ময়মনসিংহে ঐতিহ্যবাহী খাদি ও খাঁটি রেশম শিল্পের নবজাগরণ: স্বাবলম্বী হচ্ছেন হাজারো গ্রামীণ নারী তাঁতি
ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় ময়মনসিংহ ও শেরপুরের প্রাচীন গ্রামীণ তাঁতপল্লীগুলোতে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক সুতা দিয়ে খাঁটি খাদি ও ঐতিহ্যবাহী রেশম বয়ন শিল্পের এক বর্ণাঢ্য নবজাগরণ সূচিত হয়েছে। সিন্থেটিক কাপড়ের ভিড়ে একসময় হারিয়ে যেতে বসা শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁতশিল্প এখন নতুন নকশা, বৈচিত্র্যময় রঙের মেলবন্ধন এবং টেকসই ফ্যাশনের আন্তর্জাতিক ধারণার সমন্বয়ে ফিরে পেয়েছে তার পুরোনো জৌলুস। রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো এখন সরাসরি এসব তাঁতপল্লী থেকে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির শাড়ি, শাল, ফতুয়া এবং গৃহসজ্জার সুতি বস্ত্র সংগ্রহ করছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ রেশম বোর্ডের সমন্বিত সহায়তায় এলাকার নারী তাঁতিদের জন্য আধুনিক জ্যাকার্ড তাঁত পরিচালনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক রঙের (ন্যাচারাল ডাইং) ওপর উন্নত প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালিত হয়েছে। চা পাতা, খয়ের, গাঁদা ফুল, হরীতকী ও গাছের ছাল থেকে প্রস্তুত সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত ভেষজ রঙে সুতা রাঙিয়ে তাঁতিরা যে মনোমুগ্ধকর টেক্সটাইল তৈরি করছেন, তা স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে।
তাঁতি সমবায় সমিতির নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, সরাসরি আধুনিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। পূর্বে যেখানে কঠোর পরিশ্রমের পর নারী তাঁতিরা নামমাত্র মজুরি পেতেন, এখন তারা প্রতিটি পোশাকের ন্যায্যমূল্য সরাসরি তাদের মোবাইল ওয়ালেটে লাভ করছেন। এর ফলে প্রতিটি পরিবারে নারীরা পরিবারের প্রধান আর্থিক উপার্জনকারীতে পরিণত হয়েছেন।
স্থানীয় অর্থনীতিতে এই পরিবর্তন গভীর সামাজিক প্রভাব ফেলছে। নারী তাঁতিদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা তাদের পরিবারের শিশুদের মানসম্মত স্কুলে পাঠাতে এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতে সক্ষম করেছে। ব্যাংকগুলোও জামানতবিহীন নারী উদ্যোক্তা ঋণের মাধ্যমে তাদের তাঁতের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ওয়ার্কশপ সংস্কারে সহজ শর্তে অর্থায়ন করছে।
সংস্কৃতি ও বস্ত্র গবেষকরা অভিমত দিয়েছেন, ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী খাদি ও রেশম বয়ন কেবল একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি বাঙালির সমৃদ্ধ কারুশিল্পের এক অনন্য জাতীয় সম্পদ। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব 'স্লো ফ্যাশন'-এর যে জোয়ার চলছে, তাতে যথাযথ ব্র্যান্ডিং ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্প বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশকে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবে।

