুটপাতে দূষণ-শোষণকারী চিরসবুজ গাছপালা রোপণ এবং লেকগুলো সংস্কারের মেগা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নগরবাসীকে সচেতন করতে প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিউনিটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা ঢাকাকে একটি পরিবেশবান্ধব, পরিচ্ছন্ন ও আন্তর্জাতিক মানের বসবাসযোগ্য রাজধানীতে রূপান্তর করতে ভূমিকা রাখবে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নদীগর্ভস্থ সুড়ঙ্গপথ 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্ণফুলী টানেল' কেবল বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার মানচিত্রকেই বদলে দেয়নি, বরং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সাথে আনোয়ারা এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক মেলবন্ধনে এক ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটিয়েছে। নদী দ্বারা বিভক্ত দুই ভূখণ্ডের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন চার লেনের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে এখন দেশি-বিদেশি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বিনিয়োগের মহোৎসব চলছে। সাংহাই শহরের আদলে গড়ে ওঠা 'ওয়ান সিটি টু টাউন' মডেল আজ চট্টগ্রামে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, আনোয়ারায় স্থাপিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দেশের শীর্ষ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত একর জমি বরাদ্দ নিয়েছে। সেখানে ইতোমধ্যে আধুনিক টেক্সটাইল ডায়িং ও ফিনিশিং প্ল্যান্ট, অটোমোবাইল ও মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলি কারখানা, হাই-টেক কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স এবং ফার্মাসিউটিক্যালস উৎপাদন ইউনিটের অবকাঠামো নির্মাণ পুরোদমে চলছে। টানেলের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি মাত্র ২০ মিনিটে এসব কারখানায় কাঁচামাল পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস হাউসের সাথে আনোয়ারার নতুন শিল্প করিডোরের ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশন সম্পন্ন হয়েছে। ফলে পণ্যবাহী কনটেইনারের চলাচল কোনোপ্রকার ট্রাফিক জটের মুখে পড়ছে না। এর আগে কর্ণফুলী সেতুর ওপর তীব্র যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হতো ভারী যানবাহনগুলোকে। এখন মাত্র ৩ থেকে ৪ মিনিটে নদীর তলদেশ দিয়ে সুড়ঙ্গ পাড়ি দিয়ে যানবাহনগুলো ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়কের সাথে যুক্ত হচ্ছে। এতে লজিস্টিকস ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ কমে এসেছে। স্থানীয় অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় এই প্রকল্পের গভীর ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আনোয়ারা, বাঁশখালী ও পটিয়ায় জমি ও আবাসন খাতে ব্যাপক গতি এসেছে। স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের জন্য আধুনিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে তারা আসন্ন শিল্প কারখানাগুলোতে দক্ষ টেকনিশিয়ান ও প্রকৌশলী হিসেবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্যাটারিং, পরিবহন এবং সাপোর্ট সার্ভিসে যুক্ত হয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্ণফুলী টানেল ও আনোয়ারা শিল্প করিডোরের পূর্ণ বিকাশ ঘটলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। ভবিষ্যতে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরের সাথে এই করিডোরটি পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হলে চট্টগ্রাম পুরো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারে পরিণত হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের শস্য-শ্যামল রূপ আর খালের জলরাশিকে ঘিরে গড়ে ওঠা শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পেয়ারা বাজারে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের মোহনায় অবস্থিত ভীমরুলীর খালের আঁকাবাঁকা জলপথে শত শত ডিঙি নৌকায় সাজানো থাকে থোকা থোকা টাটকা পেয়ারা। প্রকৃতির নয়নাভিরাম এই দৃশ্য অবলোকন করতে প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিদেশি পর্যটকরা ভিড় জমাচ্ছেন। পর্যটকদের আনাগোনায় জমে উঠেছে ফল বিক্রি, ট্রলার ভ্রমণ এবং গ্রামীণ সুস্বাদু খাবারের দোকানগুলো। