একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়, যখন কেবল সরকার বা ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র, প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হয়। বাংলাদেশ আজ ঠিক তেমনই এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তন যতই ঘটুক না কেন, যদি নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মতো মৌলিক সাংবিধানিক স্তম্ভগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না করা যায়, তবে একটি টেকসই ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। গণতন্ত্র কোনো কেবল পাঁচ বছর পর পর একটি আনুষ্ঠানিক ভোট প্রদানের মহোৎসব নয়। গণতন্ত্র হলো নাগরিকের অবিসংবাদিত বাকস্বাধীনতা, ভীতিহীন পরিবেশে মতপ্রকাশের অধিকার, আইনের চোখে সর্বজনীন সমতা এবং প্রতিটি সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বচ্ছ জবাবদিহিতা। যখন কোনো রাষ্ট্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে দুর্বল করে ফেলা হয়, তখন সমাজে চরম বৈষম্য, সীমাহীন দুর্নীতি এবং পুঁজি পাচারের মতো সর্বনাশা ক্ষত তৈরি হয়। বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এই প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য বা 'চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস' চিরতরে সংবিধানে এমনভাবে প্রোথিত করা, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করতে না পারে। জাতীয় ঐক্য বিনির্মাণে সকল রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক খোলামেলা ও আন্তরিক সংলাপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অতীতে বিভাজন ও পারস্পরিক শত্রুতার যে অন্ধ রাজনীতি দেশকে বারংবার পেছনে ঠেলে দিয়েছে, সেই আত্মঘাতী পথ পরিহার করার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। একটি সর্বসম্মত 'জাতীয় গণতান্ত্রিক সনদ' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকবে যে, মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও জাতীয় সার্বভৌমত্ব, মৌলিক মানবাধিকার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে দেশের তরুণ সমাজের কথা। যে স্বপ্ন ও আদর্শ বুকে ধারণ করে এ দেশের তরুণরা বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে, তাদের সেই রক্ত ও ত্যাগকে অর্থবহ করতে হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধা, সততা ও যোগ্যতার নিঃশর্ত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে যদি মেধার শাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে মেধা পাচার ঠেকানো যাবে না এবং একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞানভিত্তিক বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত স্থান দখল করতে ব্যর্থ হবে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যেসব জাতি সুযোগের সঠিক মূল্যায়ন করে সাহসী কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করেছে, তারাই পৃথিবীতে মর্যাদা ও সমৃদ্ধির শীর্ষে আরোহণ করেছে। সাময়িক ক্ষমতা বা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা একটি স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সার্বজনীন মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা একটি নিরাপদ, গর্বিত ও সমৃদ্ধ স্বদেশ হস্তান্তর করে যেতে পারব। পরিবর্তনের এই ঐতিহাসিক ডাক যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়—এটাই আজ সমগ্র জাতির একান্ত প্রার্থনা।
একটি উদীয়মান উন্নয়নশীল দেশের প্রকৃত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক আত্মমর্যাদা সরাসরি নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের ওপর। বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে এগিয়ে চলেছে, তখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈদেশিক ঋণের দায় পরিশোধ, রাজস্ব আয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং একক তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত রপ্তানি নির্ভরতা। এই ত্রিবিধ চ্যালেঞ্জকে যদি এখনই গভীর দূরদর্শিতা ও আর্থিক শৃঙ্খলার সাথে মোকাবেলা করা না যায়, তবে আন্তর্জাতিক অর্থবাজারের অস্থিরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর সংকটে নিমজ্জিত করতে পারে। বিগত বছরগুলোতে যেসব মেগা অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, তাদের অর্থনৈতিক উপযোগিতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ঋণ ও দ্বিপাক্ষিক ঋণের সুদের হার এবং কিস্তির পরিমাণ এখন রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে। অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল প্রকল্পে