বাংলাদেশের শীর্ষ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প পরিবেশবান্ধব সার্কুলার ফ্যাশন ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈশ্বিক নেতৃত্বে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। মার্কিন গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) কর্তৃক বিশ্বমানের লিড (এলইইডি) প্লাটিনাম ও গোল্ড সনদপ্রাপ্ত কারখানা স্থাপনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট দীর্ঘদিন ধরে ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এবার শতভাগ টেক্সটাইল বর্জ্য (ঝুট) পুনর্ব্যবহার করে উচ্চমূল্যের সুতা ও কাপড় উৎপাদনে অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত রূপান্তর সাধন করেছে দেশের শীর্ষ পোশাক কারখানাগুলো। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপের বাজারে চলতি প্রান্তিকে পোশাক রপ্তানিতে প্রায় ১৪.৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর পরিবেশ ও টেকসই সাপ্লাই চেইন কমপ্লায়েন্স নীতিমালার সাথে সংগতি রেখে দেশের প্রায় অর্ধশতাধিক কারখানা অত্যাধুনিক রোবোটিক মেকানিক্যাল রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। এর ফলে কোনো প্রকার নতুন তুলা বা রাসায়নিক ব্যবহার না করেই বর্জ্য কাপড় থেকে বিশ্বমানের টেক্সটাইল ফাইবার উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো—যেমন এইচঅ্যান্ডএম, জারা, সিঅ্যান্ডএ এবং ইন্ডিটেক্স—সার্কুলার ফ্যাশনে বাংলাদেশের এই নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সরাসরি ক্রয়াদেশের পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে। রিসাইকেলড কাপড়ে তৈরি পোশাকের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে সাধারণ কাপড়ের চেয়ে গড়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি দাম পাচ্ছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। এতে সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের মার্জিন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কারখানার শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষায় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। শিল্প মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পরিবেশবান্ধব সার্কুলার টেক্সটাইল প্ল্যান্টের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক রিসাইক্লিং যন্ত্রপাতি আমদানিতে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং বিশেষায়িত গ্রিন ফাইন্যান্সিং স্কিম প্রদান করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফর্মেশন ফান্ডের (জিটিএফ) আওতায় নামমাত্র সুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ পাওয়ায় মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোও দ্রুত টেকসই প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও শিল্প গবেষকরা মন্তব্য করেছেন, বিশ্বের অনেক প্রতিযোগী দেশ যখন পরিবেশ বিধিমালার চাপে রপ্তানি কমাতে বাধ্য হচ্ছে, বাংলাদেশ তখন গ্রিন ফ্যাক্টরি ও সার্কুলার ইকোনমির হাত ধরে এক অপ্রতিরোধ্য ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের পোশাক রপ্তানি ৮০ বিলিয়ন ডলারের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে এক নম্বর টেকসই পোশাক প্রস্তুতকারক হিসেবে চিরতরে প্রতিষ্ঠিত করবে।
দেশের পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, তারল্য এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের গভীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে একগুচ্ছ বৈপ্লবিক সংস্কারের সফল বাস্তবায়ন সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। দীর্ঘদিন ধরে বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং এবং ভিত্তিহীন গুজবের যে অপসংস্কৃতি পুঁজিবাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল, তা নির্মূলে অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত রিয়েল-টাইম সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার কার্যকর করা হয়েছে। এর ফলে কোনো অস্বাভাবিক লেনদেন বা যোগসাজশ হলে সিস্টেম তাৎক্ষণিকভাবে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম জারি করছে এবং তদন্ত কর্মকর্তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছেন। নতুন সংস্কারের ফলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক (ডিএসইএক্স) লক্ষণীয় গতিশীলতা প্রদর্শন করে গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক স্তর অতিক্রম করেছে। দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ গড়ে দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর শেয়ারে দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে বাজারে টেকসই ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং বিনিয়োগকারীদের সময়মতো ডিভিডেন্ড বিতরণের কঠোর আইনি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) সাথে সমন্বয় করে শেয়ার লেনদেনের নিষ্পত্তির সময় 'টি প্লাস টু' থেকে কমিয়ে 'টি প্লাস ওয়ান' এ নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ শেয়ার বিক্রির পরদিনই বিনিয়োগকারী তার অর্থ সরাসরি নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পেয়ে যাচ্ছেন। এই দ্রুত নিষ্পত্তি ব্যবস্থার ফলে বাজারে মূলধনের ঘূর্ণন বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারল্য সংকট স্থায়ীভাবে বিদায় নিয়েছে। পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব অনিয়মকারী কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউস ও স্বার্থান্বেষী বিনিয়োগকারী চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা বাজারে সুবাতাস ফিরিয়ে এনেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন গুজবে কান না দিয়ে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, মুনাফা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে উৎসাহিত হচ্ছেন। ডিএসই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে খুব শীঘ্রই পুঁজিবাজারে গ্রিন বন্ড, কমোডিটি ডেরিভেটিভস এবং টেকনোলজি স্টার্টআপদের জন্য বিশেষায়িত বিকল্প ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম (এটিপি) পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে। এর ফলে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তারা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ওপর চাপ না দিয়ে সরাসরি পুঁজিবাজার থেকে সুলভে মূলধন সংগ্রহ করতে পারবেন, যা জাতীয় শিল্পায়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মূল ভিত্তি প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) ঐতিহাসিক উল্লম্ফন ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে আড়াই বিলিয়ন ডলারের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ায় কর্মরত কোটি বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী অবৈধ হুন্ডির পথ পরিহার করে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ পাঠানোয় এই চমকপ্রদ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির পেছনে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কিছু সময়োপযোগী পদক্ষেপ মূল ভূমিকা পালন করেছে। সরকার ঘোষিত আড়াই শতাংশ নগদ আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিজেদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত প্রণোদনা যুক্ত করায় প্রবাসীরা প্রতি ডলারে আকর্ষণীয় ও বাজারভিত্তিক বিনিময় মূল্য পাচ্ছেন। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে ক্রলিং পেগ ব্যবস্থার কারণে খোলা বাজারের সাথে ব্যাংকিং দরের ব্যবধান পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে, যার ফলে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের অনৈতিক প্রলোভন পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রবাসীদের সুবিধার্থে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং শীর্ষস্থানীয় ফিনটেক অ্যাপগুলোর সাথে আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর সরাসরি ডিজিটাল এপিআই সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে একজন প্রবাসী দুবাই, রিয়াদ বা লন্ডনে বসে তার স্মার্টফোনের মাধ্যমেই দেশে থাকা পরিবারের বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সম্পূর্ণ বিনা খরচে টাকা পাঠিয়ে দিতে পারছেন। তাত্ক্ষণিক কনফার্মেশন এসএমএস ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে প্রবাসীরা এখন শতভাগ নির্ভরযোগ্যতার সাথে অর্থ পাঠাতে পারছেন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় রেমিট্যান্স প্রেরণকারী শীর্ষ প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে 'সিআইপি' (বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) মর্যাদা প্রদান এবং তাদের জন্য বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ সুবিধা, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিত করেছে। এছাড়া তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় বিনিয়োগের জন্য বিশেষায়িত 'প্রবাসী সঞ্চয়পত্র' এবং আকর্ষণীয় সুদে বৈদেশিক মুদ্রা বন্ডের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মন্তব্য করেছেন, আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী জোয়ার দেশের সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে অভাবনীয় স্বস্তি এনে দিয়েছে। আমদানির দায় মেটানো, বৈদেশিক দেনা পরিশোধ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্রস রিজার্ভ পুনর্গঠনে এই প্রবাসী আয় এক শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহকে ধরে রাখতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য দেশে আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘদিনের পরিবেশগত সংকট ও আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের জটিলতা কাটিয়ে সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত চামড়া শিল্পনগরী (ট্যানারি এস্টেট) এক অভাবনীয় পরিবেশবান্ধব রূপান্তর সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ প্রকৌশলীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) এখন সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিনের শিল্প বর্জ্য, ক্রোমিয়াম এবং বিষাক্ত কেমিক্যাল সম্পূর্ণরূপে পৃথক করে পরিশোধিত পানি ধলেশ্বরী নদীতে নির্গমন করায় নদীর পানি দূষণমুক্ত হয়েছে এবং দুর্গন্ধ চিরতরে দূর হয়েছে। পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত হওয়ায় সাভারের শীর্ষস্থানীয় প্রায় ২৫টি আধুনিক ট্যানারি বিশ্বখ্যাত 'লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ' (এলডব্লিউজি) এর মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সনদপত্র লাভ করেছে। পূর্বে এলডব্লিউজি সনদ না থাকার কারণে বাংলাদেশি চামড়া ইউরোপ ও আমেরিকার শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোর কাছে সরাসরি রপ্তানি করা যেত না এবং পানির দরে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করতে হতো। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ পাওয়ায় এখন সরাসরি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড—যেমন নাইকি, অ্যাডিডাস, ক্লার্কস, টিম্বারল্যান্ড ও পুমা—বাংলাদেশি ফিনিশড চামড়া এবং চামড়াজাত জুতা আমদানির বড় বড় ক্রয়াদেশ প্রদান শুরু করেছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) এবং বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ) জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রায় ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব জুতা ও বিলাসবহুল ট্রাভেল ব্যাগ রপ্তানি করে বাংলাদেশ বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। সাভারের কারখানাগুলোতে আধুনিক রোবোটিক কাটিং ও স্টিচিং মেশিন স্থাপন করায় আন্তর্জাতিক মানের ফিনিশিং নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চামড়ার পাশাপাশি ট্যানারির কঠিন বর্জ্য (সলিড ওয়েস্ট) পুনর্ব্যবহার করে জৈব সার, প্রোটিন কনসেন্ট্রেট এবং আধুনিক জুতার সোল তৈরির জন্য শিল্পনগরীতে একটি বিশেষায়িত সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে সাভার চামড়া শিল্পনগরী এখন সম্পূর্ণ 'জিরো ডিসচার্জ' বা শূন্য বর্জ্যের একটি বিশ্বমানের সার্কুলার পার্কে পরিণত হতে চলেছে। রপ্তানি খাত সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা অভিমত দিয়েছেন, তৈরি পোশাকের পর চামড়া শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের বাধা অতিক্রম করায় এ খাতে কোটি কোটি ডলারের বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট হচ্ছে। সাভার ট্যানারি এস্টেটের এই যুগান্তকারী অগ্রগতি দেশের পরিবেশ সুরক্ষার সাথে শিল্পায়নের চমৎকার মেলবন্ধনের এক অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো।
দেশের গর্বিত ওষুধ শিল্পকে শতভাগ কাঁচামাল নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী করতে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত সুবিশাল 'অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) শিল্পপার্ক' পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে প্রবেশ করেছে। প্রায় ২০০ একর জমির ওপর নির্মিত এই মেগা প্রকল্পে দেশের শীর্ষস্থানীয় ২০টিরও বেশি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি—যেমন বেক্সিমকো, স্কয়ার, ইনসেপ্টা, রেনেটা ও একমি—তাদের নিজস্ব আধুনিক মলিকুলার সিন্থেসিস প্ল্যান্ট স্থাপন সম্পন্ন করেছে। এর ফলে প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিক, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের জটিল ওষুধের মূল উপাদান এখন দেশেই শতভাগ বিশুদ্ধতার সাথে সংশ্লেষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বিএপিআই) জানিয়েছে, পূর্বে দেশের ওষুধ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের প্রায় ৯০ শতাংশ চীন ও ভারত থেকে চড়া মূল্যে আমদানি করতে হতো। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে বা সাপ্লাই চেইনে ব্যাঘাত ঘটলে দেশে জরুরি ওষুধের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হতো। গজারিয়া এপিআই পার্ক পুরোদমে চালু হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ ওষুধ শিল্পের বার্ষিক কাঁচামাল চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। এর ফলে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন নিশ্চিত করতে শিল্পপার্কটিতে স্থাপন করা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধুনিক সেন্ট্রাল কেমিক্যাল বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ডেডিকেটেড ইনসিনারেটর এবং রিয়েল-টাইম কোয়ালিটি কন্ট্রোল অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরি। মার্কিন এফডিএ (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন), ইউরোপিয়ান ইএমএ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) জিএমপি মানদণ্ড মেনে প্রতিটি উপাদান সংশ্লেষিত হচ্ছে, যা উৎপাদিত ওষুধের গুণগত মানকে বিশ্বমানের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশে সফলভাবে ওষুধ রপ্তানি করছে। নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত সাশ্রয়ী কাঁচামাল ব্যবহার করায় ওষুধের উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তুলনায় বাংলাদেশি জেনেরিক ওষুধ অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে আন্তর্জাতিক দরপত্রে জয়লাভ করতে সক্ষম হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাঁচামাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের ফলে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মূল্য সহনশীল রাখা সম্ভব হবে। এছাড়া এপিআই পার্ককে কেন্দ্র করে কেমিক্যাল সায়েন্স ও ফার্মাসিউটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কয়েক হাজার তরুণ গবেষকের উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা বাংলাদেশকে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ বায়ো-ফার্মা গবেষণা ও উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বদরবারে অধিষ্ঠিত করল।
একসময় তীব্র পরিবেশগত বিতর্ক ও কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্প এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব পরিবেশবান্ধব রূপান্তর সাধন করেছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) কঠোর 'হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অব শিপস' এর সকল শর্ত শতভাগ পূরণ করে সীতাকুণ্ডের অর্ধশতাধিক আধুনিক ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি কর্তৃক 'গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ড' হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। নতুন মানদণ্ড বাস্তবায়নের ফলে জাহাজ ভাঙার প্রাচীন ও বিপজ্জনক পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রিন ইয়ার্ডে এখন স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক কংক্রিট ইন্টারলকড ফ্লোরিং, ক্রেন পরিচালিত সেফ ট্রলি সিস্টেম, অয়েল স্পিল ইন্টারসেপ্টর এবং ভারী শিল্প বর্জ্য শোধনাগার। সাগরে কোনোপ্রকার বিষাক্ত তেল, অ্যাসবেস্টস বা সীসা মিশ্রিত বর্জ্য যাতে না মেশে, সে জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে ডিকনটামিনেশন চেম্বারে বিপজ্জনক পদার্থগুলো সম্পূর্ণ নিরাপদে অপসারণ করে বিশেষায়িত সেন্ট্রাল ট্রিটমেন্ট ফ্যাসিলিটিতে ধ্বংস করা হচ্ছে। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) জানিয়েছে, গ্রিন ইয়ার্ডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের ফলে নরওয়ে, জার্মানি, গ্রিস ও জাপানের শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানিগুলো এখন তাদের মেয়াদোত্তীর্ণ বিশাল বাণিজ্যিক জাহাজ ভাঙার জন্য সীতাকুণ্ডকে তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। পূর্বে যেসব ইউরোপীয় জাহাজ মালিক পরিবেশগত কারণে বাংলাদেশে জাহাজ পাঠাতেন না, তারা এখন সরাসরি চুক্তি সম্পাদন করছেন। এর ফলে উচ্চমানের স্ক্যাপ স্টিল আমদানির খরচ অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও অধিকার রক্ষায় ইয়ার্ডগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল, ফায়ার রেসকিউ স্টেশন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন্দ্র। শ্রমিকদের জন্য পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই), ফ্লেম-প্রুফ স্যুট, হাই-টেক হেলমেট এবং সেফটি বুট ব্যবহার শতভাগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার হার শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) সীতাকুণ্ডের এই নিরাপত্তা মানদণ্ডকে বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজভাঙা শিল্প কেবল একটি পুনর্ব্যবহার শিল্প নয়; এটি দেশের নির্মাণ খাতের লাইফলাইন। দেশের মোট রড ও ইস্পাত চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ হয় এই শিল্পের উচ্চমানের রিনিউয়েবল স্টিল থেকে। সাশ্রয়ী মূল্যে দেশীয় কাঁচামাল পাওয়ায় দেশের রড ও সিমেন্ট শিল্পের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকছে, যা মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ব্যয় সাশ্রয়ে সরাসরি অপরিহার্য ভূমিকা রাখছে।
