
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে চাঁদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানা ইঙ্গিত করে একটি পোস্ট করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইন অনুযায়ী কোনো দেশই চাঁদের সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারে না। গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন পতাকার পাশাপাশি "দ্য মুন ইজ আওয়ার্স" (চাঁদ আমাদের) লিখে একটি ছবি পোস্ট করেন। এরপরই বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয় যে যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই চাঁদকে নিজেদের ভূখণ্ড ঘোষণা করেছে কি না। ফ্যাক্ট চেক দেখা গেছে, ট্রাম্পের পোস্টটি আসল হলেও এর পেছনে কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি ঘোষণা বা নির্বাহী আদেশ ছিল না। জাতিসংঘের 'আউটার স্পেস ট্রিটি' (বহিঃমহাকাশ চুক্তি) অনুযায়ী কোনো দেশ চাঁদের মালিকানা দাবি করতে পারে না। চুক্তির ২ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, চাঁদ বা অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুকে সার্বভৌমত্ব দাবি করে, ব্যবহার বা দখল করে বা অন্য কোনো উপায়ে কোনো রাষ্ট্র নিজের অধিকারভুক্ত করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও স্বাক্ষরকারী দেশ। ফলে এই চুক্তি ভঙ্গ করলে দেশটিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে। এ বিষয়ে জাতিসংঘের মহাকাশ বিষয়ক দপ্তর (ইউএনওওএসএ)-এর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য চুক্তির আওতায় চাঁদের আইনি অবস্থান পরিবর্তন করে না। কোনো বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন কি না, তা নির্ভর করে এর আইনি চরিত্র, প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্যের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও চাঁদ স্পর্শ করা অন্য চার দেশ চীন, রাশিয়া, ভারত ও জাপান এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ফলে ট্রাম্পের এই ইঙ্গিত আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে এই বক্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের মহাকাশ নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এর আগে ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে স্থায়ী মার্কিন ফাঁড়ি স্থাপন ও পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। এমনকি তার প্রথম মেয়াদে তিনি মহাকাশকে একক আন্তর্জাতিক সম্পদ হিসেবে গণ্য না করে জাতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে তিনি প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানকে পাঁচ হাজার ডলার করে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব করবেন। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মেয়াদকালের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত দলের প্রথমবারের মতো জাতীয় সম্মেলনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি এ প্রস্তাব দেন। পরিকল্পনাটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে বা এর অর্থায়ন কীভাবে করা হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত জানাননি। শুধু বলেছেন, এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ব্যয় করতে হবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই পরিকল্পনাকে ট্রাম্পের শুল্কনীতি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্জিত রাজস্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ডেমোক্র্যাটরা এটিকে ‘ফাঁকা প্রতিশ্রুতি’ বলে আখ্যা দিয়েছে এবং অন্যরা প্রশ্ন তুলেছেন, এমন প্রতিশ্রুতি আইনগতভাবে বৈধ বা বাস্তবসম্মত কি না। নির্বাচনী বছরে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করার আহ্বানের প্রেক্ষাপটে, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আমেরিকানদের এমন অর্থ প্রদানের প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনা সম্ভবত এটাই প্রথম। বর্তমানে প্রায় ২৭ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান রয়েছেন। ফলে প্রত্যেককে পাঁচ হাজার ডলার করে দেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে এমন সময়ে এই প্রশ্ন উঠছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম বাড়ছে, যার একটি কারণ হিসেবে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধকে উল্লেখ করা হচ্ছে।
