বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান ও মর্যাদাপূর্ণ তীর্থভূমি ফ্রান্সের কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক বিজয় অর্জিত হয়েছে। উৎসবের অন্যতম প্রধান বিভাগ 'আ সার্তে রিগার্দ'-এ অফিশিয়ালি নির্বাচিত বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী শেষে উপস্থিত কয়েক হাজার বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্র সমালোচক, জুরি সদস্য ও দর্শকদের টানা দশ মিনিটের দাঁড়িয়ে করতালির (স্ট্যান্ডিং ওভেশন) এক অবিস্মরণীয় দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের এই সাফল্যকে দক্ষিণ এশীয় সিনেমার এক নবযুগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। চলচ্চিত্রটির কাহিনি গড়ে উঠেছে নদীমাতৃক বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের সাহসী নারীর সংগ্রাম, সামাজিক ট্যাবু ভাঙার প্রত্যয় এবং আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক রূপ ও মানবীয় অনুভূতির গভীর দার্শনিক মেলবন্ধনকে কেন্দ্র করে। পরিচালক কোনো প্রকার কৃত্রিম মেলোড্রামার আশ্রয় না নিয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক আলো ও অনবদ্য ক্যামেরা বিন্যাসে এক কাব্যিক ভিজ্যুয়াল নির্মাণ উপহার দিয়েছেন। কান উৎসবের মূল প্রদর্শনী শেষে ভ্যারাইটি এবং হলিউড রিপোর্টার তাদের রিভিউতে লিখেছে, 'এই সিনেমা দেখায় কীভাবে একটি গভীর স্থানীয় গল্প সর্বজনীন মানবীয় আবেদনে রূপ নিয়ে পৃথিবীর যেকোনো দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে।' অভিনয়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছে এক অবিস্মরণীয় রূপকথা। নাম ভূমিকায় অভিনয় করা বাংলাদেশি তরুণ অভিনেত্রী তাঁর আবেগঘন, সাবলীল ও প্রাণবন্ত অভিনয়ের জন্য আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডের বিশেষ ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেছেন এবং কান উৎসবের অন্যতম সেরা অভিনেত্রীর মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। রেড কার্পেটে খাঁটি দেশীয় জামদানি শাড়ি পরিধান করে বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরে তিনি বিশ্ব মিডিয়ার অন্যতম মধ্যমণিতে পরিণত হন। দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে এই ঐতিহাসিক অর্জন বিপুল আনন্দ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) এবং সাধারণ চলচ্চিত্রপ্রেমীরা এই সাফল্যকে বাংলা সিনেমার পুনর্জন্ম হিসেবে অভিহিত করেছেন। রাজধানী ঢাকার সিনেপ্লেক্সগুলোতে টিকিট অগ্রিম বুকিংয়ের হিড়িক পড়েছে। বিদেশের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ সিনেমা চেইনগুলো চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি দেওয়ার জন্য পরিবেশন স্বত্ব কিনে নিয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জানিয়েছেন, তরুণ ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মেধা বিকাশে সরকারি অনুদানের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হয়েছে এবং একটি বিশেষায়িত 'জাতীয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন তহবিল' গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক সিনেপ্লেক্স নির্মাণের জন্য স্বল্প সুদে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হচ্ছে, যাতে দেশের প্রান্তিক শহরগুলোতেও আধুনিক সিনেমা হলের নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। বাংলা চলচ্চিত্রের এই আন্তর্জাতিক জয়যাত্রা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে সিনেমা শিল্প দেশের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক রপ্তানি খাতে পরিণত হবে।