দেশের আর্থিক খাতের মূল চালিকাশক্তি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, অনৈতিক ঋণ বিতরণ এবং খেলাপি ঋণের (এনপিএল) পাহাড় ধসিয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একযোগে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স। করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বিতর্কিত ঋণখেলাপিদের অপসারণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দেশি-বিদেশি সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার লক্ষ্যে কঠোর আইন প্রয়োগ শুরু হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আদায়ে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো সাফল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সাথে আয়োজিত বিশেষ বৈঠকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক সুপারিশ বা আত্মীয়তার সূত্রে ঋণ নবায়ন ও অবলোপন করার দিন চিরতরে শেষ হয়েছে। প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে স্বাধীন সম্পদ পুনরুদ্ধার ও স্পেশাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট (এসএএমইউ) গঠন করা হয়েছে, যা প্রতিদিন সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ডে আদায়কৃত অর্থের বিবরণ রিপোর্ট করছে। শীর্ষ ৫০ জন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালত এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংক রেজোলিউশন অ্যাক্ট এবং সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর একীভূতকরণ (মার্জার) এবং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের কাজ সফলভাবে এগিয়ে চলেছে। কোনো আমানতকারী যাতে তাদের কষ্টার্জিত জমানো টাকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় না পড়েন, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স স্কিমের আওতায় বিমার পরিমাণ দ্বিগুণ করে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত শতভাগ নিশ্চিত গ্যারান্টি প্রদান করা হয়েছে। সুশাসনের এই দৃশ্যমান পদক্ষেপের ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের আস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়েছে। গত এক প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবাহের হার প্রায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। খেলাপি ঋণ কমে আসার কারণে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিএআর) ব্যাসেল-৩ মানদণ্ডের সাথে সংগতিপূর্ণ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আউটলুক নেতিবাচক থেকে উন্নীত করে স্থিতিশীল (স্টেবল) ঘোষণা করেছে। আর্থিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শক্তিশালী ব্যাংকিং খাতই যেকোনো অর্থনীতির সমৃদ্ধির মেরুদণ্ড। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে এই আপসহীন আইনানুগ অবস্থান দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। ব্যাংকগুলোতে অলস তারল্য কমে উৎপাদনশীল শিল্প ও কৃষি খাতে সুলভ সুদে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় জাতীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দেশের তৃণমূল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের মূলধনের দীর্ঘদিনের হাহাকার দূর করতে বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং শীর্ষস্থানীয় ফিনটেক প্ল্যাটফর্মগুলোর যৌথ উদ্যোগে সফলভাবে চালু হয়েছে 'ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং'। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার কঠোর স্থাবর জামানতের শর্ত, দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক যাচাই-বাছাই এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের হয়রানির অবসান ঘটিয়ে এখন কেবল ডিজিটাল ইনভয়েস এবং লেনদেনের ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যবসায়িক চলতি মূলধন সরাসরি উদ্যোক্তাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাচ্ছে। প্রকল্পটির মূল কারিগরি ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে অত্যাধুনিক এআই-ভিত্তিক অল্টারনেটিভ ক্রেডিট স্কোরিং (এসিএস) সিস্টেম। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষুদ্র মুদি দোকানদার, তাঁতশিল্পী, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকারী এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল লেনদেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধের নিয়মিততা এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণযোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। কোনো প্রকার জমি বা ফ্ল্যাটের দলিল বন্ধক না রেখেই সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন স্বল্প সুদের ঋণ সরাসরি মোবাইল ওয়ালেটে বিতরণ করা হচ্ছে। এসএমই ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই স্কিমে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নারী পরিচালিত ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলোতে মাত্র ৪ শতাংশ নামমাত্র সুদে এই তহবিল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে রাজধানী থেকে শুরু করে রংপুর, যশোর, সিলেট এবং বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তা তাদের বুটিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হস্তশিল্পের পরিধি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হচ্ছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট ম্যানুফ্যাকচারিং জায়ান্টগুলো—যেমন প্রাণ, স্কয়ার, এসিআই ও আকিজ গ্রুপ—এই ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে। ফলে তাদের সরবরাহকারী ক্ষুদ্র কৃষক ও পরিবেশকদের বকেয়া বিলের বিপরীতে ব্যাংকগুলো তাৎক্ষণিক ক্যাশ ডিসকাউন্টিং সুবিধা প্রদান করছে। এতে সরবরাহ চেইনে তারল্যের কোনো ঘাটতি তৈরি হচ্ছে না এবং বড় কারখানাগুলোর কাঁচামাল প্রবাহ শতভাগ নিরবচ্ছিন্ন থাকছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশের উৎস হলো এই এসএমই খাত। ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে এই বিশাল উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা জাতীয় প্রবৃদ্ধির জন্য এক ঐতিহাসিক আশীর্বাদ। এর মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায়ে অর্থের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হচ্ছে এবং শহরের ওপর মানুষের অভিবাসনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যা দেশকে একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
শতবর্ষের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী হাতুড়ি পেটানো উন্মুক্ত নিলাম ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশের চা শিল্পে এক যুগান্তকারী আধুনিকায়নের সূচনা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলের দুটি প্রধান চা নিলাম কেন্দ্রকে শতভাগ ডিজিটাল ও ইন্টারনেটভিত্তিক 'ইলেকট্রনিক টি অকশন' (ই-অকশন) প্ল্যাটফর্মে সফলভাবে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ চা বোর্ডের সমন্বিত উদ্যোগে উদ্ভাবিত এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি নিবন্ধিত ক্রেতারা এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে নিজেদের ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনের মাধ্যমে সরাসরি লাইভ নিলামে অংশগ্রহণ করে চা পাতা ক্রয় করতে পারছেন। ই-অকশন ব্যবস্থার ফলে চা বাণিজ্যে দীর্ঘদিনের কারসাজি, সিন্ডিকেট এবং অনৈতিক দরপতনের অপসংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ হয়েছে। পূর্বে যেখানে নির্দিষ্ট কিছু মধ্যস্বত্বভোগী একত্রিত হয়ে যোগসাজশের মাধ্যমে দাম কমিয়ে রাখত, এখন সম্পূর্ণ গোপন ও নিরাপদ বিডিংয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চা পাতার লট বরাদ্দ পাচ্ছেন। ফলে বাগান মালিকরা তাদের উৎপাদিত অর্থোডক্স ও সিটিসি চায়ের প্রতিটি লটের জন্য প্রকৃত বাজারমূল্য পাচ্ছেন, যা চা শিল্পের লাভজনকতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে। প্ল্যাটফর্মটির সাথে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক ল্যাবরেটরি টেস্ট কোয়ালিটি স্কোরিং এবং কিউআর কোড ট্র্যাকিং ব্যবস্থা। প্রতিটি নিলাম লটের বিপরীতে চা পাতার রাসায়নিক বিশুদ্ধতা, আর্দ্রতা, লিকারের ঘনত্ব এবং ফ্লেভার প্রোফাইলের আন্তর্জাতিক সার্টিফাইড রিপোর্ট ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত থাকে। এর ফলে যুক্তরাজ্যের লন্ডন, জার্মানির হামবুর্গ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের প্রিমিয়াম চা আমদানিকারকরা শতভাগ নিশ্চিত হয়ে উচ্চমূল্যে বাংলাদেশি চা কেনার অর্ডার দিচ্ছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সফল ই-অকশন সিস্টেমের ওপর ভিত্তি করে চট্টগ্রামে দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ 'জাতীয় পণ্য