
বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নামে করার প্রস্তাব দিয়েছেন বগুড়া-৭ আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ মিলটন। সম্প্রতি বগুড়া জেলা ও সিটি করপোরেশনের সমন্বিত উন্নয়নবিষয়ক এক সভায় তিনি এ প্রস্তাব দেন। সভায় প্রস্তাবটি সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। এর ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. কুদরত ই জাহান ‘বেগম খালেদা জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়’ নামকরণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। গত ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিত ওই সভায় বগুড়ার সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার উপস্থিত ছিলেন। সভায় মোরশেদ মিলটন বলেন, খালেদা জিয়ার সময়ে বগুড়ায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে এবং তিনি চারবার এ এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মনোরম ও নিরিবিলি স্থান নির্ধারণেরও আহ্বান জানান তিনি। উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ১৫ জুলাই বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন গেজেট আকারে প্রকাশিত হলেও দীর্ঘদিন তা কার্যকর হয়নি। পরে ২০২৩ সালের ১০ মে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২২ মে থেকে আইনটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে গণআকাঙ্ক্ষার আলোকে সুদৃঢ় ও আস্থাশীল করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) একটি বিস্তৃত ও কাঠামোগত সংস্কার রোডম্যাপ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন উপহার দিতে নির্বাচন পরিচালনার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষায় কোনো ধরনের দলীয় বা প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব বরদাশত করা হবে না বলে তিনি কঠোর বার্তা দেন। ঘোষিত রোডম্যাপের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ডেটাবেসের সাথে সমন্বয় করে দেশের বিদ্যমান ভোটার তালিকা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই ও হালনাগাদের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এতে বায়োমেট্রিক আঙুলের ছাপ এবং আইরিশ স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে মৃত ও ভুয়া ভোটারদের নাম তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে কর্তন করা হবে। এছাড়া ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া প্রতিটি তরুণ ভোটারকে যাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সে জন্য নির্বাচন কমিশনের তৃণমূল পর্যায়ে বিশেষায়িত ডিজিটাল ক্যাম্পেইন পরিচালিত হবে। নির্বাচনকালীন মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের বদলি, পদায়ন ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের একক সাংবিধানিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচনী অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিটি সংসদীয় আসনে নিয়মিত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে বিশেষ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল সার্বক্ষণিক তৎপর থাকবে। ভোটকেন্দ্রে ব্যালট ছিনতাই বা যে কোনো অনিয়মের প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্র বা সম্পূর্ণ আসনের ভোট বাতিল করার পূর্ণ ক্ষমতা প্রিজাইডিং অফিসার ও রিটার্নিং অফিসারদের প্রদান করা হচ্ছে। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনের এই সময়োপযোগী সংস্কার উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট নাগরিকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা পুনরুদ্ধারে এই ডিজিটাল অডিট ও কঠোর প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বাস্তবায়ন এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে। তবে কেবল আইন বা বিধি প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, তা বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনকে আপসহীন দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশের নিবন্ধিত সকল রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সাথে ধারাবাহিক আনুষ্ঠানিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। সবার গঠনমূলক মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচনী আচরণবিধির চূড়ান্ত খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করা হবে, যা ভবিষ্যতে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে চিরতরে সংহত করবে।
