বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং জাতীয় জ্ঞানভাণ্ডারকে ডিজিটাল বিশ্বে প্রযুক্তির শীর্ষ শিখরে প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌম লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) 'স্বাধীন এআই' আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিসিসি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক জমকালো প্রযুক্তি সম্মেলনে দেশের শীর্ষ কম্পিউটার বিজ্ঞানী, সফটওয়্যার প্রকৌশলী এবং নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক মডেলটির উন্মোচন ঘটে। 'স্বাধীন এআই' সম্পূর্ণ দেশীয় সুপারকম্পিউটিং ক্লাস্টারে প্রশিক্ষিত একটি ৭০ বিলিয়ন প্যারামিটারের স্টেট-অব-দ্য-আর্ট ফাউন্ডেশনাল মডেল। দেশের প্রাচীন পুঁথি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দলিলপত্র, বাংলা একাডেমি অভিধান, রবীন্দ্র-নজরুল সাহিত্যসমগ্র থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞান, আইন ও চিকিৎসাবিদ্যার প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন বাংলা টোকেন ডেটাসেটের ওপর এই মডেলটিকে বিশেষায়িতভাবে ট্রেন করা হয়েছে। এর ফলে ইংরেজি মডেলগুলোর মতো কোনো পরোক্ষ অনুবাদ নির্ভরতা ছাড়াই এটি সরাসরি খাঁটি বাংলায় জটিল দার্শনিক, আইনি, প্রশাসনিক ও সাহিত্যিক প্রশ্নের অত্যন্ত মার্জিত উত্তর প্রদানে সক্ষম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইসিটি উপদেষ্টা জানান, সরকারি সেবা ডিজিটাইজেশন, ই-নথি ব্যবস্থাপনা এবং বিচার বিভাগের আইনি নথি পর্যালোচনায় 'স্বাধীন এআই' সরাসরি ইন্টিগ্রেট করা হচ্ছে। এর ফলে একজন সাধারণ প্রান্তিক নাগরিক নিজের আঞ্চলিক ভাষায় ভয়েস কমান্ড দিয়ে যেকোনো সরকারি ভাতা, কৃষি পরামর্শ বা চিকিৎসা সেবার বিস্তারিত নির্দেশনা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জানতে পারবেন। দৃষ্টি ও বাকপ্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য এই মডেলের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম অডিও-টু-টেক্সট এবং টেক্সট-টু-স্পিচ প্রযুক্তি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটির নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব প্রসঙ্গে গবেষক দল জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক এআই প্ল্যাটফর্মগুলোর মতো 'স্বাধীন এআই' এর ডেটা কখনোই বিদেশের কোনো থার্ড-পার্টি সার্ভারে সংরক্ষিত হবে না। কালিয়াকৈর জাতীয় ডেটা সেন্টারে সম্পূর্ণ সাইবার নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে এই মডেলের ক্লাউড অবকাঠামো পরিচালিত হচ্ছে। এতে দেশের গোপনীয় রাষ্ট্রীয় ডেটা, আইনি নথিপত্র এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের শতভাগ সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকবে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থা এবং ওপেন সোর্স এআই গবেষকরা বাংলাদেশের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তারা বলছেন, বিশ্বের সপ্তম সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা হিসেবে বাংলাকে এআই-এর প্রথম সারিতে স্থান দেওয়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার জন্যও এক অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত। স্বাধীন এআই বাংলাদেশের তরুণ সফটওয়্যার ডেভেলপার ও স্টার্টআপদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করল, যা দেশের আইসিটি রপ্তানিকে বিলিয়ন ডলারের পথে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের বহুল প্রতীক্ষিত আধুনিকায়ন সম্পন্ন করে রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীর প্রধান বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকাগুলোতে সফলভাবে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক পঞ্চম প্রজন্মের (৫জি) মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা চালু করেছে শীর্ষস্থানীয় মোবাইল অপারেটরগুলো। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কর্তৃক সাম্প্রতিক সফল স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ নিলাম এবং আধুনিক অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপনের ফলেই এই অতি উচ্চগতির ডিজিটাল কানেক্টিভিটি গ্রাহকের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হলো। নতুন ৫জি নেটওয়ার্কের প্রাথমিক স্পিড টেস্টে দেখা গেছে, গ্রাহকরা প্রতি সেকেন্ডে গড়ে ১ গিগাবিট থেকে ১.৫ গিগাবিট (জিবিপিএস) পর্যন্ত ডাউনলোড স্পিড পাচ্ছেন, যা বিদ্যমান ফোর-জি গতির চেয়ে প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ গুণ দ্রুত। এই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর অতি স্বল্প ল্যাটেন্সি বা ডেটা আদান-প্রদানের সময়সীমা, যা মাত্র ৩ থেকে ৫ মিলিসেকেন্ডে নেমে এসেছে। এর ফলে মোবাইল গেমিং, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) প্রযুক্তিতে ব্যবহারকারীরা উপভোগ করছেন নিরবচ্ছিন্ন বাফারিংবিহীন অভিজ্ঞতা। কেবল ব্যক্তিগত যোগাযোগেই নয়; শিল্প কারখানার আধুনিকায়ন ও অটোমেশনে এই ৫জি প্রযুক্তি ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখছে। চট্টগ্রামের ইপিজেড এবং মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরের একাধিক আধুনিক পোশাক ও ভারী শিল্প কারখানা ইতোমধ্যে প্রাইভেট ৫জি নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছে। এই উচ্চগতির লাইনের সাহায্যে কারখানার স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক উৎপাদন লাইন, এআই কোয়ালিটি স্ক্যানার এবং স্বয়ংক্রিয় মালামাল পরিবহন যান (এজিভি) কেন্দ্রীয় সার্ভারের সাথে রিয়েল-টাইমে সংযুক্ত থেকে ত্রুটিহীনভাবে কাজ করছে, যা উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্বাস্থ্য ও টেলিমেডিসিন খাতেও এই প্রযুক্তির ইতিবাচক সুফল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ৫জি নির্ভর হাই-ডেফিনিশন টেলি-সার্জারি এবং রিয়েল-টাইম ভিডিও কনসালটেশন সফলভাবে শুরু হয়েছে। এর ফলে রাজধানী না এসেও গ্রামের জটিল রোগীরা শীর্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সরাসরি পরামর্শ ও রোগ নির্ণয়ের সুবিধা পাচ্ছেন। বিটিআরসি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সকল জেলা সদর এবং হাইওয়ে করিডোরে এই ৫জি কভারেজ সম্প্রসারিত করা হবে। পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্যে সাধারণ নাগরিকদের জন্য ৫জি স্মার্টফোনের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে দেশীয় মোবাইল সংযোজনকারী কারখানাগুলোতে বিশেষ ভ্যাট ও শুল্ক সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরকে এক অপ্রতিরোধ্য গতি প্রদান করবে।
ডিজিটাল অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর (সিআইআই) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধীদের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের অধীনস্থ 'বিজিডি ই-গভ সার্ট' এক সর্বাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন জাতীয় সাইবার ডিফেন্স শিল্ড মোতায়েন করেছে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গ্রিড, জাতীয় পরিচয়পত্র ডেটাবেস, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানসহ ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি এই সেন্ট্রাল সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টারের (এসওসি) সাথে রিয়েল-টাইমে সংযুক্ত করা হয়েছে। নতুন এই সাইবার শিল্ডে যুক্ত করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের এআই এনোমালি ডিটেকশন এবং জিরো-ট্রাস্ট আর্কিটেকচার। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে আসা সন্দেহজনক আইপি ট্রাফিক, ডিডস (ডিডিঅএস) আক্রমণ কিংবা ম্যালওয়্যার অনুপ্রবেশের চেষ্টা শনাক্ত হলে সিস্টেমটি মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আক্রমণকারী আইপি ব্লক করে নিরাপত্তা ফায়ারওয়াল শক্তিশালী করে তুলছে। এর ফলে বিগত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক হ্যাকার চক্রের একাধিক গোপন সাইবার হামলার চেষ্টা সফলভাবে ব্যর্থ করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সাইবার যুদ্ধ একটি বিপজ্জনক বাস্তবতা। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থার ডিজিটাল নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখা সরাসরি জাতীয় সার্বভৌমত্বের অংশ। বিজিডি ই-গভ সার্ট-এর সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের পাশাপাশি প্রতিটি সদস্য প্রতিষ্ঠানে বিশেষায়িত কম্পিউটার সিকিউরিটি ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা নিজস্ব সিস্টেমের ত্রুটি ও দুর্বলতা (ভালনারেবিলিটি) নিয়মিত স্ক্যান করছে। প্রকল্পটির অংশ হিসেবে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কম্পিউটার সায়েন্সের মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি 'ন্যাশনাল সাইবার ওয়ারিয়র্স একাডেমি' প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে এথিক্যাল হ্যাকিং, ডিজিটাল ফরেনসিক্স এবং ক্রিপ্টোগ্রাফির ওপর আন্তর্জাতিক সার্টিফাইড প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে দেশের সাইবার স্পেস সুরক্ষায় সম্পূর্ণ দেশীয় বিশেষজ্ঞ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন, সাধারণ নাগরিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সহজ টোল-ফ্রি ২৪/৭ সাইবার হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, ফিশিং লিংক কিংবা অনলাইন আর্থিক প্রতারণার শিকার হলে নাগরিকরা অবিলম্বে এই নম্বরে কল করে আইনি ও কারিগরি সহায়তা লাভ করতে পারছেন। এই সমন্বিত উদ্যোগ ডিজিটাল বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত ও আন্তর্জাতিকভাবে নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তিবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটারের বিস্ময়কর ক্ষমতায় যখন বিশ্বের প্রচলিত সকল এনক্রিপশন ও সাইবার নিরাপত্তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ গবেষক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছেন। উন্নত গণিত ও ল্যাটিস-ভিত্তিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের সমন্বয়ে তারা এমন একটি 'পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফিক অ্যালগরিদম' উদ্ভাবন করেছেন, যা পৃথিবীর যেকোনো শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ডিক্রিপশন আক্রমণ প্রতিহত করতে শতভাগ সক্ষম। গবেষক দলের এই যুগান্তকারী গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের শীর্ষ জার্নাল 'আইইইই ট্রানজেকশনস অন ইনফরমেশন থিওরি'-তে শীর্ষস্থানে প্রকাশিত হয়েছে। উদ্ভাবিত এই নতুন এনক্রিপশন সিস্টেমটির নাম দেওয়া হয়েছে 'পদ্মা-কিউ' (PADMA-Q)। আন্তর্জাতিক ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি (এনআইএসটি) পরিচালিত কঠোর বৈশ্বিক পরীক্ষায় পদ্মা-কিউ অ্যালগরিদমটি অন্য আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে সর্বোচ্চ স্কোর ও কম্পিউটেশনাল দক্ষতা অর্জন করেছে। প্রধান গবেষক বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ হোসেন জানান, 'প্রচলিত আরএসএ বা উপবৃত্তাকার বক্ররেখা (ইসিসি) ক্রিপ্টোগ্রাফি কোয়ান্টাম কম্পিউটারের শোরস অ্যালগরিদমের কাছে ভেঙে পড়বে। কিন্তু আমাদের পদ্মা-কিউ অ্যালগরিদমটি বহু-মাত্রিক হাইপার-ল্যাটিসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা সমাধান করতে একটি সুপার-কোয়ান্টাম কম্পিউটারেরও বিলিয়ন বছর সময় লাগবে। সবচেয়ে আশার কথা হলো, এই অ্যালগরিদমটি সাধারণ স্মার্টফোন এবং কম শক্তির আইওটি ডিভাইসেও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কাজ করে।' বাংলাদেশ ব্যাংক এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দেশের ব্যাংকিং লেনদেন এবং সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ কোয়ান্টাম সাইবার হুমকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে পদ্মা-কিউ অ্যালগরিদমটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ শুরু করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সুইফট মেসেজিং এবং সামরিক এনক্রিপ্টেড রেডিওতে এই দেশীয় প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় দেশের আর্থিক ও সামরিক নিরাপত্তা এক অভেদ্য সুরক্ষা বলয়ে প্রবেশ করল। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা সফটওয়্যার সেবা ও আউটসোর্সিংয়ে পরিচিত হলেও মৌলিক তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞান ও ক্রিপ্টোগ্রাফিতে এমন বৈশ্বিক মাইলফলক স্থাপন প্রমাণ করে যে এ দেশের মেধার কোনো ঘাটতি নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিতে একটি পূর্ণাঙ্গ 'জাতীয় কোয়ান্টাম রিসার্চ সেন্টার' স্থাপনের জন্য বিশেষায়িত ১০০ কোটি টাকার গবেষণা তহবিল বরাদ্দ করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়ে এক অনন্য ঐতিহাসিক রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম। চলতি অর্থবছরে সিলিকন ভ্যালি, সিঙ্গাপুর, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) তহবিলগুলো থেকে দেশের উদীয়মান ফিনটেক, লজিস্টিকস, এডটেক, হেলথটেক এবং এগ্রিটেক স্টার্টআপগুলোতে মোট ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ইকুইটি বিনিয়োগ যুক্ত হয়েছে। এই বিশাল মূলধন প্রবাহ দেশের প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার এক উজ্জ্বল স্বীকৃতি। বিনিয়োগ আকর্ষণকারী শীর্ষ স্টার্টআপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী ফিনটেক প্রতিষ্ঠান এবং কৃষকদের সাথে সরাসরি সুপারমার্কেট যুক্তকারী সাপ্লাই-চেইন প্ল্যাটফর্ম। সিলিকন ভ্যালির সুপরিচিত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সেকোইয়া ক্যাপিটাল, টাইগার গ্লোবাল এবং সফটব্যাংক ভিশন ফান্ড বাংলাদেশি তরুণদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির বাজার সম্ভাবনার ভূয়সী প্রশংসা করে এই বিনিয়োগ রাউন্ডগুলোতে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছে। এর ফলে একাধিক দেশীয় স্টার্টআপ 'ইউনিকর্ন' (১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাজারমূল্য) হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, সরকারের উদার স্টার্টআপ পলিসি, শতভাগ বিদেশি মালিকানা সুবিধা, লাভজনক এক্সিটের সুযোগ এবং আইসিটি বিভাগের বিশেষ ফ্ল্যাগশিপ তহবিল 'স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড'-এর কো-ইনভেস্টমেন্ট মডেল বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন ও রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ওয়ান-স্টপ সার্ভিসে রূপান্তরিত হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো প্রকার লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ছাড়াই সহজে মূলধন নিয়ে আসছেন। স্টার্টআপগুলোর এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি দেশের সার্বিক কর্মসংস্থানে ব্যাপক ইতিবাচক রূপান্তর ঘটিয়েছে। গত এক বছরে এই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা সায়েন্টিস্ট, প্রোডাক্ট ম্যানেজার এবং ডিজিটাল লজিস্টিকস কর্মীর উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এখন বহুজাতিক বা সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেদের মেধা খাটিয়ে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠার চমৎকার উদ্ভাবনী মানসিকতা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের তরুণ জনমিতিক সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কাজে লাগিয়ে এই ধরনের প্রযুক্তি স্টার্টআপগুলো দেশের ভবিষ্যৎ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ভিত্তি রচনা করছে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও কর প্রণোদনা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি পণ্য একদিন সারা বিশ্বে রপ্তানি হবে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ একটি প্রধান নলেজ-বেজড অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব সবুজ যাতায়াত নিশ্চিত করতে এবং দেশের পরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক রূপ দিতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট জাতীয় মহাসড়কে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ 'আল্ট্রা-ফাস্ট ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) চার্জিং করিডোর' সফলভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। মহাসড়কগুলোর প্রতি ৫০ কিলোমিটার অন্তর অন্তর স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের সুপারফাস্ট ডিসি চার্জিং স্টেশন, যেখানে যেকোনো ইলেকট্রিক গাড়ি মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে শতভাগ ফুল চার্জ করা সম্ভব। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, এই মেগা প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত চার্জিং স্টেশনগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে আল্ট্রা-হাই পাওয়ার ২৪০ কিলোওয়াটের ডাবল গান চার্জার। এর ফলে ব্যক্তিগত ইলেকট্রিক কার, মাইক্রোবাস এবং ভারী ইলেকট্রিক বাসের দীর্ঘ দূরত্বের আন্তঃনগর চলাচল সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত হলো। চার্জিং স্টেশনের জন্য মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে চালকরা আগেই চার্জিং স্লট বুকিং করতে পারছেন এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছেন। চার্জিং অবকাঠামো গড়ে ওঠার সাথে সাথে দেশীয় অটোমোবাইল শিল্পেও বইছে বৈপ্লবিক হাওয়া। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত দেশের একাধিক অটোমোবাইল কারখানা সম্পূর্ণ দেশেই পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস ও কার সংযোজন শুরু করেছে। জাপান ও চীনের সাথে যৌথ উদ্যোগে স্থাপিত এসব কারখানায় লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারি প্যাক এবং আধুনিক স্মার্ট ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (বিএমএস) তৈরি হচ্ছে। দেশীয় কারখানায় তৈরি এসব গাড়ি আমদানিকৃত গাড়ির তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ সাশ্রয়ী মূল্যে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। পরিবহন মালিক সমিতি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দূরপাল্লার রুটে ডিজেল চালিত পুরনো বাসের পরিবর্তে নতুন আরামদায়ক এসি ইলেকট্রিক বাস নামানোর ঘোষণা দিয়েছে। বাস মালিকরা জানান, ইলেকট্রিক বাস পরিচালনার খরচ প্রচলিত ডিজেল বাসের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম এবং এতে কোনো ক্ষতিকর ধোঁয়া বা ইঞ্জিন শব্দ তৈরি হয় না। যাত্রীরা ঝাঁকুনিবিহীন পরম শান্তিতে যাতায়াত করতে পারছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, মহাসড়কে হাজার হাজার ইলেকট্রিক গাড়ি চলাচল শুরু করায় পরিবহন খাত থেকে বার্ষিক কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পাবে। এছাড়া তেলের আমদানি বিল সাশ্রয়ের মাধ্যমে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা পাবে। সরকার ঘোষণা করেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অন্তত ৪০ শতাংশ গণপরিবহনকে সম্পূর্ণ ইলেকট্রিক যানবাহনে রূপান্তর করা হবে, যা বাংলাদেশকে একটি পরিবেশবান্ধব আধুনিক স্মার্ট রাষ্ট্রে রূপ দিতে অনন্য অবদান রাখবে।
মহাকাশ প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ঐতিহাসিক গৌরবগাথা রচনার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে দেশ। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, দেশের দ্বিতীয় ভূস্থির ও অপটিক্যাল স্যাটেলাইট 'বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২' এর যাবতীয় কারিগরি নির্মাণ ও সিমুলেশন টেস্ট সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং তা শিগগিরই মহাকাশের কক্ষপথে উৎক্ষেপণের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত। বিখ্যাত আন্তর্জাতিক এরোস্পেস সংস্থার কারিগরি সহযোগিতায় নির্মিত এই উপগ্রহটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রত্যন্ত জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ যেখানে মূলত টেলিযোগাযোগ ও টিভি সম্প্রচারে ব্যবহৃত হচ্ছিল, সেখানে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ একটি হাই-রেজোলিউশন মাল্টি-স্পেকট্রাল 'আর্থ অবজারভেশন ও রিমোট সেন্সিং' উপগ্রহ হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে মহাকাশ থেকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানা, গভীর সমুদ্রসীমা, নদীর ভাঙন, বনজ সম্পদ এবং বোরো ও আমন ফসলের স্বাস্থ্য রিয়েল-টাইমে নজরদারি করা সম্ভব হবে। ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার আগাম সংকেত কয়েক দিন আগেই নিখুঁতভাবে পাওয়া যাবে, যা দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে অপরিহার্য ভূমিকা রাখবে। স্যাটেলাইটটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর শক্তিশালী হাই-থ্রুপুট স্যাটেলাইট (এইচটিএস) কে-এ ব্যান্ডের ট্রান্সপন্ডার। এর সাহায্যে দেশের দুর্গম পার্বত্য জেলাগুলো—যেমন বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির গহিন পাহাড়ি গ্রাম এবং বঙ্গোপসাগরের প্রত্যন্ত উপকূলীয় চর ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলগুলোতে কোনো প্রকার ফাইবার অপটিক ক্যাবল ছাড়াই সরাসরি উচ্চগতির স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়া হবে। এতে দেশের প্রতিটি প্রান্তিক নাগরিক সমান গতিতে ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় চলে আসবে। বিএসসিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, দেশের সামরিক বাহিনী ও উপকূলীয় কোস্টগার্ডের জন্য স্যাটেলাইটটিতে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও এনক্রিপ্টেড বিশেষায়িত ডিফেন্স ট্রান্সপন্ডার ব্যান্ড রাখা হয়েছে। এর ফলে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সমুদ্রপথে জলদস্যু দমন, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সার্বভৌম আকাশসীমার নিখুঁত নজরদারি শতভাগ আত্মনির্ভরশীলতার সাথে পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিজস্ব আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইটের মালিক হওয়া আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও মহাকাশ গবেষণায় বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করল। প্রতি বছর বিদেশি বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের ছবি ও ডেটা ক্রয় বাবদ যে কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো, তা সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ এখন প্রতিবেশী অন্যান্য দেশকে স্যাটেলাইট ডেটা ও চিত্র বিক্রি করে নতুন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতা অর্জন করল।
দেশীয় মেধাবীদের সফটওয়্যার দক্ষতা এবং আধুনিক হাই-টেক পার্কের বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) সেবা রপ্তানিতে সর্বকালের নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি এবং সিলেটের এমএজি ওসমানী হাই-টেক পার্ক (সিলিকন সিটি) পুরোদমে কার্যকর হওয়ার ফলে দেশের আইসিটি রপ্তানি আয় চলতি অর্থবছরে আড়াই বিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক মাইলফলক অতিক্রম করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন বাংলাদেশি সফটওয়্যার ফার্মগুলোর মাধ্যমে তাদের কোর এন্টারপ্রাইজ অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করছে। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) জানিয়েছে, হাই-টেক পার্কগুলোতে বিনিয়োগকারী দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন অপটিক্যাল ফাইবার ইন্টারনেট, শতভাগ ব্যাকআপ বিদ্যুৎ সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের টায়ার-থ্রি ডেটা সেন্টার এবং ১০ বছরের সম্পূর্ণ কর অবকাশ (ট্যাক্স হলিডে) সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে প্রায় দেড় শতাধিক বৈশ্বিক ও দেশীয় সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসব পার্কে তাদের স্থায়ী রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আরঅ্যান্ডডি) ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছে। সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের শীর্ষ সংগঠন বেসিস (বিএএসআইএস) জানিয়েছে, পূর্বে বাংলাদেশ কেবল সাধারণ ডেটা এন্ট্রি ও বেসিক ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজ পেত। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের জন্য জটিল এআই মডেল ডেভেলপমেন্ট, ফিনটেক ব্লকচেইন অ্যাপ্লিকেশন, ক্লাউড আর্কিটেকচার এবং কোয়ান্টাম এলগরিদমের মতো উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি সেবা প্রদান করছেন। এর ফলে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার উপার্জনের পরিমাণ চার থেকে পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিলেটের সিলিকন সিটিতে গড়ে ওঠা টেকনোলজি হাবে স্থানীয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পলিটেকনিকের হাজার হাজার তরুণ স্নাতক সরাসরি উচ্চ বেতনে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। রাজধানী ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ না বাড়িয়ে বিভাগীয় শহরেই আধুনিক আন্তর্জাতিক মানের আইটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির এই সফল মডেল এখন রাজশাহী, যশোর এবং বরিশালেও পুরোদমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। আইসিটি খাত সংশ্লিষ্ট গবেষকরা অভিমত দিয়েছেন, তৈরি পোশাকের মতো একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণে আইসিটি খাতই দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সফটওয়্যার রপ্তানি থেকে বার্ষিক ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই হাই-টেক পার্কগুলো দেশের অগ্রযাত্রার প্রধান ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করবে।
একটি আধুনিক, স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত এবং সম্পূর্ণ ক্যাশলেস বা নগদবিহীন ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার জাতীয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন প্ল্যাটফর্ম 'বিনিময়'-কে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ও আধুনিক ফিচারে রূপান্তর করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পূর্বে বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (যেমন বিকাশ, রকেট, নগদ) এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে একে অপরের সাথে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে যে উচ্চ ফি এবং কারিগরি জটিলতা ছিল, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে পুরোপুরি নির্মূল করা হয়েছে। এখন দেশের যেকোনো নাগরিক কোনো প্রকার অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ ছাড়াই এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর করতে পারছেন। আপগ্রেডেড বিনিময় প্ল্যাটফর্মটিতে যুক্ত করা হয়েছে বায়োমেট্রিক অথেনটিকেশন এবং ন্যাশনাল ইউনিফাইড কিউআর কোড 'বাংলা কিউআর'। এর ফলে একজন সাধারণ রিকশাচালক, ফুটপাতের চা বিক্রেতা বা ক্ষুদ্র মুদি দোকানদার কোনো পিওএস মেশিন ছাড়াই কেবল একটি কাগজের কিউআর কোড ঝুলিয়ে রেখে যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ থেকে তাৎক্ষণিক পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারছেন। পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে উভয় পক্ষ মোবাইল ফোনে তাৎক্ষণিক কনফার্মেশন এসএমএস ও অ্যাপ নোটিফিকেশন পেয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের নির্বাহী পরিচালক জানান, প্ল্যাটফর্মটির ব্যাকএন্ডে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ফিনটেক সিকিউরিটি ও এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে কোনো লেনদেনে কোনো প্রকার নিরাপত্তা ঝুঁকি বা অর্থ হারানোর শঙ্কা নেই। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে উৎসাহিত করতে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনকারীদের জন্য বিশেষ ক্যাশব্যাক অফার এবং ভ্যাট রিবেটের সুবিধা চালু করা হয়েছে, যা ডিজিটাল পেমেন্টকে অভূতপূর্ব জনপ্রিয় করে তুলেছে। দেশের অর্থনীতিতে এই পদক্ষেপের সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। কাগজের টাকা ছাপানো, পরিবহন এবং এটিএম বুথ রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের প্রতি বছর যে হাজার কোটি টাকা খরচ হতো, ক্যাশলেস লেনদেনের প্রসারে তা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। এছাড়া বাজারে নগদ টাকার কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিতে লেনদেনের সুযোগ বন্ধ হওয়ায় কর ফাঁকি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে, যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরাসরি অবদান রাখছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ক্যাশলেস সমাজ কেবল একটি আধুনিক প্রযুক্তি নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিচারের অন্যতম হাতিয়ার। বিনিময় প্ল্যাটফর্মের এই সার্বজনীন রূপ তৃণমূল পর্যায়ের কোটি মানুষকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে যুক্ত করেছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক স্বাবলম্বী, দুর্নীতিমুক্ত এবং স্মার্ট আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্বব্যাপী সফটওয়্যার প্রযুক্তি ও ওপেন সোর্স কোডিংয়ের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম গিটহাবে (GitHub) এক অভাবনীয় ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ। গিটহাবের বার্ষিক বৈশ্বিক ডেভেলপার রিপোর্টে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, প্ল্যাটফর্মটিতে নিবন্ধিত সক্রিয় বাংলাদেশি সফটওয়্যার ডেভেলপার ও প্রোগ্রামারের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ লাখের (এক মিলিয়ন) কোটা অতিক্রম করেছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্রুত বর্ধনশীল ওপেন সোর্স ডেভেলপার কমিউনিটিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ স্থান দখল করেছে। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশি তরুণ প্রকৌশলীরা কেবল কোড ডাউনলোড বা ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা লিনাক্স কার্নেল, পাইথন, জাভাস্ক্রিপ্ট, কিউবারনেটিস এবং টেনসরফ্লোর মতো আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত ওপেন সোর্স প্রজেক্টগুলোতে সরাসরি মৌলিক কোড কন্ট্রিবিউট বা অবদান রাখছেন। বিশ্বের শীর্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ফ্রেমওয়ার্কগুলোর বাংলা ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (এনএলপি) লাইব্রেরিগুলোর সিংহভাগই তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করছেন বাংলাদেশি তরুণরা, যা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি মহলে দারুণ সমাদৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন এবং মেটাতে বাংলাদেশি প্রোগ্রামারদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই ওপেন সোর্স কন্ট্রিবিউশন এক বিরাট অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির চেয়ে গিটহাব প্রোফাইল ও কোডের গুণগত মান দেখেই সরাসরি বিদেশি কোম্পানিগুলো উচ্চ বেতনের রিমোট জবে বাংলাদেশি ডেভেলপারদের নিয়োগ প্রদান করছে। এতে করে দেশের মেধাবী তরুণরা নিজেদের ঘরে বসেই প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন, যা জাতীয় রিজার্ভকে সমৃদ্ধ করছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় দেশজুড়ে আয়োজিত হচ্ছে 'ন্যাশনাল ওপেন সোর্স সামিট' এবং হ্যাকাথন। সেখানে স্কুল-কলেজের খুদে শিক্ষার্থীদেরও গিট ও গিটহাবের মাধ্যমে দলগত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং আধুনিক ভার্সন কন্ট্রোল শেখানো হচ্ছে। এই তরুণ ডেভেলপারদের জন্য প্রতিটি বিভাগীয় শহরে স্থাপন করা হয়েছে উচ্চগতির বিশেষায়িত ফ্রি কো-ওয়ার্কিং স্পেস। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতের সাধারণ ডেটা এন্ট্রি কিংবা বেসিক ওয়েবসাইট ডিজাইনের মতো কম মূল্যের কাজের যুগ পেছনে ফেলে বাংলাদেশ আজ গভীর প্রকৌশল ও উচ্চমূল্যের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রযুক্তি সেবা রপ্তানির যুগে প্রবেশ করেছে। এই এক মিলিয়ন দক্ষ ওপেন সোর্স ডেভেলপারই হলো স্মার্ট ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তিগত স্তম্ভ, যারা দেশকে বিশ্বমঞ্চে এক প্রধান সফটওয়্যার পরাশক্তি হিসেবে নেতৃত্ব দেবে।