বিনিময় কেন্দ্র' বা কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খুব শীঘ্রই চায়ের পাশাপাশি পাট, চাল, গম, তুলা এবং ভোজ্য তেলের মতো প্রধান প্রধান নিত্যপণ্যও এই ডিজিটাল কমোডিটি এক্সচেঞ্জের আওতায় লেনদেন করা হবে। এতে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লোটার সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হবে এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য স্থিতিশীল থাকবে। অর্থনীতিবিদরা এই উদ্যোগকে দেশের বাণিজ্যিক আধুনিকায়নের এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন। ডিজিটাল কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর ফলে পণ্যের ভবিষ্যতের মূল্য নির্ধারণে কৃষকরা আগাম পূর্বাভাস পাবেন এবং সেই অনুযায়ী ফসল উৎপাদনে পরিকল্পনা করতে পারবেন। এটি কৃষিবাজারের অপচয় কমিয়ে দেশের খাদ্য ও অর্থকরী ফসলের বাণিজ্যকে বিশ্বমানের আধুনিক পর্যায়ে পৌঁছে দেবে।
তৈরি পোশাকের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পে এক ঐতিহাসিক ও পরিবেশবান্ধব নবজাগরণের সূচনা হয়েছে। সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের ফলে দেশের শীর্ষস্থানীয় ৪০টি ট্যানারি আন্তর্জাতিক 'লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ' (এলডব্লিউজি) স্বর্ণমান সনদ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই বৈপ্লবিক কমপ্লায়েন্স অর্জনের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের শীর্ষ বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো সরাসরি বাংলাদেশ থেকে চামড়াজাত জুতো, ব্যাগ ও জ্যাকেট ক্রয়ের জন্য ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি নতুন ক্রয়াদেশ প্রদান করেছে। বিগত কয়েক দশক ধরে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর প্রক্রিয়ার নানা কারিগরি ত্রুটি ও সিইটিপির অকার্যকারিতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি চামড়া নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হতো। অনেক পশ্চিমা ক্রেতা পরিবেশগত দূষণের কারণে এ দেশের চামড়া কেনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টাস্কফোর্সের সার্বক্ষণিক তদারকিতে নেদারল্যান্ডসের অত্যাধুনিক ক্রোম রিকভারি প্রযুক্তি এবং জৈব বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন করায় ধলেশ্বরী নদীর পানি এখন সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত হয়েছে এবং ট্যানারি পল্লী একটি পরিবেশবান্ধব গ্রিন পার্কে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্তির পর সাভার ও গাজীপুরের পাদুকা কারখানাগুলোতে উৎপাদনের নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত ফ্যাশন জায়ান্ট যেমন জারা, এইচঅ্যান্ডএম, ক্লার্কস এবং নাইকি বাংলাদেশি প্রস্তুতকারকদের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সরাসরি সরবরাহ চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এর ফলে পূর্বে যেখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অত্যন্ত কম দামে ফিনিশড চামড়া রপ্তানি করতে হতো, এখন দেশেই উচ্চমানের ব্র্যান্ডেড জুতো ও ফ্যাশন এক্সেসরিজ তৈরি করে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি মূল্যে সরাসরি পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে। শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) যৌথভাবে সাভারে একটি আধুনিক 'ফুটওয়্যার ডিজাইন অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট' স্থাপন করেছে। সেখানে ইতালির শীর্ষ ডিজাইনারদের তত্ত্বাবধানে দেশীয় তরুণ ডিজাইনারদের আধুনিক ফুটওয়্যার আর্কিটেকচার, অর্থোপেডিক সোলের বিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক কালার ট্রেন্ডের ওপর নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের সাথে তাল মিলিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব ডিজাইনে প্রিমিয়াম জুতো তৈরি করে বিশ্ববাজারে নিজস্ব ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠিত করার পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কাটিয়ে জাতীয় রপ্তানি বহুমুখীকরণে চামড়া খাতই হলো সবচেয়ে প্রস্তুত ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। দেশের শতভাগ দেশীয় কাঁচামাল নির্ভর এই শিল্পের মূল্য সংযোজন (ভ্যালু এডিশন) হার প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি। সাভারের এই সফল সবুজ রূপান্তর আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চামড়া খাত থেকে বার্ষিক ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের জাতীয় স্বপ্ন পূরণে এক শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করল।