সুন্দরবন রক্ষায় প্রান্তিক গ্রামবাসীদের 'কমিউনিটি ইকো-গার্ডিয়ান' দল: বাঘ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় অনন্য সাফল্য
ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ও পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, রাজকীয় রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং মায়াবী হরিণের আবাসস্থল চিরতরে নিরাপদ রাখতে এক অনন্য সামাজিক বিপ্লব সূচিত হয়েছে। সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার উপকূলীয় গ্রামগুলোতে স্থানীয় বনজীবীদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে 'কমিউনিটি ইকো-গার্ডিয়ান' স্কোয়াড। বন অধিদপ্তর এবং আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ তহবিলের যৌথ সহযোগিতায় পরিচালিত এই উদ্যোগে প্রান্তিক গ্রামবাসীরাই এখন বনের অতন্দ্র প্রহরীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।
ইকো-গার্ডিয়ান দলের সদস্যদের বেশিরভাগই সাবেক মৌয়াল, বাওয়ালি ও কাঁকড়া শিকারি, যারা বংশপরম্পরায় সুন্দরবনের প্রতিটি নদী, খাঁড়ি ও গহিন অরণ্যের পথ চিনে বড় হয়েছেন। তাদের এই গভীর ভৌগোলিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক জিপিএস ডিভাইস, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বাইনোকুলার ও ওয়াকি-টকির সমন্বয়ে বনাঞ্চলের অভ্যন্তরে সার্বক্ষণিক টহল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বনের ভেতরে কোনো চোরা শিকারি দল প্রবেশ করলে বা বিষ দিয়ে মাছ শিকারের অপচেষ্টা চালালে তাৎক্ষণিকভাবে বনবিভাগ ও নৌ-পুলিশকে রিয়েল-টাইম সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছে।
বন সংরক্ষক (সিএফ) খুলনা অঞ্চল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, ইকো-গার্ডিয়ানদের সক্রিয় নজরদারির ফলে সুন্দরবনে অবৈধ হরিণ শিকার ও বিষ প্রয়োগের ঘটনা বিগত এক বছরে প্রায় ৮৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক খবর হলো, বনাঞ্চলে মানুষের অনধিকার প্রবেশ ও উপদ্রব বন্ধ হওয়ায় ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে সুন্দরবনের বাঘের শাবকসহ পরিবারগুলোর মুক্ত বিচরণের চিত্র ব্যাপকভাবে ধরা পড়ছে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা একে বনের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ফিরে পাওয়ার শুভ লক্ষণ হিসেবে দেখছেন।
প্রকল্পটি বনজীবীদের বিকল্প ও সম্মানজনক জীবিকায়নের পথ উন্মুক্ত করেছে। বন থেকে কাঠ কাটা বা মধু সংগ্রহের জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে তারা এখন নিয়মিত সরকারি সম্মানী, ইকো-ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে আয় এবং ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের মাধ্যমে টেকসই জীবনযাপন করছেন। তাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় একাধিক আধুনিক পরিবেশ পাঠশালা স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বন সুরক্ষার শিক্ষায় শিক্ষিত করা হচ্ছে।
পরিবেশ গবেষকরা মন্তব্য করেছেন, বন্দুকের নলের চেয়ে স্থানীয় জনগণের আন্তরিক অংশগ্রহণ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে হাজার গুণ বেশি কার্যকর। সুন্দরবনের এই সফল 'ইকো-গার্ডিয়ান মডেল' আজ আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।

