বরিশালের ভীমরুলীর শতবর্ষী ভাসমান পেয়ারা বাজারে পর্যটকদের ঢল: গ্রামীণ অর্থনীতিতে কোটি টাকার লেনদেন
দক্ষিণাঞ্চলের শস্য-শ্যামল রূপ আর খালের জলরাশিকে ঘিরে গড়ে ওঠা শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পেয়ারা বাজারে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের মোহনায় অবস্থিত ভীমরুলীর খালের আঁকাবাঁকা জলপথে শত শত ডিঙি নৌকায় সাজানো থাকে থোকা থোকা টাটকা পেয়ারা। প্রকৃতির নয়নাভিরাম এই দৃশ্য অবলোকন করতে প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিদেশি পর্যটকরা ভিড় জমাচ্ছেন। পর্যটকদের আনাগোনায় জমে উঠেছে ফল বিক্রি, ট্রলার ভ্রমণ এবং গ্রামীণ সুস্বাদু খাবারের দোকানগুলো।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের তিন জেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে পেয়ারার আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার কারণে ফলন যেমন চমৎকার হয়েছে, তেমনি পেয়ারার আকার ও মিষ্টতা ক্রেতাদের মুগ্ধ করছে। প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত খালের বিভিন্ন ঘাটে কোটি টাকার পেয়ারা পাইকারি ও খুচরা কেনাবেচা হচ্ছে। স্থানীয় চাষিরা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি পাইকার ও পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য লাভ করছেন।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও নৌ-পুলিশ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ভীমরুলীর প্রতিটি সংযোগ খালে লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে ট্রলারগুলোর জন্য নির্দিষ্ট চার্ট ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। নদীপাড়ের পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একাধিক অস্থায়ী ড্রাস্টবিন স্থাপন করা হয়েছে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে এই ভাসমান বাজার গভীর প্রভাব ফেলছে। পেয়ারা চাষের পাশাপাশি এলাকার শত শত বেকার তরুণ পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করছেন এবং কাঠের নৌকা ও ট্রলার চালিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এছাড়া নারীরা তৈরি করছেন ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় কুটির শিল্প, নকশিকাঁথা এবং দেশীয় মিষ্টি সামগ্রী, যা পর্যটকরা সানন্দে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে গ্রাম্য অর্থনীতিতে এক বহুমুখী আর্থিক সঞ্চালন সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভীমরুলীকে আন্তর্জাতিক মানের এগ্রি-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। আধুনিক ভাসমান রেস্তোরাঁ, সুসজ্জিত ওয়াকওয়ে এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসোর্ট নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে, যা বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।