টেলিভিশনের প্রচলিত সীমাবদ্ধতা ও বাঁধাধরা নাটকের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশের ডিজিটাল বিনোদন জগতে এক অভাবনীয় বিপ্লব সৃষ্টি করেছে দেশীয় ওভার-দ্য-টপ (ওটিটি) প্ল্যাটফর্মগুলো। চরকি, হইচই, বিঞ্জ এবং বঙ্গ-এর মতো আধুনিক স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলোতে মুক্তিপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক মানের উচ্চ বাজেটের মৌলিক ওয়েব সিরিজ, রহস্য থ্রিলার এবং ঐতিহাসিক ড্রামাগুলো এখন কেবল দেশের দর্শকদেরই নয়; বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি প্রবাসী বাঙালি এবং আন্তর্জাতিক সাবস্ক্রাইবারদের হৃদয় জয় করে নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তি পাওয়া একাধিক রহস্য-রোমাঞ্চকর গোয়েন্দা সিরিজ এবং সামাজিক বাস্তবধর্মী ড্রামা নির্মাণের গুণগত মান আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং জায়ান্ট নেটফ্লিক্স বা এইচবিও-এর সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের সর্বাধুনিক অ্যারিরি অ্যালেক্সা সিনেমা ক্যামেরা, ডলবি অ্যাটমস সারাউন্ড সাউন্ড এবং অত্যাধুনিক কালার গ্রেডিং প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রতিটি পর্ব যেন একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বমানের সিনেমার রূপ পরিগ্রহ করেছে। বিশেষ করে চিত্রনাট্যের তীক্ষ্ণতা, মেদহীন সংলাপ এবং সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সাহসী বক্তব্য দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্ক্রিনে আটকে রাখছে। অভিনয় শিল্পীদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে এক অপূর্ব রূপান্তর। দেশের শীর্ষস্থানীয় মঞ্চ ও রূপালী পর্দার অভিজ্ঞ শিল্পীদের পাশাপাশি ওটিটির মাধ্যমে উঠে এসেছে একদল অসাধারণ প্রতিভাবান নতুন প্রজন্মের তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রী। তাদের প্রাকৃতিক ও চরিত্রভিত্তিক অভিনয় দেশে-বিদেশে প্রশংসার ঝড় তুলেছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো শিল্পীদের জন্য সম্মানজনক পারিশ্রমিক ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির সুযোগ সৃষ্টি করায় অভিনয় জগতে পেশাদারিত্ব এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও লক্ষণীয়। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে পেইড সাবস্ক্রিপশন ফি বাবদ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের সহজলভ্যতা এবং মোবাইল ওয়ালেটের মাধ্যমে সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার সুবিধা থাকায় গ্রাহক সংখ্যা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে দেশের ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিতে শত শত কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ যুক্ত হচ্ছে। মিডিয়া ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের এই জোয়ার বাংলাদেশের জন্য এক শক্তিশালী 'সফট পাওয়ার' বা সাংস্কৃতিক কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসকে আন্তর্জাতিক দর্শকদের উপযোগী করে উপস্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে এক আধুনিক, রুচিশীল ও প্রগতিশীল জাতি হিসেবে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করছে।
দীর্ঘ কয়েক বছরের বিরতির পর রাজধানী ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে এক বর্ণাঢ্য ও ঐতিহাসিক আয়োজনে প্রত্যাবর্তন করেছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সঙ্গীত মহোৎসব 'ঢাকা আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্ট'। শীতের মিষ্টি সন্ধ্যায় হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও সঙ্গীতপ্রেমীদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে সুবিশাল স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ। দেশি-বিদেশি শতাধিক প্রখ্যাত লোকসঙ্গীতশিল্পী, সুফি সাধক ও বাউল বাদ্যযন্ত্রীদের অসাধারণ পরিবেশনায় সুরের এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি হয়, যা পুরো শহরকে সুরের বন্যায় ভাসিয়ে দেয়। উৎসবের উদ্বোধনী সন্ধ্যায় মঞ্চে ওঠেন লালন সাঁইয়ের সাধনভূমির প্রবীণ বাউল শিল্পীরা। একতারা, দোতারা, খমক ও ঢোলের মাদকতাময় ছন্দে যখন বেজে ওঠে 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি' কিংবা 'মিলন হবে কত দিনে', তখন স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে শুরু করে মূল মাঠের হাজার হাজার দর্শক একসাথে কণ্ঠ মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব ঐকতান সৃষ্টি করেন। আন্তর্জাতিক শিল্পীদের মধ্যে তুরস্কের সুফি ঘূর্ণি নৃত্যশিল্পী (ডারভিশ), মালির ঐতিহ্যবাহী কোরা বাদক এবং ভারতের রাজস্থানি লোকসঙ্গীতশিল্পীদের অনবদ্য পরিবেশনা উৎসবকে এক বিশ্বজনীন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। আয়োজক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, দর্শকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিতে পুরো স্টেডিয়ামকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হয় এবং শতভাগ ডিজিটাল ফ্রি রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সুশৃঙ্খল প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়। নারী ও বিদেশি দর্শকদের জন্য বিশেষ জোন এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত ফুড কোর্ট ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করায় উৎসবটি পরিণত হয় পরিবারের সকলকে নিয়ে আনন্দ উপভোগের এক অনন্য মিলনমেলায়। সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা প্রধান অতিথি হিসেবে উৎসবের উদ্বোধন করে বলেন, 'বাউল ও সুফি দর্শনই হলো আবহমান বাংলার প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী পরিচয়। ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মশুদ্ধির যে চিরন্তন বাণী আমাদের লোকসঙ্গীত বহন করে, তা বর্তমান সংঘাতময় বিশ্বে শান্তির সবচেয়ে বড় প্রেরণা। এই ফোক ফেস্ট আমাদের সাংস্কৃতিক গৌরবকে বিশ্বদরবারে উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরেছে।' উৎসবের সমাপনী রাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় আধুনিক ফিউশন ব্যান্ডগুলোর সাথে গ্রামীণ লোকশিল্পীদের যৌথ জুগलबন্দী দর্শকদের উন্মাতাল আনন্দে ভাসিয়ে দেয়। সঙ্গীত সমালোচকরা বলেছেন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুরের এই অপার্থিব মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে সঙ্গীতের কোনো সীমানা নেই। ঢাকা ফোক ফেস্টের এই সফল প্রত্যাবর্তন বাংলার সমৃদ্ধ লোকঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হৃদয়ে চিরভাস্বর করে রাখবে।
বাংলা চলচ্চিত্রের মেধা, সৃজনশীলতা ও অসামান্য অবদানের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে আয়োজিত হলো জমকালো ও গৌরবোজ্জ্বল 'জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার' প্রদান অনুষ্ঠান। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের (বিআইসিসি) বর্ণাঢ্য মিলনায়তনে দেশের খ্যাতনামা চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, অভিনয়শিল্পী, চিত্রগ্রাহক এবং সঙ্গীত পরিচালকদের উপস্থিতিতে এই মহতি উৎসব উদযাপিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিজয়ীদের হাতে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি, সনদ ও আর্থিক পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন ও ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ছিল যখন দেশের চলচ্চিত্রের দুই প্রবীণ ও দিকপাল অভিনয় কিংবদন্তিকে চলচ্চিত্রে আজীবন অনন্য অবদানের জন্য 'আজীবন সম্মাননা পুরস্কার' প্রদান করা হয়। পুরো মিলনায়তনের হাজার হাজার বিশিষ্ট অতিথি দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে এই বরেণ্য শিল্পীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে প্রবীণ অভিনেত্রী বলেন, 'জীবনের শেষপ্রান্তে এসে রাষ্ট্রের এই স্বীকৃতি আমার অভিনয় জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা যেভাবে বাংলা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাচ্ছেন, তাতে আমি নিশ্চিত আমাদের চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল।' এবারের পুরস্কারের সবচেয়ে বড় চমক ছিল মূলধারার গতানুগতিক সিনেমার বাইরে তরুণ ও স্বাধীন নির্মাতাদের নির্মিত বিকল্পধারার চলচ্চিত্রের নিরঙ্কুশ বিজয়। সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক, সেরা চিত্রনাট্য এবং সেরা চিত্রগ্রাহক—সবকটি শীর্ষ পুরস্কারই অর্জন করেছে সমকালীন বাস্তবমুখী ও সামাজিক জাগরণমূলক সিনেমাগুলো। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক শর্টফিল্মগুলোও বিচারকদের কাছ থেকে বিশেষ জুরি পুরস্কার লাভ করেছে। পুরস্কার বিতরণী পর্ব শেষে দেশের শীর্ষস্থানীয় সঙ্গীত ও নৃত্যশিল্পীদের অংশগ্রহণে এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা পরিবেশিত হয়। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের কালজয়ী গানগুলোর আধুনিক অর্কেস্ট্রা পরিবেশনা এবং তরুণ নৃত্যশিল্পীদের দেশাত্মবোধক কোরিওগ্রাফি উপস্থিত দর্শকদের গভীরভাবে মুগ্ধ করে। তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্তদের জন্য বিশেষ সরকারি পেনশন এবং চলচ্চিত্র সংরক্ষণাগারে তাদের সৃষ্টির মাস্টারকপি সংরক্ষণের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জুরিবোর্ডের প্রধান মন্তব্য করেন, মেধার এই সঠিক মূল্যায়ন দেশের তরুণ নির্মাতাদের বাণিজ্যিক লাভের পাশাপাশি বিশ্বমানের শিল্পসফল চলচ্চিত্র নির্মাণে আরও বেশি উৎসাহিত করবে, যা বাংলা সিনেমাকে বিশ্বদরবারে এক নতুন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবে।
রাজধানীর বেইলি রোডের ঐতিহাসিক মহিলা সমিতি মিলনায়তন এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চনাটকের সোনালী দিনগুলো আবারও ফিরে এসেছে। নাগরিক ব্যস্ততা আর মোবাইল স্ক্রিনের যুগে মানুষ আবারও দলে দলে সপরিবারে ছুটে আসছেন জীবন্ত অভিনয়ের মায়াবী আকর্ষণে। টিকিট কাউন্টারগুলোতে 'হাউসফুল' নোটিশ এবং নাটক শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই দীর্ঘ লাইন প্রমাণ করে যে, বুদ্ধিদীপ্ত মঞ্চনাটকের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি; বরং তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি মঞ্চস্থ হওয়া একাধিক রাজনৈতিক ব্যঙ্গনাটক, সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদমূলক নাটক এবং আবহমান বাংলার রূপকথাভিত্তিক প্রযোজনাগুলো দর্শকদের হৃদয় গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। মঞ্চে কুশীলবদের আবেগঘন সংলাপ প্রক্ষেপণ, চমৎকার আলো ও আবহসঙ্গীতের নিখুঁত প্রয়োগ এবং ন্যূনতম সেট ডিজাইনে প্রতীকী ভাব ফুটিয়ে তোলার মুনশিয়ানা নাট্যবোদ্ধাদের বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে। প্রায় প্রতিটি প্রদর্শনীর শেষেই দর্শকরা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন। মঞ্চনাটকের পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী 'যাত্রাপালা'র নবজাগরণও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক চমৎকার সুবাতাস বইয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অপসংস্কৃতির কবলে পড়ে কলুষিত হওয়া যাত্রাপালাকে উদ্ধার করে শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করেছে জাতীয় যাত্রাপালা উৎসব। ইতিহাসভিত্তিক যেমন 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা', 'মাইকেল মধুসূদন' এবং সমকালীন সচেতনতামূলক যাত্রাপালাগুলো হাজার হাজার সাধারণ দর্শককে রাত জেগে উপভোগ করতে দেখা গেছে। নাট্য আন্দোলনের অগ্রজ ব্যক্তিত্বরা বলছেন, মঞ্চনাটক কেবল বিনোদন নয়; এটি সমাজের বিবেক জাগ্রত করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। ষাটের ও সত্তরের দশকে স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে মঞ্চনাটক যেমন জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিল, বর্তমান সময়েও দুর্নীতি, অন্যায় ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে মঞ্চই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ প্রাচীর হিসেবে কাজ করছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির আধুনিকায়নে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঢাকার পাশাপাশি জেলা শহরগুলোতেও যাতে নিয়মিত নাট্যোৎসব এবং যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হতে পারে, সে জন্য স্থানীয় নাট্যদলগুলোকে আর্থিক অনুদান ও মহড়া কক্ষের সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। নাট্যপ্রেমীরা প্রত্যাশা করছেন, এই সাংস্কৃতিক জাগরণ দেশকে অপসংস্কৃতি ও ধর্মান্ধতা মুক্ত একটি সুস্থ, সুন্দর সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
