বিশ্বমঞ্চে কুমিল্লার ঐতিহ্যের স্বীকৃতি: ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ পাচ্ছে কুমিল্লার খাঁটি খাদি বস্ত্র
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্বদেশী চেতনা ও শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী বয়ন দক্ষতার প্রতীক কুমিল্লার খাঁটি খাদি বস্ত্রের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ প্রদানের যাবতীয় আইনি ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) খাদি কাপড়ের ঐতিহাসিক উৎপত্তি, বিশুদ্ধ সুতা তৈরির প্রক্রিয়া এবং ঐতিহ্যবাহী বয়নকৌশল পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই শেষে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এর মাধ্যমে জামদানি, ইলিশ ও মসলিনের পর কুমিল্লার খাদি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচয় হিসেবে আইনি সুরক্ষা লাভ করল।
কুমিল্লার চান্দিনা, দেবিদ্বার এবং মনোহরপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁতপল্লীগুলোতে শত বছর ধরে চরকায় কাটা সুতা দিয়ে এই অনন্য বস্ত্র বোনা হয়। খাঁটি খাদি কাপড়ের বিশেষত্ব হলো এটি শীতকালে উষ্ণতা প্রদান করে এবং গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহে শরীরকে পরম শীতল ও আরামদায়ক রাখে। জিআই মর্যাদা অর্জনের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কেউ নকল বা কৃত্রিম কাপড়ে 'কুমিল্লার খাদি' নাম ব্যবহার করতে পারবে না, যা আসল পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও আন্তর্জাতিক রপ্তানি মূল্যকে বহুলাংশে সুরক্ষিত করবে।
খাদি কারিগর ও ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানান, জিআই স্বীকৃতির খবরে কুমিল্লার খাদি বাজারে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। নতুন প্রজন্মের ফ্যাশন ডিজাইনাররা এখন ঐতিহ্যবাহী এই সুতা ব্যবহার করে আধুনিক জ্যাকেট, ওয়েস্টার্ন ব্লেজার, ট্রেন্ডি শার্ট, কুর্তি এবং ফ্যাশনেবল স্কার্ফ তৈরি করছেন, যা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিলাসবহুল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে বিপুল সমাদর লাভ করছে।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, খাদি শিল্পীদের প্রণোদনা দিতে চান্দিনায় একটি বিশেষায়িত 'খাদি পল্লী ও আধুনিক প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স' স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে স্বয়ংক্রিয় সুতা কাটার চড়কা এবং আধুনিক নকশা গবেষণাগার স্থাপন করা হবে। যাতে প্রবীণ কারিগরদের শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান নতুন প্রজন্মের তরুণীদের কাছে নিরবচ্ছিন্নভাবে হস্তান্তরিত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ববাজারে এখন হাতে বোনা অর্গানিক পরিবেশবান্ধব কাপড়ের বিপুল চাহিদা রয়েছে। সঠিক ব্র্যান্ডিং এবং জিআই সনদের সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কুমিল্লার খাদি রপ্তানি করে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে, যা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পকে বিশ্বদরবারে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবে।