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের তিন জেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে পেয়ারার আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার কারণে ফলন যেমন চমৎকার হয়েছে, তেমনি পেয়ারার আকার ও মিষ্টতা ক্রেতাদের মুগ্ধ করছে। প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত খালের বিভিন্ন ঘাটে কোটি টাকার পেয়ারা পাইকারি ও খুচরা কেনাবেচা হচ্ছে। স্থানীয় চাষিরা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি পাইকার ও পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য লাভ করছেন। পর্যটকদের নিরাপত্তায় এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও নৌ-পুলিশ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ভীমরুলীর প্রতিটি সংযোগ খালে লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে ট্রলারগুলোর জন্য নির্দিষ্ট চার্ট ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। নদীপাড়ের পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একাধিক অস্থায়ী ড্রাস্টবিন স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় অর্থনীতিতে এই ভাসমান বাজার গভীর প্রভাব ফেলছে। পেয়ারা চাষের পাশাপাশি এলাকার শত শত বেকার তরুণ পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করছেন এবং কাঠের নৌকা ও ট্রলার চালিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এছাড়া নারীরা তৈরি করছেন ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় কুটির শিল্প, নকশিকাঁথা এবং দেশীয় মিষ্টি সামগ্রী, যা পর্যটকরা সানন্দে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে গ্রাম্য অর্থনীতিতে এক বহুমুখী আর্থিক সঞ্চালন সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভীমরুলীকে আন্তর্জাতিক মানের এগ্রি-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। আধুনিক ভাসমান রেস্তোরাঁ, সুসজ্জিত ওয়াকওয়ে এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসোর্ট নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে, যা বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।
আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় আধুনিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যাঙ্গো পাল্পিং প্ল্যান্ট স্থাপনের ফলে ফলন পরবর্তী অপচয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে বাজারে আমের আকস্মিক জোগান বেড়ে যাওয়ায় পানির দরে আম বিক্রি করতে বাধ্য হতেন প্রান্তিক বাগান মালিকরা এবং অতিরিক্ত পেকে হাজার হাজার মেট্রিক টন সুস্বাদু আম পচে নষ্ট হতো। আধুনিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্লাস্টার গড়ে তোলায় সেই চিরচেনা লোকসানের চিত্র এখন লাভজনক বাণিজ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের যৌথ অর্থায়নে রাজশাহীর বাঘা ও চারঘাটে আধুনিক এয়ার-টাইট অ্যাসপটিক প্যাকেজিং ও সেন্ট্রিফিউগাল পাল্পিং ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এসব আধুনিক কারখানায় প্রতিদিন শত শত টন হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি আম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধুয়ে, খোসা ছাড়িয়ে এবং পাস্তুরায়ন করে পাল্প বা রসে রূপান্তর করা হচ্ছে। কোনো প্রকার রাসায়নিক প্রিজারভেটিভ ছাড়া এই পাল্প বিশেষায়িত স্টিল ব্যারেলে দুই বছর পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবিকৃত থাকে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এই ফ্রুট পাল্পের বিপুল চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় জুস ও বেভারেজ কোম্পানিগুলো এখন বিদেশ থেকে নিম্নমানের ঘন পাল্প আমদানি না করে সরাসরি রাজশাহীর কারখানাগুলো থেকে শতভাগ খাঁটি দেশীয় আমের নির্যাস সংগ্রহ করছে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক খাদ্য মেলাগুলোতে এই পাল্পের গুণগত মান ও ঘ্রাণ বিদেশি আমদানিকারকদের নজর কেড়েছে, যা প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিতে বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। আমচাষি ও উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, কোল্ড স্টোরেজ ও পাল্পিং কারখানার কারণে তারা এখন মৌসুমের যেকোনো সময় ন্যয্যমূল্যে আম বিক্রি করতে পারছেন। বিশেষ করে দেরিতে