বাংলা রক, ফোক এবং সমকালীন ফিউশন সঙ্গীতের অতুলনীয় সুর ও দ্যোতনা এখন বিশ্ব মানচিত্রে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল ফিউশন ব্যান্ডগুলো উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের প্রধান প্রধান সাংস্কৃতিক রাজধানীগুলোতে তাদের মাসব্যাপী আন্তর্জাতিক কনসার্ট ট্যুরে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। নিউইয়র্কের ম্যানহাটন, লন্ডনের ওয়েম্বলি অ্যারেনা, টরন্টো ও বার্লিনের বিখ্যাত কনসার্ট হলগুলোতে প্রতিটি শোতেই ছিল উপচেপড়া দর্শক এবং প্রতিটি টিকিট বিক্রি হয়ে যায় কয়েক সপ্তাহ আগেই। পাশ্চাত্যের আধুনিক ড্রামস, বেস গিটার ও সিন্থেসাইজারের সাথে বাংলার হাজার বছরের প্রাচীন দোতারা, বাঁশি ও একতারার অদ্ভুত মায়াবী ফিউশন বিশ্ব সঙ্গীতের বোদ্ধাদের বিমোহিত করেছে। আন্তর্জাতিক দর্শক ও প্রবাসী তরুণ প্রজন্ম একই সাথে তাল মিলিয়ে লাফিয়ে উঠেছে বাংলা গানের শক্তিশালী ছন্দে। বিশেষ করে বাউল গানের আধুনিক রক সংস্করণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বশান্তি নিয়ে রচিত ব্যান্ডের মৌলিক গানগুলো বিদেশি শ্রোতাদের কাছে বিপুল প্রশংসা লাভ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সঙ্গীত সাময়িকী 'রোলিং স্টোন' এবং যুক্তরাজ্যের এনএমই বাংলাদেশি এই ফিউশন ব্যান্ডগুলোর ওপর বিশেষ ফিচার প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক সমালোচকরা লিখেছেন, 'পূর্বের লোকজ আধ্যাত্মিকতা এবং পশ্চিমের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রগ্রেসিভ রকের এমন চমৎকার ও সুষম সমন্বয় সাম্প্রতিক বিশ্ব সঙ্গীতে অত্যন্ত বিরল। এই বাংলাদেশি মিউজিশিয়ানরা তাদের নিজস্ব শিকড়কে ধারণ করেই এক সর্বজনীন আন্তর্জাতিক সুরের ভাষা নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।' ব্যান্ডের প্রধান ভোকাল ও লিড গিটারিস্ট কনসার্ট শেষে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, 'আমরা বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করতে চেয়েছি যে বাংলা গান কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। নিজস্ব ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি যদি শ্রদ্ধা থাকে, তবে ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে সেই সুর যে কারো আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে। প্রবাসী ভাইবোনদের পাশাপাশি ভিনদেশি নাগরিকদের আমাদের গানের তালে নাচতে দেখে আমরা গর্বিত।' সংস্কৃতি গবেষকরা বলছেন, এই ধরনের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সফর দেশের ইমেজ বা বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তির ইতিবাচক রূপান্তরে লাখ লাখ ডলারের পিআর ক্যাম্পেইনের চেয়েও বেশি শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। বিশ্বসঙ্গীতের প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি ব্যান্ডগুলোর এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা দেশের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গীতশিল্পীদের আরও সাহসী, মৌলিক ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গীত সৃষ্টিতে চিরকাল অনুপ্রেরণা জোগাবে।
দৃশ্যশিল্পের আন্তর্জাতিক মহোৎসবে রূপ নিয়ে রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে এক জাঁকজমকপূর্ণ আবহে পর্দা উঠল ঐতিহ্যবাহী 'এশীয় চারুকলা দ্বিবার্ষিকী' (এশিয়ান আর্ট বিয়েনালে)। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও দুই আমেরিকার প্রায় ৭০টিরও বেশি দেশের সহস্রাধিক খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, ইনস্টলেশন আর্টিস্ট এবং কিউরেটর এই বিশ্বমানের শিল্প আসরে অংশ নিয়েছেন। শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা ভবন ও উন্মুক্ত চত্বরজুড়ে প্রদর্শিত হচ্ছে সমকালীন চিত্রকর্ম, বিশালাকার মেটাল ও পোড়ামাটির ভাস্কর্য, ডিজিটাল ভিডিও আর্ট এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ সাউন্ড ইনস্টলেশন। এবারের প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'মানবতা, প্রকৃতি ও রূপান্তর'। শিল্পীরা তাঁদের তুলির আঁচড়ে ও শিল্পকর্মে তুলে ধরেছেন বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের নির্মম বাস্তবতা, যুদ্ধ ও সংঘাতের বিপরীতে শান্তির আকুতি এবং আধুনিক প্রযুক্তি যুগে মানুষের নিঃসঙ্গতা ও আত্মিক অন্বেষণ। প্রদর্শনীর মূল গ্যালারিতে বাংলাদেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের পাশাপাশি জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রাজিল ও মিশরের প্রথম সারির মাস্টার আর্টিস্টদের সৃষ্টিকর্ম শিল্পপ্রেমী ও সংগ্রাহকদের গভীর প্রশংসা কুড়িয়েছে। প্রদর্শনীতে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প, রিকশা পেইন্টিং, নকশিকাঁথা এবং টেরাকোটা শিল্পের সাথে আধুনিক আধুনিক পোস্ট-মডার্ন আর্টের সমন্বয়ে নির্মিত একটি সুবিশাল মাল্টিমিডিয়া ইনস্টলেশন। আন্তর্জাতিক জুরিবোর্ড সর্বসম্মতভাবে এই ইনস্টলেশনটিকে আসরের শীর্ষ সম্মাননা 'গ্র্যান্ড প্রাইজ' প্রদান করেছে। আন্তর্জাতিক বিচারক প্যানেল তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে, এই সৃষ্টি ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সাথে কোনো বিরোধে না রেখে এক গভীর সুরেলা ঐকতানে রূপান্তর করেছে। বিয়েনালের অংশ হিসেবে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ আর্ট গ্যালারি ও জাদুঘরের কিউরেটররা। তারা বাংলাদেশের তরুণ চিত্রশিল্পীদের মেধা, রঙের বৈচিত্র্য এবং চিন্তার গভীরতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। একাধিক আন্তর্জাতিক আর্ট কিউরেটর বাংলাদেশি প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের আসন্ন ভেনিস বিয়েনালে এবং প্যারিস আর্ট ফেয়ারে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক শিল্পবাজারে বাংলাদেশি চিত্রকর্মের উচ্চমূল্য নিশ্চিত করবে। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক জানিয়েছেন, মাসব্যাপী এই প্রদর্শনীটি সর্বসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকরা টিকিট ছাড়াই বিশ্বমানের এই শিল্পকর্মগুলো উপভোগ করছেন। এই মহতি আয়োজন ঢাকা শহরকে এক প্রাণবন্ত আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক রাজধানীতে রূপান্তরিত করেছে, যা দেশের সৃজনশীল আত্মবিশ্বাসকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করল।
প্রযুক্তির সাথে সৃজনশীলতার অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ও গেমিং জগতে নিজেদের মেধার অসামান্য স্বাক্ষর রাখছে বাংলাদেশের অ্যানিমেশন ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (ভিএফএক্স) স্টুডিওগুলো। হলিউডের শীর্ষস্থানীয় সায়েন্স ফিকশন সিনেমা, নেটফ্লিক্স ও অ্যামাজন প্রাইমের বিশ্বনন্দিত বিগ-বাজেট ওয়েব সিরিজ এবং জাপানি অ্যানিমে ভিডিও গেমসে এখন নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে রাজধানী ঢাকার স্টুডিওগুলোতে প্রস্তুতকৃত অত্যাধুনিক থ্রি-ডি অ্যানিমেশন, সিজিআই ক্যারেক্টার মডেলিং এবং জটিল ভিএফএক্স সিমুলেশন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এবং একাধিক আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন প্রযোজক সংস্থা জানিয়েছে, দেশের প্রায় ত্রিশটিরও বেশি ডেডিকেটেড অ্যানিমেশন ও সিজিআই স্টুডিওতে বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার অত্যন্ত দক্ষ ডিজিটাল আর্টিস্ট কাজ করছেন। ফটো-রিয়ালিস্টিক ওয়াটার সিমুলেশন, ডাইনামিক এক্সপ্লোশন ইফেক্টস, ডিজিটাল ফেসিয়াল ক্যাপচার এবং ভার্চুয়াল প্রোডাকশন ব্যাকগ্রাউন্ড নির্মাণে বাংলাদেশি শিল্পীদের কাজের নিখুঁত মান দেখে মুগ্ধ হয়েছেন হলিউডের সুপারভাইজাররা। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া একাধিক হলিউড সুপারহিরো ফ্র্যাঞ্চাইজি সিনেমার সমাপনী ক্রেডিট লাইনে বাংলাদেশি একাধিক তরুণ ভিএফএক্স আর্টিস্টের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শিত হওয়ায় দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অভূতপূর্ব আনন্দ ও গর্বের অনুভূতি তৈরি হয়েছে। দেশীয় স্টুডিওগুলোর প্রধান নির্বাহীরা জানান, পূর্বে যেখানে আন্তর্জাতিক প্রোডাকশন হাউসগুলো অ্যানিমেশনের আউটসোর্সিং কাজের জন্য কেবল ভারত বা ফিলিপাইনে যেত, এখন সৃজনশীল দক্ষতা ও সময়ানুবর্তিতার কারণে ঢাকা হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশনের এক অন্যতম প্রধান পছন্দের কেন্দ্র। আইসিটি বিভাগ এবং হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় দেশের চারটি বিভাগীয় শহরে আধুনিক হাই-কনফিগারেশন রেন্ডার ফার্ম এবং মোশন ক্যাপচার স্টুডিও স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে দেশীয় অ্যানিমেটরদের আর বিদেশি ক্লাউড রেন্ডারিংয়ের জন্য অতিরিক্ত ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে না। সম্পূর্ণ দেশীয় সুবিধাতেই জটিল ফ্রেমগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রেন্ডার করা সম্ভব হচ্ছে, যা কাজের গতি ও মুনাফার মার্জিন বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে। অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, অ্যানিমেশন ও গেমিং বিশ্বজুড়ে এক মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের ক্রমবর্ধমান শিল্প। তরুণ প্রজন্মের এই অসাধারণ সৃজনশীল দক্ষতাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে আরো বিকশিত করা গেলে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই বৈশ্বিক অ্যানিমেশন ও গেমিং আউটসোর্সিং বাণিজ্যের অন্যতম শীর্ষ গন্তব্যে পরিণত হবে, যা কোটি কোটি ডলারের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নেতৃত্ব দেবে।
বাংলা চলচ্চিত্রের শতবর্ষের অমূল্য ও ঐতিহাসিক সেলুলয়েড ফিল্মগুলোকে কালের গর্ভে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার হাত থেকে চিরতরে রক্ষা করতে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ এক মহতী ও বৈপ্লবিক আধুনিকায়ন সম্পন্ন করেছে। আগারগাঁওয়ের অত্যাধুনিক ফিল্ম আর্কাইভ ভবনে স্থাপিত দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধুনিক ডিজিটাল ফিল্ম রিস্টোরেশন ল্যাবরেটরির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র, ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকের ধ্রুপদী চলচ্চিত্র এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্ধশতাধিক কালজয়ী সিনেমার সেলুলয়েড প্রিন্টকে আল্ট্রা-হাই ডেফিনিশন (ফোর-কে) রেজোলিউশনে ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তরিত করা হয়েছে। বিগত কয়েক দশক ধরে যথাযথ তাপমাত্রা ও সংরক্ষণের অভাবে বহু ঐতিহাসিক সিনেমার ৩৫ মিলিমিটার সেলুলয়েড রিল অ্যাসিডিক অবক্ষয়, ছত্রাক ও স্ক্র্যাচে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। নতুন রিস্টোরেশন ল্যাবে স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের লেজার ফিল্ম স্ক্যানার, আল্ট্রাসনিক ফিল্ম ক্লিনিং মেশিন এবং এআই-চালিত ফ্রেম-বাই-ফ্রেম ড্যামেজ রিপেয়ার সফটওয়্যার। বিশেষজ্ঞ ডিজিটাল ইঞ্জিনিয়াররা প্রতিটি ফ্রেমের ধুলাবালি, স্ক্র্যাচ ও কালার ফেইডিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নিখুঁত কায়িক পরিশ্রমে অপসারিত করে মূল ছবির প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা এবং নিখুঁত সাউন্ডট্র্যাক পুনরুদ্ধার করেছেন। পুনরুদ্ধারকৃত কালজয়ী চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জহির রায়হানের 'জীবন থেকে নেয়া', ঋত্বিক ঘটকের 'তিতাস একটি নদীর নাম', খান আতাউর রহমানের 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা' এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কালজয়ী প্রামাণ্যচিত্র 'স্টপ জেনোসাইড'। নবপ্রজন্মের চলচ্চিত্র গবেষক ও শিক্ষার্থীরা যখন ৪কে ডিজিটালাইজড এই মাস্টারপিসগুলো বড় পর্দায় নিখুঁত সাউন্ড ও ঝকঝকে চিত্রে দেখছেন, তখন তারা বিস্মিত ও গর্বিত হয়ে উঠছেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, পুনরুদ্ধারকৃত সকল কালজয়ী সিনেমা সাধারণ মানুষের জন্য বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ক্লাউড ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এবং