সিলেটে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং সম্পন্ন: পাহাড়ি ঢল ও ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেল হাওরাঞ্চল
সিলেট অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে ভারতের মেঘালয় ও আসাম থেকে নেমে আসা উজান ঢল এবং আকস্মিক ভয়াবহ বন্যার স্থায়ী ঝুঁকি কমাতে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ তলদেশের ক্যাপিটাল ড্রেজিং কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মেগা প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত এই ড্রেজিং কার্যক্রমে নদীর তলদেশের যুগ যুগ ধরে জমা পলি, বালু এবং কঠিন বর্জ্য সম্পূর্ণ অপসারণ করা হয়েছে। এর ফলে নদী দুটির জলধারণ ক্ষমতা এবং পানি নিষ্কাশনের গতি দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৃহত্তর সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করল।
পাউবোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান প্রকৌশলী এক ব্রিফিংয়ে জানান, বিগত বছরগুলোতে নদী ভরাট হয়ে নাব্যতা হারানোর কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই সিলেট মহানগরীর রাজপথ প্লাবিত হতো এবং সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যেত। আধুনিক সাকশন কাটার ড্রেজারের সাহায্যে নদীর তলদেশ খনন করে স্বাভাবিক গভীরতা পুনরুদ্ধার করায় এখন উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি কোনো উপচে পড়া ছাড়াই দ্রুত মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরের দিকে প্রবাহিত হতে পারছে।
সিলেট মহানগরীর ব্যবসায়ীরা এবং হাওরাঞ্চলের কৃষক সমাজ এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে গভীর স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। সুনামগঞ্জের কৃষকরা জানান, ফসল তোলার আগ মুহূর্তে পাহাড়ি ঢলের কারণে পাকা ধান ডুবে যাওয়ার যে আতঙ্ক তাদের তাড়া করে ফিরত, তা এখন অনেকাংশে দূর হয়েছে। সময়মতো নিরাপদে ধান কেটে ঘরে তুলতে পারায় এ বছর হাওর অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক খাদ্য সুরক্ষাকে শক্তিশালী করেছে।
প্রকল্পের আওতায় কেবল তলদেশ খননই করা হয়নি; বরং নদীর দুই তীরে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ, রিভারব্যাঙ্ক প্রোটেকশন জিওব্যাগ স্থাপন এবং শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য আধুনিক স্লুইসগেট ও ফ্লাড রেগুলেটর স্থাপন করা হয়েছে। নদী তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে স্থানীয় নাগরিকদের বিনোদনের জন্য সবুজ ওয়াকওয়ে এবং পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
পরিবেশবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এই মেগা প্রকল্পকে কার্যকর বন্যা নিয়ন্ত্রণের অনন্য মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, নদীর নাব্যতা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে প্রতি বছর নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং বজায় রাখতে হবে এবং নদীতে পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য ফেলা কঠোর আইনের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। তবেই নদী তার স্বাভাবিক রূপ ধরে রাখবে এবং প্রকৃতির আশীর্বাদ হিসেবে সিলেটের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।