পাকা আশ্বিনা ও বারি জাতের আম আধুনিক কোল্ড স্টোরেজে বৈজ্ঞানিক উপায়ে দুই মাস পর্যন্ত সতেজ সংরক্ষণ করে আশ্বিন-কার্তিক মাসে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে বাগান মালিকদের বার্ষিক আয় প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলের এই সফল কৃষি রূপান্তর দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সরকার এই মডেলকে সারাদেশে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের সাধারণ নীতি হিসেবে গ্রহণ করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের কৃষকদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও সমৃদ্ধ ও সুদৃঢ় করবে।
সিলেট অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে ভারতের মেঘালয় ও আসাম থেকে নেমে আসা উজান ঢল এবং আকস্মিক ভয়াবহ বন্যার স্থায়ী ঝুঁকি কমাতে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ তলদেশের ক্যাপিটাল ড্রেজিং কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মেগা প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত এই ড্রেজিং কার্যক্রমে নদীর তলদেশের যুগ যুগ ধরে জমা পলি, বালু এবং কঠিন বর্জ্য সম্পূর্ণ অপসারণ করা হয়েছে। এর ফলে নদী দুটির জলধারণ ক্ষমতা এবং পানি নিষ্কাশনের গতি দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৃহত্তর সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করল। পাউবোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান প্রকৌশলী এক ব্রিফিংয়ে জানান, বিগত বছরগুলোতে নদী ভরাট হয়ে নাব্যতা হারানোর কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই সিলেট মহানগরীর রাজপথ প্লাবিত হতো এবং সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যেত। আধুনিক সাকশন কাটার ড্রেজারের সাহায্যে নদীর তলদেশ খনন করে স্বাভাবিক গভীরতা পুনরুদ্ধার করায় এখন উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি কোনো উপচে পড়া ছাড়াই দ্রুত মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরের দিকে প্রবাহিত হতে পারছে। সিলেট মহানগরীর ব্যবসায়ীরা এবং হাওরাঞ্চলের কৃষক সমাজ এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে গভীর স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। সুনামগঞ্জের কৃষকরা জানান, ফসল তোলার আগ মুহূর্তে পাহাড়ি ঢলের কারণে পাকা ধান ডুবে যাওয়ার যে আতঙ্ক তাদের তাড়া করে ফিরত, তা এখন অনেকাংশে দূর হয়েছে। সময়মতো নিরাপদে ধান কেটে ঘরে তুলতে পারায় এ বছর হাওর অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক খাদ্য সুরক্ষাকে শক্তিশালী করেছে। প্রকল্পের আওতায় কেবল তলদেশ খননই করা হয়নি; বরং নদীর দুই তীরে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ, রিভারব্যাঙ্ক প্রোটেকশন জিওব্যাগ স্থাপন এবং শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য আধুনিক স্লুইসগেট ও ফ্লাড রেগুলেটর স্থাপন করা হয়েছে। নদী তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে স্থানীয় নাগরিকদের বিনোদনের জন্য সবুজ ওয়াকওয়ে এবং পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পরিবেশবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এই মেগা প্রকল্পকে কার্যকর বন্যা নিয়ন্ত্রণের অনন্য মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, নদীর নাব্যতা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে প্রতি বছর নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং বজায় রাখতে হবে এবং নদীতে পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য ফেলা কঠোর আইনের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। তবেই নদী তার স্বাভাবিক রূপ ধরে রাখবে এবং প্রকৃতির আশীর্বাদ হিসেবে সিলেটের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ও পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, রাজকীয় রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং মায়াবী হরিণের আবাসস্থল চিরতরে নিরাপদ রাখতে এক অনন্য সামাজিক বিপ্লব সূচিত হয়েছে। সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার উপকূলীয় গ্রামগুলোতে স্থানীয় বনজীবীদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে 'কমিউনিটি ইকো-গার্ডিয়ান' স্কোয়াড। বন অধিদপ্তর এবং আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ তহবিলের যৌথ সহযোগিতায় পরিচালিত এই উদ্যোগে প্রান্তিক গ্রামবাসীরাই এখন বনের অতন্দ্র প্রহরীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। ইকো-গার্ডিয়ান দলের সদস্যদের বেশিরভাগই সাবেক মৌয়াল, বাওয়ালি ও কাঁকড়া শিকারি, যারা বংশপরম্পরায় সুন্দরবনের প্রতিটি নদী, খাঁড়ি ও গহিন অরণ্যের পথ চিনে বড় হয়েছেন। তাদের এই গভীর ভৌগোলিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক জিপিএস ডিভাইস, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বাইনোকুলার ও ওয়াকি-টকির সমন্বয়ে বনাঞ্চলের অভ্যন্তরে সার্বক্ষণিক টহল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বনের ভেতরে কোনো চোরা শিকারি দল প্রবেশ করলে বা বিষ দিয়ে মাছ শিকারের অপচেষ্টা চালালে তাৎক্ষণিকভাবে বনবিভাগ ও নৌ-পুলিশকে রিয়েল-টাইম সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছে। বন সংরক্ষক (সিএফ) খুলনা অঞ্চল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, ইকো-গার্ডিয়ানদের সক্রিয় নজরদারির ফলে সুন্দরবনে অবৈধ হরিণ শিকার ও বিষ প্রয়োগের ঘটনা বিগত এক বছরে প্রায় ৮৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক খবর হলো, বনাঞ্চলে মানুষের অনধিকার প্রবেশ ও উপদ্রব বন্ধ হওয়ায় ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে সুন্দরবনের বাঘের শাবকসহ পরিবারগুলোর মুক্ত বিচরণের চিত্র ব্যাপকভাবে ধরা পড়ছে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা একে বনের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ফিরে পাওয়ার শুভ লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। প্রকল্পটি বনজীবীদের বিকল্প ও সম্মানজনক জীবিকায়নের পথ উন্মুক্ত করেছে। বন থেকে কাঠ কাটা বা মধু সংগ্রহের জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে তারা এখন নিয়মিত সরকারি সম্মানী, ইকো-ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে আয় এবং ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের মাধ্যমে টেকসই জীবনযাপন করছেন। তাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় একাধিক আধুনিক পরিবেশ পাঠশালা স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বন সুরক্ষার শিক্ষায় শিক্ষিত করা হচ্ছে। পরিবেশ গবেষকরা মন্তব্য করেছেন, বন্দুকের নলের চেয়ে স্থানীয় জনগণের আন্তরিক অংশগ্রহণ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে হাজার গুণ বেশি কার্যকর। সুন্দরবনের এই সফল 'ইকো-গার্ডিয়ান মডেল' আজ আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গের চরাঞ্চলে অনাবাদি পতিত জমিকে পরিবেশবান্ধব সবুজ শক্তিতে রূপান্তরিত করে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সর্ববৃহৎ একক কেন্দ্র 'তিস্তা সৌরবিদ্যুৎ পার্ক' থেকে জাতীয় গ্রিডে সফলভাবে পূর্ণাঙ্গ ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়েছে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও রংপুরের কাউনিয়া সীমান্তে তিস্তা নদীর অববাহিকায় সুবিশাল চরে স্থাপিত এই প্রকল্পটির মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের বিদ্যুৎ সংকট ও দীর্ঘদিনের লো-ভোল্টেজ সমস্যার স্থায়ী ও যুগান্তকারী সমাধান নিশ্চিত হলো। প্রকল্পটিতে স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ৫ লাখ অত্যাধুনিক মনোক্রিস্টালাইন ফটোভোলটাইক সোলার প্যানেল, যা মেঘলা আবহাওয়াতেও উচ্চ দক্ষতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। বিশাল এই প্ল্যান্টের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সুউচ্চ টাওয়ার ও আধুনিক আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলের মাধ্যমে সরাসরি রংপুর ও সৈয়দপুরের প্রধান সাবস্টেশনগুলোতে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার লাখ লাখ পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখন নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সেবা ভোগ করছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পাওয়ার সেলের প্রকৌশলীরা জানান, উত্তরবঙ্গে পূর্বে পিক-আওয়ারে ভোল্টেজ ড্রপ করে শিল্প কারখানা ও গভীর নলকূপ সেচ পাম্প চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ত। তিস্তা সোলার পার্কের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় কৃষিপ্রধান