জাতীয় শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোতে এই ক্লাসিক ছবিগুলোর বিশেষ রেট্রোস্পেক্টিভ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সিনেমার ঐতিহাসিক গভীরতাকে তুলে ধরছে। চলচ্চিত্রবোদ্ধারা বলেছেন, একটি জাতির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে সংরক্ষণ করার সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হলো সিনেমা। ফিল্ম আর্কাইভের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে অনন্তকালের জন্য অমর করে রাখল, যা আগামী শত শত বছর ধরে বাঙালি জাতিকে আত্মমর্যাদার সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচার প্রেরণা জোগাবে।
বাঙালির মনন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তচিন্তার চিরন্তন মিলনমেলা 'অমর একুশে বইমেলা' বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বর্ণাঢ্য ও আনন্দঘন পরিবেশে পূর্ণ উদ্যমে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বসন্তের মৃদু বাতাসে নতুন বইয়ের সুবাসে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা প্রাঙ্গণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থী, লেখক, সাহিত্যিক, পাঠক ও সাধারণ নাগরিক সপরিবারে ছুটে আসছেন মেলায়। স্টলগুলোতে পছন্দের বইয়ের পাতা উল্টানো, প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ গ্রহণ এবং প্রাণবন্ত সাহিত্য আড্ডায় মেলা প্রাঙ্গণ রূপ নিয়েছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক তীর্থভূমিতে। এবারের বইমেলায় এসেছে লক্ষণীয় ডিজিটাল আধুনিকায়ন। মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে চালু করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমৃদ্ধ ডিজিটাল ডিরেক্টরি বুথ এবং মোবাইল অ্যাপ 'একুশে বইমেলা'। এই অ্যাপের মাধ্যমে দর্শকরা এক সেকেন্ডের মধ্যে যেকোনো প্রকাশনীর স্টল নম্বর, নতুন প্রকাশিত বইয়ের নাম এবং মূল্য তালিকা দেখতে পাচ্ছেন। মেলাজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে বিনামূল্যে হাই-স্পিড ওয়াই-ফাই জোন এবং প্রতিটি স্টলে চালু রাখা হয়েছে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা, যা বই কেনাকে করেছে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। প্রকাশকরা জানিয়েছেন, এবারের মেলায় তরুণ ও উদীয়মান লেখকদের রচিত মৌলিক উপন্যাস, ইতিহাসভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর (সায়েন্স ফিকশন) বইগুলো সর্বাধিক বিক্রি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, মেলায় তরুণ প্রজন্মের বই কেনার অভূতপূর্ব আগ্রহ তা পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করেছে। মেলার শিশু চত্বরেও ছিল চোখে পড়ার মতো উপচেপড়া ভিড়; শিশুদের জন্য সিসিমপুরের প্রিয় চরিত্রগুলোর উপস্থিতি এবং কমিকস ও ছড়ার বইয়ের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ এক চমৎকার উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বাংলা একাডেমির মূলমঞ্চে প্রতিদিন বিকেলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গবেষণাধর্মী আলোচনা সভা এবং সন্ধ্যায় পরিবেশিত হচ্ছে দেশের শীর্ষ কণ্ঠশিল্পীদের অংশগ্রহণে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা এক আলোচনা সভায় বলেন, 'একুশে বইমেলা কেবল বই বিক্রির সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক মেলা নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতা চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম, মুক্তচিন্তা ও উদার মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে এই বইমেলা চিরকাল আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।' বইমেলার পরিসমাপ্তিতে লেখক ও প্রকাশকরা এক ঐতিহাসিক বই বিক্রির রেকর্ড উদযাপিত করেছেন। সাহিত্য সমালোচকরা বলেছেন, বইয়ের প্রতি একটি জাতির এই গভীর অনুরাগই প্রমাণ করে যে বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রা কোনো প্রতিকূলতাতেই স্তব্ধ করা সম্ভব নয়। অমর একুশে বইমেলা বাংলার সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চিরন্তন প্রেরণা জোগাবে।