দীর্ঘ কয়েক মাসের তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও বৈশ্বিক উদ্বেগের পর অবশেষে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ মধ্যপ্রাচ্যে অবিলম্বে একটি স্থায়ী ও টেকসই যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং গাজা উপত্যকায় সর্বাত্মক মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর ঐতিহাসিক প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করেছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত জরুরি অধিবেশনে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রই এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের পক্ষে ইতিবাচক ভোট প্রদান করে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক সনদ সমুন্নত রাখতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের এই সর্বসম্মত অবস্থানকে বৈশ্বিক কূটনীতির এক ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। গৃহীত প্রস্তাবনায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ দলের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে অবিলম্বে সকল ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে রাফাহ সীমান্ত ও কেরেম শালোম ক্রসিং দিয়ে খাদ্যশস্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও জ্বালানিবাহী শত শত ট্রাককে কোনো প্রকার তল্লাশির নামে অযথা কালক্ষেপণ না করে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবেশের অনুমতি দিতে বলা হয়েছে। হাসপাতাল, শরণার্থী শিবির এবং জাতিসংঘের ত্রাণকেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অবিলম্বে পুনর্স্থাপনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নিরাপত্তা পরিষদকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, 'এটি কেবল একটি কাগুজে প্রস্তাব নয়; এটি লাখ লাখ নিরপরাধ শিশু, নারী ও বেসামরিক মানুষের বাঁচার আকুল আকুতির প্রতি বিশ্ববিবেকের সাড়া। অবিলম্বে এই প্রস্তাবের প্রতিটি ধারা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া আহত মানুষদের কাছে জরুরি চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।' আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফ তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন তদারকিতে মাঠে নামার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। যুদ্ধাহত হাজার হাজার শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে জরুরি ভিত্তিতে স্থানান্তর এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা দ্রুত মেরামতে আন্তর্জাতিক প্রকৌশলী ও স্বেচ্ছাসেবী দলগুলোকে মোতায়েন করা হচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডে সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে পোলিও ও কলেরার গণটিকাদান কর্মসূচি অবিলম্বে শুরু করা হবে। বিশ্বের প্রধান প্রধান রাজধানীগুলো—লন্ডন, প্যারিস, বেইজিং ও আঙ্কারা—এই প্রস্তাবকে শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাময়িক যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুই-রাষ্ট্রীয় সমাধানের (টু-স্টেট সলিউশন) স্থায়ী রাজনৈতিক রূপরেখা বাস্তবায়নই কেবল এই দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংকটের চিরস্থায়ী অবসান ঘটাতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ফ্রন্টিয়ার লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোর দ্রুতগতির বিকাশ মানবজাতির নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যাতে কোনো অস্তিত্বগত সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্বের ৮০টিরও বেশি শীর্ষ অর্থনীতির দেশ প্রথম ঐতিহাসিক 'গ্লোবাল এআই গভর্নেন্স অ্যান্ড সেফটি ট্রিটি' স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) এবং জাতিসংঘের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বনেতারা এআই গবেষণায় কড়া নৈতিক মানদণ্ড এবং স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের সুরক্ষা অডিট বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। চুক্তির অন্যতম প্রধান ধারা অনুযায়ী, যেকোনো বাণিজ্যিক বা সামরিক প্রতিষ্ঠান যদি ফ্রন্টিয়ার মডেল (যেসব এআই মডেলের কম্পিউটেশনাল ক্ষমতা ১০ টু দ্য পাওয়ার ২৬ ফ্লোটিং-পয়েন্ট অপারেশনের বেশি) প্রশিক্ষণ দিতে চায়, তবে তাদের সরকারি অনুমোদন ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পূর্বেই বিস্তারিত ঝুঁকি মূল্যায়ন রিপোর্ট প্রদান করতে হবে। পারমাণবিক প্রযুক্তি, জৈব রাসায়নিক অস্ত্রের নকশা তৈরি কিংবা জাতীয় সাইবার অবকাঠামোতে আক্রমণ চালাতে সক্ষম এমন কোনো অ্যালগরিদম বিকাশ কঠোরভাবে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড, মাইক্রোসফট এবং অ্যানথ্রপিকের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই রিসার্চ ল্যাবগুলোর প্রধান নির্বাহীরা এই আন্তর্জাতিক রূপরেখাকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়েছেন। শীর্ষ প্রযুক্তিবিদরা বলেছেন, অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতার বদলে যদি একটি বৈশ্বিক অভিন্ন সুরক্ষা কাঠামো থাকে, তবে বিজ্ঞান ও চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই-এর বিস্ময়কর ক্ষমতা মানবজাতির কল্যাণে নিরাপদভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে ক্যানসার গবেষণা, আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং পরিবেশবান্ধব উপাদান আবিষ্কারে এআই বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে। চুক্তিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণে একটি বিশেষায়িত 'গ্লোবাল এআই কম্পিউট অ্যান্ড ট্যালেন্ট ফান্ড' গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গবেষক ও শিক্ষার্থীরা উন্নত সুপারকম্পিউটার ক্লাস্টার ব্যবহারের সুযোগ পাবেন, যাতে এআই-এর সুফল কেবল ধনী দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র মানবজাতির যৌথ সম্পদে পরিণত হয়। ডিপফেক ভিডিও ও নির্বাচন প্রভাবিত করার অপপ্রচার ঠেকাতে কৃত্রিম মাধ্যমে তৈরি প্রতিটি কনটেন্টে ক্রিপ্টোগ্রাফিক ওয়াটারমার্কিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জেনেভা চুক্তিকে ১৯৫০-এর দশকের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) প্রতিষ্ঠার মতো এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। একটি যৌথ আন্তর্জাতিক এআই নজরদারি সংস্থা গঠনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা মানবজাতির ভবিষ্যৎকে এক নিরাপদ ও প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ আলোর দিশা দেখাবে।
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আন্তর্জাতিক নির্ভরতা চিরতরে ছিন্ন করে শতভাগ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করার মহাপরিকল্পনায় ঐতিহাসিক এক বিজয় অর্জন করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। উত্তর সাগরের সুবিশাল ভাসমান অফশোর উইন্ড ফার্ম এবং দক্ষিণ ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় আল্ট্রা-হাই-ভোল্টেজ সোলার পার্কগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে সফলভাবে পূর্ণ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেছে 'ইউরোপিয়ান গ্রিন এনার্জি সুপারগ্রিড'। হাই-ভোল্টেজ ডিরেক্ট কারেন্ট (এইচভিডিসি) প্রযুক্তিতে নির্মিত এই আন্তঃসংযোগের ফলে ইউরোপের বিদ্যুৎ গ্রিডে নবায়নযোগ্য শক্তির অনুপাত প্রথমবারের মতো ৬০ শতাংশ অতিক্রম করেছে। ব্রাসেলসে ইউরোপীয় কমিশনের জ্বালানি বিষয়ক কমিশনার এক বিশেষ উদযাপনী ভাষণে জানান, উত্তর সাগরের তীব্র বাতাস থেকে উৎপাদিত হাজার হাজার মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ এখন সেকেন্ডের ভগ্নাংশে আন্ডারওয়াটার ক্যাবলের মাধ্যমে জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের শিল্পাঞ্চলে প্রবাহিত হচ্ছে। আবার দিনের বেলায় স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসের অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ স্ক্যান্ডিনেভিয়ার পাম্পড-হাইড্রো স্টোরেজ কেন্দ্রগুলোতে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এই চমৎকার সমন্বয়ের ফলে পুরো ইউরোপ মহাদেশে পিক-আওয়ারে বিদ্যুৎ ঘাটতির ঝুঁকি সম্পূর্ণ দূর হয়েছে। জ্বালানি অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেছেন, বিগত কয়েক বছরের ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে ইউরোপ যে ভয়াবহ গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল, এই সুপারগ্রিড সেই দুর্বলতাকে স্থায়ীভাবে নির্মূল করেছে। রাশিয়ান পাইপলাইন গ্যাস বা আন্তর্জাতিক এলএনজি আমদানির উচ্চমূল্যের ওপর ইউরোপীয় শিল্পকারখানাগুলোকে আর জিম্মি থাকতে হচ্ছে না। ফলে ইউরোপীয় উৎপাদকদের উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং সাধারণ নাগরিকদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব আন্তর্জাতিক জলবায়ু মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। বিশাল এই গ্রিন সুপারগ্রিড প্রতি বছর প্রায় ১৮০ মিলিয়ন মেট্রিক টন বিষাক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ প্রতিহত করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর পরিবেশ আইন 'ফিট ফর ফিফটি ফাইভ' এর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দুই বছর আগেই ইউরোপ কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে অভূতপূর্ব সাফল্য প্রদর্শন করল, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে এক আশার আলো জ্বেলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষণা করেছে, পরবর্তী ধাপে এই সুপারগ্রিডকে উত্তর আফ্রিকার মরক্কো ও মিশরের গ্রিন হাইড্রোজেন প্রকল্পের সাথে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এর মাধ্যমে ইউরোপ কেবল নিজের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি চাহিদাই মেটাবে না, বরং আগামী দশকগুলোতে বিশ্বজুড়ে শূন্য-কার্বন বা নেট-জিরো অর্থনীতির