রাজশাহীতে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও ম্যাঙ্গো পাল্পিং ক্লাস্টার: ফলন পরবর্তী অপচয় রোধে ঐতিহাসিক সাফল্য
আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় আধুনিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যাঙ্গো পাল্পিং প্ল্যান্ট স্থাপনের ফলে ফলন পরবর্তী অপচয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে বাজারে আমের আকস্মিক জোগান বেড়ে যাওয়ায় পানির দরে আম বিক্রি করতে বাধ্য হতেন প্রান্তিক বাগান মালিকরা এবং অতিরিক্ত পেকে হাজার হাজার মেট্রিক টন সুস্বাদু আম পচে নষ্ট হতো। আধুনিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্লাস্টার গড়ে তোলায় সেই চিরচেনা লোকসানের চিত্র এখন লাভজনক বাণিজ্যে রূপান্তরিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের যৌথ অর্থায়নে রাজশাহীর বাঘা ও চারঘাটে আধুনিক এয়ার-টাইট অ্যাসপটিক প্যাকেজিং ও সেন্ট্রিফিউগাল পাল্পিং ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এসব আধুনিক কারখানায় প্রতিদিন শত শত টন হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি আম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধুয়ে, খোসা ছাড়িয়ে এবং পাস্তুরায়ন করে পাল্প বা রসে রূপান্তর করা হচ্ছে। কোনো প্রকার রাসায়নিক প্রিজারভেটিভ ছাড়া এই পাল্প বিশেষায়িত স্টিল ব্যারেলে দুই বছর পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবিকৃত থাকে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এই ফ্রুট পাল্পের বিপুল চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় জুস ও বেভারেজ কোম্পানিগুলো এখন বিদেশ থেকে নিম্নমানের ঘন পাল্প আমদানি না করে সরাসরি রাজশাহীর কারখানাগুলো থেকে শতভাগ খাঁটি দেশীয় আমের নির্যাস সংগ্রহ করছে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক খাদ্য মেলাগুলোতে এই পাল্পের গুণগত মান ও ঘ্রাণ বিদেশি আমদানিকারকদের নজর কেড়েছে, যা প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিতে বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
আমচাষি ও উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, কোল্ড স্টোরেজ ও পাল্পিং কারখানার কারণে তারা এখন মৌসুমের যেকোনো সময় ন্যয্যমূল্যে আম বিক্রি করতে পারছেন। বিশেষ করে দেরিতে পাকা আশ্বিনা ও বারি জাতের আম আধুনিক কোল্ড স্টোরেজে বৈজ্ঞানিক উপায়ে দুই মাস পর্যন্ত সতেজ সংরক্ষণ করে আশ্বিন-কার্তিক মাসে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে বাগান মালিকদের বার্ষিক আয় প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলের এই সফল কৃষি রূপান্তর দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সরকার এই মডেলকে সারাদেশে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের সাধারণ নীতি হিসেবে গ্রহণ করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের কৃষকদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও সমৃদ্ধ ও সুদৃঢ় করবে।