উত্তরবঙ্গের বোরো সেচ মৌসুমে কৃষকদের সেচকাজ নির্বিঘ্নে পরিচালিত হচ্ছে, যা ধান ও রবি শস্যের বাম্পার উৎপাদনে সরাসরি অবদান রাখছে। প্রকল্পটি স্থানীয় অর্থনীতি ও চরাঞ্চলের জীবনমানে অভূতপূর্ব রূপান্তর এনে দিয়েছে। পূর্বে যেখানে তিস্তার চরে কেবল বালু আর ধুধু প্রান্তর ছিল, সেখানে আজ আধুনিক বিদ্যুৎ অবকাঠামো, পাকা রাস্তাঘাট ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সোলার প্যানেলের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা ও নিরাপত্তার কাজে স্থানীয় শত শত তরুণদের চাকরি দেওয়া হয়েছে, যা তাদের জীবনে স্থায়ী আর্থিক সচ্ছলতা নিয়ে এসেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তিস্তা সোলার পার্ক এক অনন্য মাইলফলক। বছরে হাজার হাজার টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করে প্রকল্পটি দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় এবং টেকসই উন্নয়নের আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় ময়মনসিংহ ও শেরপুরের প্রাচীন গ্রামীণ তাঁতপল্লীগুলোতে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক সুতা দিয়ে খাঁটি খাদি ও ঐতিহ্যবাহী রেশম বয়ন শিল্পের এক বর্ণাঢ্য নবজাগরণ সূচিত হয়েছে। সিন্থেটিক কাপড়ের ভিড়ে একসময় হারিয়ে যেতে বসা শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁতশিল্প এখন নতুন নকশা, বৈচিত্র্যময় রঙের মেলবন্ধন এবং টেকসই ফ্যাশনের আন্তর্জাতিক ধারণার সমন্বয়ে ফিরে পেয়েছে তার পুরোনো জৌলুস। রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো এখন সরাসরি এসব তাঁতপল্লী থেকে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির শাড়ি, শাল, ফতুয়া এবং গৃহসজ্জার সুতি বস্ত্র সংগ্রহ করছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ রেশম বোর্ডের সমন্বিত সহায়তায় এলাকার নারী তাঁতিদের জন্য আধুনিক জ্যাকার্ড তাঁত পরিচালনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক রঙের (ন্যাচারাল ডাইং) ওপর উন্নত প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালিত হয়েছে। চা পাতা, খয়ের, গাঁদা ফুল, হরীতকী ও গাছের ছাল থেকে প্রস্তুত সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত ভেষজ রঙে সুতা রাঙিয়ে তাঁতিরা যে মনোমুগ্ধকর টেক্সটাইল তৈরি করছেন, তা স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাঁতি সমবায় সমিতির নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, সরাসরি আধুনিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। পূর্বে যেখানে কঠোর পরিশ্রমের পর নারী তাঁতিরা নামমাত্র মজুরি পেতেন, এখন তারা প্রতিটি পোশাকের ন্যায্যমূল্য সরাসরি তাদের মোবাইল ওয়ালেটে লাভ করছেন। এর ফলে প্রতিটি পরিবারে নারীরা পরিবারের প্রধান আর্থিক উপার্জনকারীতে পরিণত হয়েছেন। স্থানীয় অর্থনীতিতে এই পরিবর্তন গভীর সামাজিক প্রভাব ফেলছে। নারী তাঁতিদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা তাদের পরিবারের শিশুদের মানসম্মত স্কুলে পাঠাতে এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতে সক্ষম করেছে। ব্যাংকগুলোও জামানতবিহীন নারী উদ্যোক্তা ঋণের মাধ্যমে তাদের তাঁতের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ওয়ার্কশপ সংস্কারে সহজ শর্তে অর্থায়ন করছে। সংস্কৃতি ও বস্ত্র গবেষকরা অভিমত দিয়েছেন, ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী খাদি ও রেশম বয়ন কেবল একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি বাঙালির সমৃদ্ধ কারুশিল্পের এক অনন্য জাতীয় সম্পদ। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব 'স্লো ফ্যাশন'-এর যে জোয়ার চলছে, তাতে যথাযথ ব্র্যান্ডিং ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্প বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশকে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্বদেশী চেতনা ও শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী বয়ন দক্ষতার প্রতীক কুমিল্লার খাঁটি খাদি বস্ত্রের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ প্রদানের যাবতীয় আইনি ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) খাদি কাপড়ের ঐতিহাসিক উৎপত্তি, বিশুদ্ধ সুতা তৈরির প্রক্রিয়া এবং ঐতিহ্যবাহী বয়নকৌশল পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই শেষে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এর মাধ্যমে জামদানি, ইলিশ ও মসলিনের পর কুমিল্লার খাদি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচয় হিসেবে আইনি সুরক্ষা লাভ করল। কুমিল্লার চান্দিনা, দেবিদ্বার এবং মনোহরপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁতপল্লীগুলোতে শত বছর ধরে চরকায় কাটা সুতা দিয়ে এই অনন্য বস্ত্র বোনা হয়। খাঁটি খাদি কাপড়ের বিশেষত্ব হলো এটি শীতকালে উষ্ণতা প্রদান করে এবং গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহে শরীরকে পরম শীতল ও আরামদায়ক রাখে। জিআই মর্যাদা অর্জনের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কেউ নকল বা কৃত্রিম কাপড়ে 'কুমিল্লার খাদি' নাম ব্যবহার করতে পারবে না, যা আসল পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও আন্তর্জাতিক রপ্তানি মূল্যকে বহুলাংশে সুরক্ষিত করবে। খাদি কারিগর ও ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানান, জিআই স্বীকৃতির খবরে কুমিল্লার খাদি বাজারে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। নতুন প্রজন্মের ফ্যাশন ডিজাইনাররা এখন ঐতিহ্যবাহী এই সুতা ব্যবহার করে আধুনিক জ্যাকেট, ওয়েস্টার্ন ব্লেজার, ট্রেন্ডি শার্ট, কুর্তি এবং ফ্যাশনেবল স্কার্ফ তৈরি করছেন, যা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিলাসবহুল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে বিপুল সমাদর লাভ করছে। কুমিল্লা জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, খাদি শিল্পীদের প্রণোদনা দিতে চান্দিনায় একটি বিশেষায়িত 'খাদি পল্লী ও আধুনিক প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স' স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে স্বয়ংক্রিয় সুতা কাটার চড়কা এবং আধুনিক নকশা গবেষণাগার স্থাপন করা হবে। যাতে প্রবীণ কারিগরদের শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান নতুন প্রজন্মের তরুণীদের কাছে নিরবচ্ছিন্নভাবে হস্তান্তরিত হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ববাজারে এখন হাতে বোনা অর্গানিক পরিবেশবান্ধব কাপড়ের বিপুল চাহিদা রয়েছে। সঠিক ব্র্যান্ডিং এবং জিআই সনদের সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কুমিল্লার খাদি রপ্তানি করে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে, যা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পকে বিশ্বদরবারে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবে।
প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীর অবৈধ দখল ও আবর্জনার স্তূপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে নির্মিত ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আধুনিক দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে এবং আন্তর্জাতিক মানের ইকোপার্ক নগরবাসীর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্পে নদীর পাড় ঘেঁষে সবুজ বৃক্ষরোপণ, আলোকোজ্জ্বল ওয়াকওয়ে, শিশুদের জন্য আধুনিক অ্যামিউজমেন্ট জোন এবং বসার নান্দনিক প্যাভিলিয়ন তৈরি করা হয়েছে। উদ্বোধনী দিনে হাজার হাজার পরিবার তাদের শিশু-কিশোর ও বয়োজ্যেষ্ঠদের নিয়ে নদীর নির্মল বাতাসে পদচারণায় মেতে ওঠেন। দীর্ঘকাল ধরে নদীপাড়ের যেসব এলাকা অবৈধ কারখানা, বর্জ্যের ভাগাড় এবং মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল, সেই স্থানগুলো আজ এক স্বপ্নীল বিনোদন কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। নদীর মৃদু বাতাস এবং চোখ জুড়ানো সবুজ পরিবেশের কারণে সকাল ও বিকেলে সব বয়সী স্বাস্থ্যসচেতন নাগরিকদের প্রাতঃভ্রমণ ও শরীরচর্চার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এই ওয়াকওয়ে। নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখতে বিআইডব্লিউটিএ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করেছে। নদীপাড়ে শিল্পকারখানাগুলোর অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ফেলা পুরোপুরি বন্ধে সার্বক্ষণিক ড্রোন সার্ভিল্যান্স এবং অটোমেটেড সেন্সর ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। কোনো কারখানা রাতে গোপনে বর্জ্য নির্গমন করলে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম বেজে ওঠে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করে। কঠিন বর্জ্য