প্রধান মডেল হিসেবে মানবজাতির জন্য অগ্রপথিকের ভূমিকা পালন করবে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ভারসাম্যে বহুপাক্ষিকতা প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একক মুদ্রার আধিপত্য হ্রাস করার লক্ষ্যে ব্রিকস জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলো একটি স্বাধীন, ব্লকচেইন-ভিত্তিক বহুমুখী ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম 'ব্রিকস পে' আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে। সম্মেলনের সমাপনী ঘোষণাপত্রে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নতুন যুক্ত হওয়া সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের পরিবর্তে নিজেদের স্থানীয় মুদ্রায় আমদানি-রপ্তানির দায় নিষ্পত্তির ঐতিহাসিক সনদে স্বাক্ষর করেছে। ঘোষিত নতুন আর্থিক কাঠামো অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একটি পারস্পরিক ডিজিটাল লেজার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকবে। এই সিস্টেমে কোনো মধ্যস্থতাকারী পশ্চিমা সুইফট নেটওয়ার্ক বা নিউইয়র্কের ক্লিয়ারিং হাউসের প্রয়োজন হবে না। বাণিজ্যের লেনদেনগুলো রিয়েল-টাইমে ডিজিটাল গোল্ড এবং স্থানীয় সার্বভৌম মুদ্রার সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ রিজার্ভ বাস্কেটের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করা সম্ভব হবে। এর ফলে লেনদেন খরচ নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদী মুদ্রা রূপান্তরজনিত লোকসান রোধ হবে। সম্মেলনে উপস্থিত রাষ্ট্রনেতারা স্পষ্টভাবে জানান, এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য কাউকে লক্ষ্য করে কোনো অর্থনৈতিক শত্রুতা তৈরি করা নয়; বরং উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে অনাকাঙ্ক্ষিত একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং মুদ্রানীতির আকস্মিক দোলাচল থেকে সুরক্ষিত রাখা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল ও সুষম করার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এশিয়ান, আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর মধ্যে এই লেনদেন ব্যবস্থা দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করবে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার ও খাদ্যশস্যের মতো মেগা কমোডিটি বাণিজ্যে এই বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেমের প্রয়োগ বিশ্ব বাণিজ্য কাঠামোর চিত্র চিরতরে বদলে দিতে পারে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক দেশগুলো এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ায় লেনদেনের বিপুল প্রবাহ এই নতুন প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, ব্রিকস পেমেন্ট সিস্টেম আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা করবে। উদীয়মান দেশগুলো এখন তাদের জাতীয় মুদ্রার আন্তর্জাতিকীকরণকে আরও ত্বরান্বিত করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক ঋণ ও বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষা করতে এক ঐতিহাসিক অবদান রাখবে।
সিলিকন ইলেকট্রনিক চিপের প্রচলিত সীমাবদ্ধতা ভেঙে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলোর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচের বৈশ্বিক সংকট সমাধানে সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশলের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন সম্পন্ন করেছে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা কনসোর্টিয়াম। যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, জার্মানি ও জাপানের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী ও ন্যানোটেকনোলজি ল্যাবগুলোর সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে 'সিলিকন ফোটোনিক সুপারচিপ'। তামার ক্ষুদ্র তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের পরিবর্তে এই নতুন চিপে আলোর কণা বা ফোটনের মাধ্যমে সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন বিট ডেটা আদান-প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। টোকিও ও মিউনিখে একযোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক টেকনোলজি সিম্পোজিয়ামে গবেষক দল এই যুগান্তকারী চিপটির কার্যকারিতা প্রকাশ্যে প্রদর্শন করেন। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, প্রচলিত শীর্ষস্থানীয় এআই গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিটের (জিপিইউ) তুলনায় এই ফোটোনিক চিপ প্রায় ৩০ গুণ দ্রুত কম্পিউটেশনাল গতি অর্জন করেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই অতি উচ্চগতির প্রক্রিয়াকরণে তাপ উৎপাদন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং বিদ্যুৎ খরচের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে বিস্ময়কর ৯০ শতাংশ। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্লাউড ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো—যেমন এনভিডিয়া, টিএসএমসি, ইন্টেল ও স্যামসাং—এই বৈপ্লবিক প্রযুক্তির ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য বিলিয়ন ডলারের যৌথ বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জেনারেটিভ মডেলগুলোর ব্যাপক ব্যবহারের কারণে বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলোতে যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় হচ্ছিল, ফোটোনিক চিপের ব্যবহার সেই পরিবেশগত চাপকে সম্পূর্ণ দূর করবে। এটি ডেটা সেন্টারগুলোকে সম্পূর্ণ কার্বন-নিরপেক্ষ করতে সহায়তা করবে। চিকিৎসাবিজ্ঞান, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং মহাকাশ গবেষণায় এই চিপের ব্যবহার সম্পূর্ণ নতুন যুগের সূচনা করবে। চিকিৎসকরা বলছেন, ফোটোনিক চিপের সাহায্যে কোটি কোটি মানুষের জিনোমিক সিকোয়েন্সিং মাত্র কয়েক মিনিটে সম্পন্ন করা যাবে, যা ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগের জন্য তাৎক্ষণিক ব্যক্তিগতকৃত ওষুধ আবিষ্কারে ঐতিহাসিক অবদান রাখবে। এছাড়া স্বয়ংক্রিয় চালকবিহীন যানবাহনগুলোতে এই চিপ স্থাপন করলে তাৎক্ষণিক মাইক্রোসেকেন্ডে প্রতিবন্ধকতা শনাক্ত করে দুর্ঘটনা শতভাগ এড়ানো সম্ভব হবে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন, বিংশ শতাব্দীতে ট্রানজিস্টর আবিষ্কার যেমন বিশ্বকে অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল যুগে নিয়ে এসেছিল, ফোটোনিক চিপের এই সাফল্য মানবসভ্যতাকে ডিজিটাল থেকে লাইট-স্পিড কম্পিউটিং বা আলোক-গতির যুগে প্রবেশ করাল। আগামী এক দশকের মধ্যে পৃথিবীর প্রতিটি স্মার্ট ডিভাইস ও সুপারকম্পিউটারে এই আলোর চিপ আধিপত্য বিস্তার করবে, যা মানবজাতির বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রাকে অকল্পনীয় গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
বিশ্ব বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হিসেবে খ্যাত ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরীয় আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় ২০টিরও বেশি উপকূলীয় দেশ একটি সমন্বিত বহুজাতিক নৌ-নিরাপত্তা চুক্তি সম্পাদন করেছে। সিঙ্গাপুরে আয়োজিত আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সিকিউরিটি ফোরামে ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এই ঐতিহাসিক 'ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌ-সহযোগিতা সনদে' স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান জাহাজ চলাচলকারী চ্যানেলগুলোতে জলদস্যুতা, অবৈধ সশস্ত্র ডাকাতি এবং আন্তর্জাতিক মানব ও মাদক চোরাচালান সম্পূর্ণ নির্মূল করা। এর অংশ হিসেবে সদস্য দেশগুলোর নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের আধুনিক পেট্রোল ফ্রিগেটগুলোর সমন্বয়ে একটি বিশেষায়িত 'যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা স্কোয়াড্রন' গঠন করা হয়েছে। স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং, সমুদ্রগামী ড্রোন এবং রিয়েল-টাইম অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেমের (এআইএস) মাধ্যমে যেকোনো সন্দেহভাজন নৌযানের গতিবিধি সার্বক্ষণিক যৌথ কমান্ড সেন্টার থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। নিরাপত্তার পাশাপাশি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সুরক্ষা এই চুক্তিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার লাভ করেছে। বঙ্গোপসাগর ও মালাক্কা প্রণালীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর বিষাক্ত বিলজ ওয়াটার বা তেল মিশ্রিত বর্জ্য সমুদ্রে ফেলা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন অমান্যকারী যে কোনো পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) কঠোর আইনে ভারী আর্থিক জরিমানা ও সমুদ্রপথে চলাচলে স্থগিতাদেশ জারির বিধান কার্যকর করা হয়েছে। বাণিজ্যিক শিপিং সংস্থাগুলো এই চুক্তিকে অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং চেম্বারের কর্মকর্তারা জানান, সমুদ্রপথে নিরাপত্তা সুদৃঢ় হওয়ায় যুদ্ধ-ঝুঁকি প্রিমিয়াম ও সামুদ্রিক বিমার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। এতে এশিয়া থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পরিবহনের সামগ্রিক কন্টেইনার ফ্রেইট রেট সহনশীল মাত্রায় নেমে আসবে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কমাতে ইতিবাচক অবদান রাখবে। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে নৌবাহিনীর সিনিয়র কমডোর সম্মেলনে জোর দিয়ে বলেন, বঙ্গোপসাগর কেবল বাংলাদেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সেতু। যৌথ এই নৌ-সহযোগিতা বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমির গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণ এবং অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এক অপ্রতিরোধ্য আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।