নতুন ঋণ গ্রহণ বন্ধ করে ঋণের গুণগত মান যাচাই করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, প্রতিটি ডলার ঋণ যেন কেবল এমন প্রকল্পে ব্যয় হয় যা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পারে অথবা আমদানির বিকল্প তৈরি করে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটায়। আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দুর্বলতা হলো এর একক পোশাক নির্ভরতা। দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে কেবল একটি খাত থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো কারণে পোশাকের চাহিদা বা বাণিজ্য নীতিমালায় পরিবর্তন ঘটলে পুরো জাতীয় অর্থনীতি চরম ঝুঁকিতে পড়ে। এই ঝুঁকি থেকে বাঁচতে হলে চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স এবং সফটওয়্যার খাতের মতো উচ্চ সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে পোশাক শিল্পের সমপরিমাণ শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি ও প্রণোদনা সুবিধা প্রদান করতে হবে। আভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন অপরিহার্য। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত (মাত্র ৮ শতাংশ) দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বনিম্ন। এর মূল কারণ হলো উচ্চবিত্ত কর ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং কর প্রশাসনকে শতভাগ ডিজিটাল না করা। সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর নতুন কর চাপানোর পরিবর্তে শীর্ষ ধনকুবের ও মেগা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর ফাঁকি বন্ধ করা গেলে রাজস্ব বাজেট দ্বিগুণ করা সম্ভব, যা দেশকে বিদেশি ঋণের ভিক্ষার হাত থেকে চিরতরে মুক্ত করবে। পরিশেষে বলতে হয়, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা কোনো অলীক স্বপ্ন নয়; এটি সুপরিকল্পিত নীতির সাহসী বাস্তবায়ন। যদি আমরা অর্থ পাচার চিরতরে বন্ধ করতে পারি, জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারি এবং বিশ্ববাজারে নিজস্ব ব্র্যান্ডের বৈচিত্র্যময় পণ্য নিয়ে দাঁড়াতে পারি, তবেই বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান ও অক্ষয় সম্পদ হলো তার মানবসম্পদ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের বিদ্যমান সনাতন শিক্ষা ব্যবস্থা যুগের পর যুগ ধরে লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে কেবল পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উগড়ে দেওয়ার এক যান্ত্রিক সনদনির্ভর কেরানি তৈরিতে নিয়োজিত রেখেছে। এর ফলে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও কর্মক্ষেত্রে তাদের ব্যবহারিক দক্ষতার চরম ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে দেশের লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের হতাশায় নিমজ্জিত, অন্যদিকে দেশীয় শিল্প কারখানাগুলোকে উচ্চ বেতনে বিদেশ থেকে কারিগরি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে হচ্ছে। এই আত্মঘাতী প্যারাডক্স থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হলে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষাক্রমের আমূল পরিবর্তন অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করানোর পরিবর্তে তাদের মনে অনুসন্ধিৎসু প্রশ্ন করার অভ্যাস, বৈজ্ঞানিক যুক্তি বিচার, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (প্রবলেম সলভিং) এবং সৃজনশীল বিশ্লেষণ ক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষাকে ভীতিপ্রদ না করে হাতে-কলমে প্র্যাকটিক্যাল ল্যাবরেটরি ও প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে আনন্দময় করে তুলতে হবে। একই সাথে নৈতিক শিক্ষা, দেশপ্রেম এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে পাঠ্যক্রমে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাতে প্রতিটি শিশু একজন আলোকিত মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাকে প্রধান ধারার সমকক্ষ মর্যাদা দিতে হবে। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও জাপানের 'ডুয়েল ভোকেশনাল ট্রেনিং' মডেল অনুসরণ করে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক কোডিং, রোবোটিক্স, মেকানিক্যাল ড্রাফটিং, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির বাস্তব প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। কোনো শিক্ষার্থী যেন ডিগ্রি শেষ করে সনদ হাতে নিয়ে চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে না ঘোরে; বরং তার অর্জিত বাস্তব দক্ষতা যেন তাকে তাৎক্ষণিকভাবে কর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা হওয়ার আত্মবিশ্বাস জোগায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল স্নাতক তৈরির কারখানা না রেখে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও উদ্ভাবনের জীবন্ত গবেষণাগারে রূপান্তর করতে হবে। উচ্চশিক্ষা বাজেটের সিংহভাগ গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়া এবং দেশীয় শিল্প খাতের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি যৌথ গবেষণা চুক্তি সম্পাদন করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানের পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশনা এবং গবেষণার মৌলিকত্বকে একমাত্র মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং জাতির ভবিষ্যতের সবচেয়ে লাভজনক দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষায় জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করে যদি আমরা শিক্ষকদের মর্যাদা, বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক ক্লাসরুম নিশ্চিত করতে পারি, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম বিশ্বমঞ্চে যেকোনো উন্নত দেশের বিজ্ঞানীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।
বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের কোনো দায় নেই বললেই চলে। বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্র ০.৪৭ শতাংশের কম নির্গমন করে বাংলাদেশ। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান ও নিচু ব-দ্বীপ প্রকৃতির কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সবচেয়ে বিধ্বংসী ও প্রাণঘাতী আঘাতের শিকার হচ্ছে আমাদের উপকূলের লাখ লাখ নিরপরাধ প্রান্তিক মানুষ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার ভয়াল থাবা, ঘন ঘন প্রলয়ঙ্করী সুপার সাইক্লোন এবং নদীভাঙনে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে উন্নত ধনী দেশগুলো দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অর্থায়নের নানা চটকদার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসলেও বাস্তবে তার অতি সামান্য অংশই ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে পৌঁছেছে। আরও লজ্জাজনক বিষয় হলো, জলবায়ু ক্ষতিপূরণের নামে উন্নত বিশ্ব আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অনুদানের পরিবর্তে উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। যে সংকট উন্নত বিশ্বের অতি-ভোগবাদ ও জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্টি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ মেটাতে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র দেশকে কেন নতুন ঋণের জালে আবদ্ধ হতে হবে? এই দ্বিচারিতা ও অন্যায় নীতিকে আন্তর্জাতিক ফোরামে অবিলম্বে রুখে দিতে হবে। জলবায়ু অর্থায়ন কোনো আন্তর্জাতিক করুণা বা অনুকম্পা নয়; এটি জলবায়ু ন্যায়বিচার (ক্লাইমেট জাস্টিস) এবং ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। 'পলিউটার পেইজ প্রিন্সিপল' বা দূষণকারীর ক্ষতিপূরণ প্রদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত নীতি অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোকে নিঃশর্তভাবে শতভাগ অনুদানভিত্তিক 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের হাতে তুলে দিতে হবে। এই তহবিলের অর্থ আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত হতে হবে, যাতে তা সরাসরি উপকূলীয় স্থায়ী সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, টেকসই বেড়িবাঁধ সুরক্ষা এবং জলবায়ু শরণার্থীদের মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনে ব্যয় করা যায়। বাংলাদেশ তার নিজস্ব সীমিত সামর্থ্যে অভিযোজন প্রযুক্তিতে বিশ্বে এক অনন্য রোল মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। লবণাক্ততা-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, ভাসমান সবজি চাষ এবং কমিউনিটি সাইক্লোন প্রস্তুতিতে এ দেশের মানুষের বীরত্বপূর্ণ লড়াই আজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। কিন্তু বৈশ্বিক তাপমাত্রা যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করে, তবে কেবল স্থানীয় অভিযোজন দিয়ে লাখ লাখ উপকূলীয় মানুষকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। শিল্পোন্নত দেশগুলোকে তাদের কার্বন নির্গমন অবিলম্বে কঠোরভাবে কমিয়ে আনতে হবে। আন্তর্জাতিক আদালতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে বাংলাদেশ ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর যৌথ আইনি লড়াইকে আরও জোরদার করতে হবে। আমরা করুণা চাই না, আমরা আমাদের বাঁচার অধিকার চাই। বিশ্ব বিবেককে বুঝতে হবে, যদি বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশগুলো ডুবে যায়, তবে সেই বিপর্যয় কেবল এই ব-দ্বীপে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক শরণার্থী সংকট ও খাদ্য নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে পুরো মানবসভ্যতাকে চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।
বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি রাজধানী ঢাকা আজ এক চরম অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুঃসহ যানজট, নদী দখল এবং বায়ুদূষণের শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতার মুখোমুখি। দেশের মোট ভূখণ্ডের মাত্র এক শতাংশ আয়তন নিয়ে ঢাকা আজ সমগ্র জাতীয় অর্থনীতির অর্ধেকেরও বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আড়াই কোটিরও বেশি মানুষের বোঝা বহন করছে। সচিবালয় থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষ বিশেষায়িত হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক সদর দপ্তর এবং আদালতের সবই এই একক শহরের ওপর পুঞ্জীভূত। এই অতি-কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে এবং একই সাথে অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোকে সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে। ঢাকাকে একটি স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য আধুনিক শহরে রূপান্তর করতে হলে প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো কার্যকর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। সরকারি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর অপ্রয়োজনীয় দপ্তর, পাইকারি কাঁচাবাজার, কেমিক্যাল গুদাম এবং চামড়া ও টেক্সটাইলের মতো ভারী বাণিজ্যিক কার্যক্রমগুলোকে অবিলম্বে ঢাকার বাইরে সুপরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহরে স্থানান্তর করতে হবে। বিভাগীয় শহরগুলোতে আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল ও আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে উন্নত চিকিৎসা বা শিক্ষার আশায় প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের ঢাকায় ছুটে আসার প্রবণতা স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। শহরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত গাড়ির প্রাধান্য কমিয়ে গণপরিবহন ও রেলভিত্তিক ম্যাস ট্রানজিটকে প্রধান নেটওয়ার্ক করতে হবে। মেট্রোরেলের নেটওয়ার্ককে শহরের প্রতিটি কোনায় বিস্তৃত করার পাশাপাশি হাজার হাজার পুরনো ও ফিটনেসবিহীন বাসের বদলে সুশৃঙ্খল বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি (ই-বাস নেটওয়ার্ক) চালু করা জরুরি। ফুটপাতগুলোকে হকার ও দখলমুক্ত করে পথচারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং নিরাপদ সাইকেল লেন নির্মাণ করা গেলে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে মানুষ ব্যক্তিগত মোটরযানের ওপর নির্ভরতা ত্যাগ করবে, যা যানজট ও দূষণ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনবে। ঢাকার প্রাকৃতিক ফুসফুস ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীকে দখল ও শিল্প বর্জ্যের বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্ত করে জীবন্ত নদী হিসেবে ফিরিয়ে আনতে হবে। শহরের বিলুপ্তপ্রায় খালগুলোকে উদ্ধার করে একটি নিরবচ্ছিন্ন জলজ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও আধুনিক ওয়াকওয়ে নির্মাণ করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে উন্মুক্ত পার্ক, খেলার মাঠ এবং ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করে সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি করতে হবে, যা শহরের অতিরিক্ত উত্তাপ (হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট) কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। একটি মেগাসিটি কেবল ইট, রড আর কংক্রিটের জঙ্গল হতে পারে না; শহরকে হতে হয় মানুষের বেঁচে থাকার আনন্দময় আশ্রয়স্থল। ঢাকা কোনো পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ নয়; এটি আমাদের গৌরবময় ইতিহাস ও সংস্কৃতির রাজধানী। সঠিক নগর পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে ঢাকাকে একটি আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই মেগাসিটি হিসেবে পুনর্জন্ম দেওয়া এখনও সম্ভব। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে; এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক ভয়াবহ নাগরিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।