ফেলারোধে পুরো ওয়াকওয়ে জুড়ে আধুনিক আন্ডারগ্রাউন্ড ডাস্টবিন স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, নারায়ণগঞ্জ কেবল একটি শুষ্ক শিল্পাঞ্চল নয়; এর রয়েছে সমৃদ্ধ নদীমাতৃক ইতিহাস। নদীর তীর পুনর্গঠনের ফলে নগরবাসীর মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। নদীপাড়ের নতুন রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেগুলোতে স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা থাকায় পর্যটন অর্থনীতিতেও প্রাণচাঞ্চল্য সঞ্চারিত হয়েছে। সিটি মেয়র জানিয়েছেন, প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর আধুনিক পরিবেশবান্ধব ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস চালু করা হবে। এতে কাঁচপুর, মদনগঞ্জ এবং শীতলক্ষ্যার পশ্চিম পাড়ের যাত্রীরা মাত্র কয়েক মিনিটে কোনোপ্রকার যানজট ছাড়াই নদী পারাপার হতে পারবেন, যা নগরীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এক অনন্য আধুনিক উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।
অনন্য মিষ্টতা, পাতলা খোসা, ছোট আঁটি আর লোভনীয় রসালো বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশ্বখ্যাত উত্তরের জেলা দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী বেদানা ও চায়না-৩ জাতের লিচু আধুনিক কোল্ড-চেইন প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় সুপারমার্কেটগুলোতে সফলভাবে স্থান করে নিয়েছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কুয়েতের বিলাসবহুল হাইপারমার্কেটগুলোতে বাংলাদেশের এই প্রিমিয়াম লিচুর বিপুল চাহিদা দেখা দিয়েছে। আকাশপথে বিশেষ কার্গো ফ্লাইটের মাধ্যমে তাজা লিচু সরবরাহ করায় স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিসহ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দিনাজপুরের লিচু এখন এক অনন্য লোভনীয় ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগে দিনাজপুরের মাশিমপুর, বিরল ও কোতোয়ালির শীর্ষ লিচু বাগানগুলোতে বৈজ্ঞানিক সংগ্রহ ও আধুনিক পোস্ট-হার্ভেস্ট প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। লিচু গাছ থেকে তোলার পরপরই তা আধুনিক সেন্সর নিয়ন্ত্রিত শীতলীকরণ ইউনিটে প্রি-কুলিং করা হয় এবং বিশেষ ইথিলিন-শোষণকারী বায়ুরোধী ইকো-কার্টনে প্যাকেটজাত করা হয়। এর ফলে লিচুর উজ্জ্বল টকটকে লাল বর্ণ, তাজা বোঁটা এবং অতুলনীয় মিষ্টি সুবাস টানা ২০ দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবিকৃত থাকে। সফল লিচু চাষি ও কৃষি রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, সনাতন পদ্ধতিতে লিচু বিক্রি করে তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতেন। কিন্তু সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় তারা প্রতি শ' লিচুর জন্য অভ্যন্তরীণ বাজারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি মূল্য লাভ করছেন। রপ্তানিমূল্য সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে কৃষকের অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ায় উত্তরবঙ্গের ফল অর্থনীতিতে এক বিশাল আর্থিক জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানিয়েছেন, জেলায় এ বছর প্রায় সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে উন্নত জাতের লিচুর বাম্পার উৎপাদন হয়েছে। সরকার আন্তর্জাতিক ফাইটোস্যানিটারি বা উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ সনদ প্রদান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করায় বিমানবন্দরে কোনো প্রকার কালক্ষেপণ ছাড়াই লিচুর কার্গো আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে উঠে যাচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক আমদানিকারকরা বাংলাদেশের ফল সরবরাহের সময়সীমা ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ফল অর্থনীতি গবেষকদের মতে, দিনাজপুরের লিচুর এই আন্তর্জাতিক সাফল্য দেশের অন্যান্য কৃষি অঞ্চলের জন্যও এক অনুকরণীয় মডেল। সরকার উত্তরবঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক মানের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ জোন ও এয়ার কার্গো হাব স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যা অদূর ভবিষ্যতে আম, লিচু ও কাঁঠাল রপ্তানি করে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।