আফ্রিকা মহাদেশের ৫৪টি দেশের ১.৩ বিলিয়ন মানুষের জন্য এক অর্থনৈতিক নবদিগন্তের সূচনা করে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য ও সমন্বিত ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থার আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ যাত্রা শুরু করেছে 'আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া' (আফসিএফটিএ)। ঘানার আক্রায় অবস্থিত আফসিএফটিএ সচিবালয়ে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অর্থনৈতিক সম্মেলনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ও আফ্রিকান ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা এই ঐতিহাসিক অর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতিষ্ঠার পর সদস্য দেশের সংখ্যার বিচারে এটিই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য বাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। নতুন কার্যকর হওয়া চুক্তির মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শিল্পপণ্য, কাঁচামাল এবং কৃষিপণ্যের আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের ওপর বিদ্যমান প্রায় ৯০ শতাংশ শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে আফ্রিকা মহাদেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য, যা পূর্বে ইউরোপ বা এশিয়ার সাথে বাণিজ্যের তুলনায় মাত্র ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল, তা আগামী ৫ বছরের মধ্যে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ শতাংশের ওপরে পৌঁছাবে। আন্তঃদেশীয় অর্থ লেনদেন সহজ করতে চালু করা হয়েছে প্যান-আফ্রিকান পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেম (প্যাপস), যা স্থানীয় মুদ্রায় তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক দায় মেটানোর সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আফ্রিকার বৃহৎ অর্থনীতিগুলো—নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, কেনিয়া এবং ঘানা—এই অর্থনৈতিক একীভূতকরণের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। মহাদেশটির নিজস্ব খনিজ সম্পদ, যেমন কোবাল্ট, লিথিয়াম, তামা ও প্লাটিনাম এখন বিদেশে নামমাত্র মূল্যে কাঁচামাল হিসেবে রপ্তানি না করে আফ্রিকার নিজস্ব কারখানায় বৈদ্যুতিক ব্যাটারি, সোলার প্যানেল ও অটোমোবাইলে রূপান্তর করা হচ্ছে। এতে মহাদেশজুড়ে লাখ লাখ নতুন শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, আফসিএফটিএ বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ৩ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে এবং প্রায় ৭ কোটি মানুষের জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটবে। দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক সীমানা ও শুল্ক বাধার কারণে যে অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে ছিল, এই একক বাজার ব্যবস্থা আফ্রিকাকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক নতুন শক্তিশালী কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করল। বাংলাদেশ, চীন ও ভারতের মতো প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলো আফ্রিকার এই ঐতিহাসিক অগ্রগতিকে এক বিশাল রপ্তানি ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ শিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য আফ্রিকার এই সুবিশাল সমন্বিত বাজারে সরাসরি শিল্প কারখানা স্থাপন ও যৌথ উদ্যোগের এক স্বর্ণালী সুযোগ তৈরি হলো, যা দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।
বিধ্বস্ত ইউক্রেনকে একটি আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানসম্পন্ন সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জি-সেভেন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক 'গ্রিন মার্শাল প্ল্যান' চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে। লন্ডনে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক দাতা ও বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং বহুজাতিক করপোরেট নির্বাহীরা এই পুনর্গঠন সনদে স্বাক্ষর করেন। এই তহবিলের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর, বিদ্যুৎ গ্রিড, পরিবহন অবকাঠামো এবং শিল্পাঞ্চলগুলোকে একবিংশ শতাব্দীর সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে গড়ে তোলা হবে। গৃহীত মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো 'বিল্ড ব্যাক বেটার অ্যান্ড গ্রিনার' দর্শন। অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পুরোনো সোভিয়েত আমলের ভারী শিল্প কারখানাগুলোকে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন করে সেখানে আধুনিক অফশোর উইন্ড পার্ক, হাইড্রোজেন উৎপাদন কেন্দ্র এবং বিশ্বের সর্বাধুনিক জিরো-কার্বন ইস্পাত কারখানা স্থাপন করা হবে। ইউক্রেনের উর্বর কৃষিজমিকে পুনরায় চাষযোগ্য করতে বিশেষায়িত রোবোটিক মাইন অপসারণ দল এবং ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুততার সাথে কাজ শুরু করা হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্মেলনে উপস্থিত বিশ্ব নেতাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, 'এই পুনর্গঠন পরিকল্পনা কেবল ইট-পাথরের ভবন নির্মাণ নয়; এটি ইউরোপের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবজাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক। আমরা দেশকে এমনভাবে গড়ে তুলব যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই অর্থনীতি ও পরিবেশ সুরক্ষার এক অনন্য বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।' সম্মেলনে জানানো হয়, পুনর্গঠন তহবিলের অর্থ ব্যয়ে কোনো প্রকার দুর্নীতি যাতে না হয়, সেজন্য একটি আন্তর্জাতিক স্বাধীন মনিটরিং বোর্ড সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখবে। বেসরকারি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বিশেষ ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি তহবিল এবং যুদ্ধ-ঝুঁকি বিমা স্কিম চালু করা হয়েছে। সিমেন্স, জেনারেল ইলেকট্রিক, হোলসিম এবং বিশ্বের শীর্ষ নির্মাণ ও প্রকৌশল কোম্পানিগুলো ইউক্রেনে আধুনিক হাই-স্পিড রেল সংযোগ, স্মার্ট গ্রিড এবং ভূমিকম্প ও বিস্ফোরণ-সহনশীল আধুনিক আবাসন নির্মাণে কাজ শুরু করতে প্রাথমিক চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এতে লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত নাগরিকের দেশে ফিরে আসা এবং নতুন কর্মসংস্থান লাভ নিশ্চিত হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই গ্রিন মার্শাল প্ল্যান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী ইউরোপ পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক মার্শাল প্ল্যানের সমকক্ষ এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। ইউরোপের পূর্ব সীমান্তে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও সবুজ ইউক্রেনের আত্মপ্রকাশ সমগ্র ইউরোপীয় মহাদেশের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চিরতরে সুসংহত করবে।
মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন সোনালী দিগন্তের সূচনা করে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফলভাবে পানির বরফ থেকে উচ্চ বিশুদ্ধতার অক্সিজেন ও তরল হাইড্রোজেন রকেট জ্বালানি নিষ্কাশনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে নাসা ও আর্টেমিস আন্তর্জাতিক মহাকাশ জোট। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর চির-অন্ধকারাচ্ছন্ন খাঁদ 'শ্যাকেলটন ক্রেটার'-এ প্রেরিত অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক এক্সপ্লোরার 'ভাইপার' এবং সংযুক্ত কেমিক্যাল প্রসেসিং ল্যাবরেটরি এই যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে চাঁদে মানুষের স্থায়ী ঘাঁটি বা পার্মানেন্ট লুনার বেস স্থাপনের প্রধান বৈজ্ঞানিক বাধা অপসারিত হলো। ওয়াশিংটনে নাসার সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আর্টেমিস প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ইএসএ) শীর্ষ প্রকৌশলীরা এই গবেষণার অভূতপূর্ব ফলাফল বিশদভাবে প্রকাশ করেন। চাঁদের রেগোলিথ বা মাটির নিচে জমাট বাঁধা বরফকে তাপীয় লেজার রশ্মির সাহায্যে বাষ্পীভূত করে আধুনিক ইলেক্ট্রোলাইসিস পদ্ধতিতে অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেনে রূপান্তর করা হয়েছে। উৎপাদিত অক্সিজেন ভবিষ্যতের নভোচারীদের শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজে ব্যবহার করা যাবে এবং হাইড্রোজেন ও তরল অক্সিজেনকে একত্রিত করে তৈরি হবে স্পেসক্রাফটের গভীর মহাকাশ জ্বালানি। নাসা প্রশাসক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'পৃথিবী থেকে চাঁদে জল বা অক্সিজেন পরিবহন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রায় অসম্ভব ছিল। চাঁদের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে সেখানেই বাঁচার উপকরণ এবং রকেটের জ্বালানি তৈরির এই সক্ষমতা (ইন-সিটু রিসোর্স ইউটিলাইজেশন) মানবজাতিকে চিরতরে বহু-গ্রহীয় প্রজাতিতে রূপান্তর করার প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ। চাঁদ এখন কেবল অবতরণের স্থান নয়; এটি হবে মঙ্গল গ্রহে মানুষের যাত্রার প্রধান রিফুয়েলিং