একটি সভ্য, দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণমাধ্যম হলো সমাজের আয়না এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু যখন কোনো রাষ্ট্রে সত্য প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, সাংবাদিকদের হয়রানিমূলক আইনের জালে আবদ্ধ করা হয় এবং গণমাধ্যমের ওপর অদৃশ্য সেন্সরশিপের ছায়া চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার ভুল সংশোধনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যে সমাজে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, সেখানেই দুর্নীতি অপ্রতিরোধ্য হয়েছে, ব্যাংকিং খাত ধসে পড়েছে এবং সমাজে বৈষম্যের বিষবৃক্ষ ডালপালা মেলেছে। মুক্ত গণমাধ্যম কোনো রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়; বরং তা জাতীয় সুরক্ষার অন্যতম প্রধান ঢাল। সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো তথ্যপ্রবাহের অবাধ স্বাধীনতা। সরকার বা প্রশাসনের কোনো স্তরে যদি কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটে, তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের কাজের মাধ্যমেই তা প্রথম প্রকাশ্যে আসে। একজন সৎ সাংবাদিক যখন সমাজ বা রাষ্ট্রের কোনো ত্রুটি তুলে ধরেন, তখন তিনি কোনো শত্রুতা করেন না; বরং তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রকে সেই ত্রুটি সংশোধন করার একটি অনন্য সুযোগ উপহার দেন। যে সকল শাসক সত্য উদঘাটনকারী সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেন, তারা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের পায়ের নিচের মাটিকেই দুর্বল করে তোলেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষায় সর্বাগ্রে প্রয়োজন সাংবাদিকদের আইনি ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অতীতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা নিবর্তনমূলক ও কঠোর ডিজিটাল আইনগুলো বাতিল করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্পন্ন বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কোনো সাংবাদিকের ওপর শারীরিক আক্রমণ বা হুমকি প্রদানকে কঠোর শাস্তিযোগ্য রাষ্ট্রীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। একই সাথে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে সাংবাদিক হত্যার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীনতার পাশাপাশি গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ দায়িত্বশীলতা ও বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষা করাও অত্যন্ত জরুরি। কোনো প্রকার দলীয় বা করপোরেট এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার না হয়ে গণমাধ্যমকে শতভাগ জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। পক্ষপাতহীন ও সঠিক তথ্য যাচাইয়ের (ফ্যাক্ট-চেকিং) সর্বোচ্চ মানদণ্ড মেনে সংবাদ প্রকাশ করলেই কেবল পাঠকদের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব। সাংবাদিকদের জন্য সম্মানজনক বেতন কাঠামো ও নিয়মিত ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন করা জরুরি, যাতে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কোনো সাংবাদিক আপস করতে বাধ্য না হন। গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি যদি স্বাধীনভাবে ও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে রাষ্ট্রের বাকি তিনটি স্তম্ভ—আইনসভা, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ—তাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হয়। মুক্ত চিন্তার বিকাশ, মত প্রকাশের অবাধ পরিবেশ এবং সাংবাদিকদের সত্য বলার সাহসের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ, সুন্দর ও স্বৈরাচারমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ।
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের আসল পরিচয় প্রকাশ পায় তার নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য ও অসুস্থতার সময় তাদের পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের গভীরতায়। বাংলাদেশে বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থার সবচেয়ে নির্মম ও বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো যে, একজন নাগরিকের চিকিৎসার ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি অর্থ তাকে নিজের পকেট থেকে (আউট-অব-পকেট এক্সপেনডিচার) সরাসরি পরিশোধ করতে হয়। প্রতি বছর পরিবারের কোনো সদস্যের ক্যান্সার, কিডনি ডায়ালাইসিস, হৃদরোগ কিংবা জটিল অস্ত্রোপচারের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে লাখ লাখ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার তাদের সহায়-সম্বল বিক্রি করে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে পতিত হচ্ছে। এটি কেবল একটি চিকিৎসা সংকট নয়; এটি একটি গভীর