দিনাজপুরের বিশ্বখ্যাত বেদানা ও চায়না-৩ লিচুর বিশ্বজয়: কোল্ড-চেইন প্যাকেজিংয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে ব্যাপক সমাদর
অনন্য মিষ্টতা, পাতলা খোসা, ছোট আঁটি আর লোভনীয় রসালো বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশ্বখ্যাত উত্তরের জেলা দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী বেদানা ও চায়না-৩ জাতের লিচু আধুনিক কোল্ড-চেইন প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় সুপারমার্কেটগুলোতে সফলভাবে স্থান করে নিয়েছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কুয়েতের বিলাসবহুল হাইপারমার্কেটগুলোতে বাংলাদেশের এই প্রিমিয়াম লিচুর বিপুল চাহিদা দেখা দিয়েছে। আকাশপথে বিশেষ কার্গো ফ্লাইটের মাধ্যমে তাজা লিচু সরবরাহ করায় স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিসহ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দিনাজপুরের লিচু এখন এক অনন্য লোভনীয় ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগে দিনাজপুরের মাশিমপুর, বিরল ও কোতোয়ালির শীর্ষ লিচু বাগানগুলোতে বৈজ্ঞানিক সংগ্রহ ও আধুনিক পোস্ট-হার্ভেস্ট প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। লিচু গাছ থেকে তোলার পরপরই তা আধুনিক সেন্সর নিয়ন্ত্রিত শীতলীকরণ ইউনিটে প্রি-কুলিং করা হয় এবং বিশেষ ইথিলিন-শোষণকারী বায়ুরোধী ইকো-কার্টনে প্যাকেটজাত করা হয়। এর ফলে লিচুর উজ্জ্বল টকটকে লাল বর্ণ, তাজা বোঁটা এবং অতুলনীয় মিষ্টি সুবাস টানা ২০ দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবিকৃত থাকে।
সফল লিচু চাষি ও কৃষি রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, সনাতন পদ্ধতিতে লিচু বিক্রি করে তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতেন। কিন্তু সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় তারা প্রতি শ' লিচুর জন্য অভ্যন্তরীণ বাজারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি মূল্য লাভ করছেন। রপ্তানিমূল্য সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে কৃষকের অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ায় উত্তরবঙ্গের ফল অর্থনীতিতে এক বিশাল আর্থিক জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানিয়েছেন, জেলায় এ বছর প্রায় সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে উন্নত জাতের লিচুর বাম্পার উৎপাদন হয়েছে। সরকার আন্তর্জাতিক ফাইটোস্যানিটারি বা উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ সনদ প্রদান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করায় বিমানবন্দরে কোনো প্রকার কালক্ষেপণ ছাড়াই লিচুর কার্গো আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে উঠে যাচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক আমদানিকারকরা বাংলাদেশের ফল সরবরাহের সময়সীমা ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
ফল অর্থনীতি গবেষকদের মতে, দিনাজপুরের লিচুর এই আন্তর্জাতিক সাফল্য দেশের অন্যান্য কৃষি অঞ্চলের জন্যও এক অনুকরণীয় মডেল। সরকার উত্তরবঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক মানের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ জোন ও এয়ার কার্গো হাব স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যা অদূর ভবিষ্যতে আম, লিচু ও কাঁঠাল রপ্তানি করে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।