স্টেশন।' বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলো—স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিন—আর্টেমিসের এই সফলতাকে ভিত্তি করে চাঁদের বুকে স্থায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আবাসন মডিউল প্রেরণের প্রস্তুতি জোরদার করেছে। চাঁদের মেরু অঞ্চলে সার্বক্ষণিক সূর্যালোকিত শৃঙ্গগুলোতে স্থাপন করা হচ্ছে আল্ট্রা-লাইটওয়েট সোলার অ্যারে এবং ক্ষুদ্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি (সারফেস পাওয়ার ফিশন সিস্টেম), যা রাতের চরম শীতল তাপমাত্রাতেও নভোচারীদের জন্য উষ্ণতা ও শক্তির নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করবে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইন ও নীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, চাঁদে সফলভাবে সম্পদ নিষ্কাশনের এই ঐতিহাসিক ঘটনা 'আর্টেমিস অ্যাকর্ডস' এর অধীনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। জাপান, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অংশীদার দেশগুলোর বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চাঁদের মাটিতে প্রথম স্থায়ী মানব বসতি 'আর্টেমিস বেস ক্যাম্প' স্থাপন সম্পন্ন করবেন, যা মানবসভ্যতার অনন্ত মহাবিশ্ব জয়ের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতি ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে ঘটে যাওয়া বৈপ্লবিক রূপান্তরকে প্রতিফলিত করতে এবং জাতিসংঘকে একুশ শতকের আন্তর্জাতিক সংকটে কার্যকর ও গণতান্ত্রিক রূপ দিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (ইউএনএসসি) পুনর্গঠনে ঐতিহাসিক এক ঐকমত্যে পৌঁছেছে সাধারণ পরিষদ। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত বিশেষ সাধারণ অধিবেশনে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির শক্তিশালী অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২৫-এ উন্নীত করার ঐতিহাসিক খসড়া প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। গৃহীত সংস্কার রূপরেখার সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হলো উন্নয়নশীল বিশ্বের (গ্লোবাল সাউথ) দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটানো। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে দুটি, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে দুটি এবং ল্যাটিন আমেরিকা থেকে একটি দেশকে নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ প্রদানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। এছাড়া অস্থিতিশীল সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয় রোধে বিদ্যমান স্থায়ী পাঁচ সদস্যের (পি-৫) বিতর্কিত একক 'ভেটো ক্ষমতা' প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে; গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো দেশ একক ভেটো প্রয়োগ করতে পারবে না। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি এই অর্জনকে বিশ্ব কূটনীতির এক ঐতিহাসিক পুনর্জন্ম বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, '১৯৪৫ সালের বিশ্ব আর ২০২৬ সালের বিশ্ব এক নয়। আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার মতো বিশাল ভূখণ্ড এবং বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের কোনো স্থায়ী প্রতিনিধি না রেখে নিরাপত্তা পরিষদ তার আন্তর্জাতিক নৈতিক বৈধতা ধরে রাখতে পারছিল না। এই ঐতিহাসিক পুনর্গঠন জাতিসংঘকে পুনরায় বিশ্ব মানবতার এক অবিসংবাদিত মিলনমেলায় পরিণত করল।' ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া এবং জাপানসহ সংস্কারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসা 'জি-ফোর' জোট ও আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতারা এই সিদ্ধান্তকে বিপুল বিজয়ের সংবর্ধনা দিয়েছেন। তারা মন্তব্য করেছেন যে, নিরাপত্তা পরিষদের এই গণতান্ত্রিক রূপান্তর বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তিগুলোর দ্বিমুখী নীতি ও অন্যায্য আধিপত্যের চিরতরে অবসান ঘটাবে এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে একটি সুষম ও ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ নিশ্চিত করবে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তা পরিষদের এই সংস্কার কার্যকর হলে বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচার, দারিদ্র্য বিমোচন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ সর্বোচ্চ সুরক্ষা পাবে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রান্তের কণ্ঠস্বর যখন আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ টেবিলে সমান মর্যাদা পাবে, তখন বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘ এক অনন্য অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হবে।