মানবিক ও সামাজিক অবিচার। এই বিপর্যয় থেকে দেশের কোটি কোটি পরিবারকে রক্ষা করতে হলে একটি জাতীয় সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি (ইউএইচসি) এবং বাধ্যতামূলক 'জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা' চালু করা রাষ্ট্রের এক নম্বর অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যেভাবে কর-অর্থায়ন ও সামাজিক স্বাস্থ্যবীমার সমন্বয়ে প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছে, সেই সফল মডেলের আলোকে আমাদের একটি শক্তিশালী জাতীয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে গঠিত এই তহবিলের মাধ্যমে যেকোনো নাগরিকের জরুরি ও জটিল চিকিৎসা খরচ সরাসরি রাষ্ট্রীয় বীমা থেকে পরিশোধ করা হবে। জাতীয় স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সর্বাগ্রে প্রয়োজন তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে শতভাগ সক্রিয় ও বিশ্বমানের করা। প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার আধুনিক ল্যাবরেটরি, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ব্যাকআপ এবং শতভাগ জীবনরক্ষাকারী ওষুধের বিনামূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকদের উপজেলা পর্যায়ে পদায়ন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন, সন্তানদের আধুনিক শিক্ষার সুযোগ এবং উচ্চতর প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো হাসপাতাল চিকিৎসকবিহীন না থাকে। ওষুধের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অতিরিক্ত ফি আদায় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্বাধীন 'স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক কমিশন' গঠন করা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় মেডিকেল টেস্ট করিয়ে রোগীদের আর্থিক রক্তক্ষরণ ঘটানো কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। রোগ নির্ণয়ের প্রতিটি ফি এবং হাসপাতালের প্রতিটি সেবার খরচ সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট করে প্রকাশ্য চার্টে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা উচিত। স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ বর্তমানে জিডিপির মাত্র ১ শতাংশেরও কম, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (কমপক্ষে ৫ শতাংশ) থেকে অনেক নিচে। স্বাস্থ্য খাতের এই বরাদ্দকে কোনো দয়া বা অনুদান নয়, বরং দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ রক্ষার সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একজন নাগরিক যখন জানবেন যে অসুস্থ হলে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে, তখন তার আত্মবিশ্বাস ও জাতীয় উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করাই হোক আমাদের আগামী বাংলাদেশের প্রধান অঙ্গীকার।
নদীমাতৃক বাংলাদেশ কেবল একটি ভৌগোলিক উক্তি নয়; নদীই হলো এই জনপদের জীবন, সভ্যতা, কৃষি ও অর্থনীতির মূল ধমনী। শত শত নদী জালের মতো ছড়িয়ে থেকে এই ব-দ্বীপকে উর্বর ও সমৃদ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার দাপট, প্রভাবশালী দখলদারদের আগ্রাসন এবং অনিয়ন্ত্রিত বিষাক্ত শিল্প বর্জ্যের কারণে আমাদের নদীগুলো আজ ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা থেকে শুরু করে কর্ণফুলী পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নদী আজ দূষণের বিষবাষ্পে জর্জরিত এবং দখলদারদের তৈরি অবৈধ বহুতল ভবন, ইটভাটা আর কলকারখানায় সংকুচিত হয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদী হত্যা মানে প্রকারান্তরে দেশের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বকেই খুন করা। নদী রক্ষার লড়াইয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ঐতিহাসিক রায় দিয়ে নদীকে 'জীবন্ত সত্তা' বা লিগ্যাল পারসন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। নদীগুলোর সুরক্ষায় গঠিত হয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। কিন্তু আদালতের যুগান্তকারী আদেশ এবং কমিশনের সুস্পষ্ট তালিকা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আমলাতান্ত্রিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে শীর্ষ দখলদারদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি। ছোটখাটো টং দোকান উচ্ছেদ করে বাহবা নেওয়া হলেও প্রভাবশালী শিল্পপতি ও রিয়েল এস্টেট চক্রের দখলে থাকা নদীর শত শত একর জমি উদ্ধারে প্রশাসন প্রায়শই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এই অসম ও আপসকামী দৃষ্টিভঙ্গির অবসান ঘটাতে হবে এখনই। নদী সুরক্ষায় শূন্য সহনশীলতার (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করতে হবে। নদীর সীমানা নির্ধারণে ডিজিটাল জিআইএস ম্যাপিং এবং সিএস রেকর্ডের ভিত্তিতে স্থায়ী পিলার স্থাপন করতে হবে। নদীর জায়গায় গড়ে ওঠা যে কোনো অবৈধ স্থাপনা—তা যত প্রভাবশালী ব্যক্তিরই হোক না কেন—বিনা দ্বিধায় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি যেসব কারখানা অপরিশোধিত বিষাক্ত কেমিক্যাল সরাসরি নদীতে ফেলছে, তাদের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ তাৎক্ষণিক বিচ্ছিন্ন করাসহ কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে কঠোর মামলা দায়ের করতে হবে। নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারে বৈজ্ঞানিক ও দীর্ঘমেয়াদী ড্রেজিং মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া জরুরি। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। নদীর দুই তীর দখলমুক্ত করে সবুজ বৃক্ষরোপণ এবং দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করতে হবে, যাতে নাগরিকরা সরাসরি নদীর সাথে সংযুক্ত হতে পারেন। যখন জনগণ নদীর পাড়ে হাঁটবেন এবং নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করবেন, তখন তারাই নদীর সবচেয়ে শক্তিশালী পাহারাদারে পরিণত হবেন। নদী বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ, নদী মরলে মরবে দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক অভিঘাত যখন আমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে, তখন আমাদের নিজস্ব নদীগুলোকে রক্ষা করা জাতীয় টিকে থাকার প্রধান লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত দৃঢ়তায় নদী দখলদার ও দূষণকারীদের চিরতরে পরাজিত করে বাংলার নদীগুলোকে তাদের চিরন্তন সজীবতা ও অবাধ প্রবাহে ফিরিয়ে দিতে হবে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে 'জনমিতিক লভ্যাংশ' বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হলো এক দুর্লভ ও সোনালী আশীর্বাদ, যা কোনো জাতির জীবনে শতাব্দীতে কেবল একবারই আসে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই তরুণ, যাদের বয়স পঁচিশ বছরের নিচে। এই বিশাল, উদ্যমী ও প্রাণবন্ত তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যেকোনো দেশের জন্য একটি অভাবনীয় অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। তবে ইতিহাস অত্যন্ত কঠোরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জনমিতিক লভ্যাংশ কোনো চিরস্থায়ী সুযোগ নয়। আগামী দুই দশকের মধ্যে এই তরুণ জনগোষ্ঠী যখন প্রবীণ হতে শুরু করবে, তখন যদি তাদের সঠিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত না করা যায়, তবে এই আশীর্বাদটিই এক ভয়াবহ সামাজিক বোঝা ও জনমিতিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে। আমাদের তরুণদের অমিত মেধা ও সক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। বিশ্বজুড়ে ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার কোডিং, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড থেকে শুরু করে উদ্ভাবনী স্টার্টআপে আমাদের তরুণরা প্রতিনিয়ত নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি এই মেধার বিকাশে পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে পেরেছে? আমাদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও যুগোপযোগী বিশ্বমানের পাঠ্যক্রমের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় মুখস্থবিদ্যার পেছনে তরুণদের সোনালী সময় নষ্ট করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, বায়োটেকনোলজি এবং ডেটা সায়েন্সের এই আধুনিক যুগে যদি আমাদের তরুণদের গ্লোবাল স্কিলস বা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা না দেওয়া যায়, তবে তারা বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে রাষ্ট্রকে সর্বাগ্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা সহায়তায় বৈপ্লবিক বিনিয়োগ করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন স্বল্প সুদে স্টার্টআপ ক্যাপিটাল, মেন্টরশিপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রশাসনিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ করে একটিমাত্র ডিজিটাল ক্লিকের মাধ্যমে যাতে একজন তরুণ তার প্রতিষ্ঠান চালু করতে পারেন, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য হ্রাস করে দেশের প্রতিটি প্রত্যন্ত চরাঞ্চলেও নিরবচ্ছিন্ন ব্রডব্যান্ড নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গ্রামের একজন তরুণও ঘরে বসে গ্লোবাল আইটি বাজারে নিজের মেধা বিক্রি করতে পারেন। একই সাথে মানসিক স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মুক্ত ক্রীড়াচর্চার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে তরুণদের সৃজনশীল ও শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। মাদকাসক্তি, অপরাধপ্রবণতা এবং সামাজিক হতাশার হাত থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় খেলার মাঠ, আধুনিক লাইব্রেরি এবং উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করতে হবে, যাতে তারা নিজেদের দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সরাসরি অংশীদার হতে পারেন। সময় দ্রুত বয়ে চলেছে। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যখন কাজের ধরন চিরতরে বদলে দিচ্ছে, তখন আমাদের তরুণ প্রজন্মই হতে পারে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্রের মর্যাদায় পৌঁছে দেওয়ার প্রধান সেনানী। এই ঐতিহাসিক সুযোগ হেলায় হারালে ভবিষ্যৎ ইতিহাস আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। তরুণদের মেধা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং অদম্য দেশপ্রেমের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে তাদের পাশে দাঁড়ানোই হোক আজকের বাংলাদেশের প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার।
আঠারো কোটি মানুষের প্রতিদিনের অন্ন সংস্থানকারী এ দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরাই হলেন বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত ও নিঃস্বার্থ বীর সেনানী। ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততার মতো চরম প্রতিকূলতার সাথে অবিরাম যুদ্ধ করে তারা এ দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলান, বাজারের মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের নির্মম শোষণে সেই কৃষকই তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। একদিকে ধান কাটার মৌসুমে ধানের পানির দর, অন্যদিকে বাজারে চাল কিনতে গিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত ভোক্তার নাভিশ্বাস—এই নিষ্ঠুর প্যারাডক্স আমাদের কৃষি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কলঙ্ক। জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাত আজ সরাসরি আঘাত হানছে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তিতে। সমুদ্রের নোনা পানির অনুপ্রবেশের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ হেক্টর উর্বর ফসলি জমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় বোরো ধানের সেচ খরচ কৃষকদের জন্য এক অসহনীয় বোঝায় পরিণত হয়েছে। এই দ্বিমুখী সংকট থেকে কৃষিকে বাঁচাতে হলে প্রচলিত সনাতন কৃষি পদ্ধতির বদলে জলবায়ু-সহনশীল স্মার্ট প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আমাদের গবেষণাগারগুলোতে আবিষ্কৃত লবণাক্ততা, খরা ও জলমগ্নতা-সহনশীল আধুনিক ধানের জাতগুলোকে দ্রুত মাঠ পর্যায়ে কৃষকের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। কৃষিতে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক জৈব সার ও আইপিএম (সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা) পদ্ধতির প্রসার ঘটাতে হবে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে সেচ কাজে নদী ও খালের উপরিভাগের পানি (সারফেস ওয়াটার) ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। সোলার সেচ পাম্পের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করে ডিজেলচালিত সেচের ব্যয়বহুল ও দূষণকারী ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন খাদ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। সরকারি ধান-চাল সংগ্রহে মধ্যস্বত্বভোগী ও দলীয় ক্যাডারদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ওয়ালেটে টাকা পরিশোধের ডিজিটাল সিস্টেম চালু করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার এবং শস্য গুদাম স্থাপন করতে হবে, যাতে ফসল তোলার পরপরই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য না হয়ে কৃষক তার পণ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করতে পারেন এবং উপযুক্ত সময়ে ভালো দামে বিক্রি করতে পারেন। খাদ্য নিরাপত্তা কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি সরাসরি রাষ্ট্রের জাতীয় সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে দেশ অন্যের খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল, তার স্বাধীনতা কখনোই নিরাপদ হতে পারে না। আমাদের কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো কোনো অনুকম্পা নয়, এটি আমাদের নিজেদের বেঁচে থাকার নৈতিক ও কৌশলগত দায়িত্ব। ক্ষুদ্র কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত করতে পারলেই বাংলাদেশ চিরকাল খাদ্য ও পুষ্টিতে স্বাবলম্বী হয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।