জাতীয় সংসদের আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের কাজের ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যবিধিমালায় যুগান্তকারী সংস্কার আনা হয়েছে। সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং মেগা প্রকল্পগুলোর সময়মতো বাস্তবায়ন তদারকিতে স্থায়ী কমিটিগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত অডিট ও সমন জারির পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এই নতুন ব্যবস্থার ফলে কোনো মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর তাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সংক্রান্ত নথিপত্র গোপন রাখতে পারবে না। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি (পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি) যে কোনো সময় কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) বিশেষ অডিট প্রতিবেদন তলব করতে পারবে এবং কোনো আর্থিক অসঙ্গতি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবে। ব্যর্থতায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ব্যবস্থা ও ফৌজদারি তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুপারিশ করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। সংসদীয় কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রূপ দিতে স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যবিবরণী ও শুনানি সরাসরি সংসদ টেলিভিশনে সম্প্রচারের বিধান রাখা হয়েছে। সাধারণ নাগরিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা যাতে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কমিটিগুলোর মূল্যায়ন জানতে পারেন, সেজন্য উন্মুক্ত শুনানির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক অস্বচ্ছতা বহুলাংশে দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিনিধিরা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, শক্তিশালী সংসদীয় স্থায়ী কমিটিই হলো কার্যকর গণতন্ত্রের প্রধান চালিকাশক্তি। অতীতে কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন না করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে কঠোর আইনি ভিত্তি স্থাপন করা একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। এর মাধ্যমে করদাতাদের প্রতিটি পয়সার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, আসন্ন সংসদ অধিবেশনে এই বিধিমালা পূর্ণাঙ্গভাবে গৃহীত হবে। এছাড়া সংসদ সদস্যদের দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সাথে পরিচিত করতে একটি আধুনিক 'পার্লামেন্টারি রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইনস্টিটিউট' গঠনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে, যা দেশের আইনসভার সার্বিক মানকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।
দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শীর্ষস্থানীয় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক জাতীয় সংলাপের শুভসূচনা হয়েছে। রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এই গোলটেবিল বৈঠকে বিভিন্ন মতাদর্শের জাতীয় নেতৃবৃন্দ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এক ছাদের নিচে মিলিত হন। সংঘাত ও প্রতিহিংসার রাজনীতির চিরতরে অবসান ঘটিয়ে কীভাবে একটি টেকসই জাতীয় ঐকমত্যের রূপরেখা তৈরি করা যায়, তা নিয়ে খোলামেলা ও আন্তরিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সর্বসম্মতভাবে স্বীকার করেন যে, ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে অবশ্যই একটি সর্বজনীন, সুশৃঙ্খল এবং গ্রহণযোগ্য সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। আলোচনায় একটি যৌথ 'গণতান্ত্রিক জাতীয় সনদ' বা 'চার্টার অব গভর্নেন্স' প্রণয়নের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়। এই সনদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, বৈদেশিক নীতি এবং মেগা অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হবে না। সংলাপের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষা। রাজনৈতিক কারণে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, হয়রানি এবং গুম-খুনের মতো ঘৃণ্য সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধে একটি নিরপেক্ষ বিচারিক তদারকি প্যানেল গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সভায় উপস্থিত সবকটি দলীয় প্রতিনিধি এই প্রস্তাবকে নীতিগতভাবে সমর্থন জানান এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে এ ধরনের নিপীড়নমূলক আইন ও চর্চা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরে সংলাপে বলা হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ লেজুড়বৃত্তিক দলীয় রাজনীতির কলুষমুক্ত রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির পথ সুগম করার বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বেকারত্ব দূরীকরণ, আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর কর্মসংস্থান এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষায় প্রতিটি দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়। সংলাপের সমন্বয়ক ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই সংলাপ কোনো আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একটি স্থায়ী যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা প্রতি মাসে নিয়মিত বৈঠকে বসে সনদের খসড়া ধারাগুলো চূড়ান্ত করবে। দেশের জনগণ এই ঐতিহাসিক মেলবন্ধনকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে এবং আশা প্রকাশ করছে যে, এই সংলাপ দেশের রাজনীতিতে এক শান্তিময়, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল নতুন যুগের শুভ সূচনা করবে।
তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করা এবং কেন্দ্রমুখী আমলাতান্ত্রিক জটিলতা চিরতরে নিরসনের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় একটি ব্যাপক প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালার খসড়া অনুমোদন করেছে। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের ৪ হাজার ৫০০টিরও বেশি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদকে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের (এডিপি) একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি ব্লক গ্রান্ট হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হবে। পূর্বে যেখানে স্থানীয় উন্নয়নের জন্য রাজধানীর সচিবালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় মাসের পর মাস ফাইল আটকে থাকত, এখন স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরাসরি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারবেন। নতুন নীতিমালায় ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক স্বচ্ছতা ও নাগরিক নজরদারি নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য 'সোশ্যাল অডিট' বা গণশুনানি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, সুপেয় পানির নলকূপ স্থাপন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় সংস্কারের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে উন্মুক্ত ওয়ার্ড কমিটি গঠিত হবে। ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি আয়ের উৎস ও ব্যয়ের বিবরণী ডিজিটাল বোর্ডে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে, যা দুর্নীতির সুযোগ বহুলাংশে বন্ধ করবে। উপজেলা পরিষদগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানের কার্যপরিধিতে সুস্পষ্ট ভারসাম্য আনা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কৃষি সেবা এবং প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসনিক তদারকির মূল দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ের জনসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে এবং গ্রামীণ নাগরিকরা দ্রুত সেবা লাভ করতে সক্ষম হবেন। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে গ্রামীণ রূপান্তরের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের গবেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকারকে আর্থিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা না দিয়ে টেকসই জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্থানীয় পর্যায়ে সম্পদ সংগ্রহ এবং কর আদায়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি করায় পরিষদগুলোর স্বনির্ভরতা বাড়বে এবং কেন্দ্রমুখী আর্থিক নির্ভরতা হ্রাস পাবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রথম পর্যায়ে দেশের নির্বাচিত ১০০টি উপজেলা ও ১ হাজার ইউনিয়ন পরিষদে এই মডেলের পাইলট কার্যক্রম শুরু হবে। পাইলট প্রকল্পের সফলতার ভিত্তিতে আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই সারাদেশে একযোগে এই পূর্ণাঙ্গ বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালা বাস্তবায়িত হবে, যা বাংলাদেশের তৃণমূল গণতন্ত্র ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
রাষ্ট্রের সকল স্তর থেকে দুর্নীতি ও অনিয়ম সমূলে উৎপাটন এবং বিগত বছরগুলোতে দেশ থেকে বিদেশে অবৈধভাবে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানো হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশের আওতায় দুদককে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও বিচারিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কোনো হস্তক্ষেপর সুযোগ থাকবে না। কমিশনের চেয়ারম্যান এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে ঘোষণা করেছেন যে, শীর্ষ দুর্নীতিবাজ এবং অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে। বিদেশে পাচারকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা (বিএফআইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সিআইডির দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি 'বিশেষায়িত সম্পদ পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্স' গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে ইন্টারপোল, বিশ্বব্যাংকের স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিশিয়েটিভ (স্টার) এবং মার্কিন বিচার বিভাগের ফিনান্সিয়াল ক্রাইমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্কের (ফিনসেন) সাথে সরাসরি যৌথ তদন্ত চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এর মাধ্যমে সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও দুবাইয়ে পাচার হওয়া গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও রিয়েল এস্টেট সম্পদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কমিশন জানিয়েছে, দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ মিললেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, দেশি-বিদেশি সকল ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং অপরাধলব্ধ স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শীর্ষ অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লিগ্যাল ও ফরেনসিক অডিট ফার্ম নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থের প্রতিটি ডলার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনার প্রক্রিয়াকে অপ্রতিরোধ্য করা হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি সেবা প্রদান ব্যবস্থাকে শতভাগ ক্যাশলেস ও ডিজিটাল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভূমি নিবন্ধন, পাসপোর্ট প্রদান, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং কাস্টমস শুল্কায়নের মতো নাগরিক সেবায় কোনো প্রকার কায়িক নগদ লেনদেন থাকবে না। আধুনিক ব্লকচেইন প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিটি ফাইলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে কোনো কর্মকর্তা ফাইল আটকে ঘুষ দাবি করতে না পারেন। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি অত্যাধুনিক মোবাইল অ্যাপ ও টোল-ফ্রি ২৪/৭ হটলাইন সক্রিয় করা হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দুদকের এই নবরূপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, আইনের চোখে সবাই সমান—এই মূলনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল জনগণের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বিপুল শক্তি জোগাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে বৈদেশিক ঋণের হাত থেকে স্বস্তি এনে দেবে।
প্রশাসনিক দক্ষতায় গতিশীলতা আনা, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি চিরতরে বন্ধ করা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে একুশ শতকের আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উপযোগী করে তোলার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) নিয়োগ বিধিমালার আমূল সংস্কার সম্পন্ন করেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষাবিদদের যৌথ সুপারিশের ভিত্তিতে বিসিএস প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পাঠ্যক্রম এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে প্রার্থীর বিশ্লেষণাত্মক মেধা, নৈতিকতা, নীতি-নির্ধারণী দূরদর্শিতা এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়মানুযায়ী, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ নম্বরে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং মৌখিক বোর্ডে প্রার্থীর পরিচয় গোপন রেখে সম্পূর্ণ কোডিং ও ডিজিটাল স্কোরিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর ফলে ভাইভা বোর্ডে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সুপারিশ বা অনৈতিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হলো। লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র একাধিক স্বাধীন পরীক্ষক দ্বারা মূল্যায়ন করা হবে এবং যদি কোনো উত্তরপত্রে নম্বরের ব্যবধান অস্বাভাবিক হয়, তবে তা তৃতীয় নিরপেক্ষ পরীক্ষকের কাছে পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও সিনিয়র আমলাদের গোপন বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন (এসিআর) পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে আধুনিক ও স্বচ্ছ 'পারফরম্যান্স বেইজড অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম' (পাস) চালু করা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা তার মেয়াদে কত দ্রুত নাগরিক সেবা প্রদান করেছেন, কী ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্ভাবন বাস্তবায়ন করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ আছে কিনা—এই তথ্যগুলো রিয়েল-টাইমে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে সংরক্ষিত থাকবে। এর ভিত্তিতেই মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়নে পদোন্নতি চূড়ান্ত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা এই সংস্কারকে ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা বলছেন, কোটা ও দুর্নীতির যাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে বিসিএস এখন প্রকৃত মেধাবীদের রাষ্ট্রসেবায় যুক্ত হওয়ার সেরা মাধ্যম হয়ে উঠল। এর ফলে মেধা পাচার রোধ হবে এবং উচ্চশিক্ষিত তরুণরা বিদেশে পাড়ি না জমিয়ে নিজেদের জ্ঞান ও শ্রম দিয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরে ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত হবেন। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রে আমলাতন্ত্র কেবল আদেশ বাস্তবায়নকারী নয়; বরং তারা হবে দক্ষ জনসেবক। সংস্কারকৃত সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তারা যাতে আন্তর্জাতিক মানের নীতি প্রণয়ন এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে নেতৃত্ব দিতে পারেন, সে জন্য বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (বিপিএটিসি) আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ট্রেইনারদের মাধ্যমে উচ্চতর প্রশিক্ষণের বন্দোবস্ত করা হয়েছে।
দেশের বিচার ব্যবস্থাকে শতভাগ প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন ও গতিশীল করতে অধস্তন আদালতের প্রশাসন ও বিচারকদের বদলি-পদায়নে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় গঠনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সংবিধানে উল্লেখিত বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের মূল দর্শনকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তবায়ন করল আইন মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকদের ওপর নির্বাহী বিভাগের যেকোনো প্রকার পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ চিরতরে অপসারিত হলো, যা সাধারণ নাগরিকদের জন্য সুবিচার নিশ্চিতের পথকে কণ্টকমুক্ত করল। বিচারিক স্বাধীনতার পাশাপাশি দেশের ৬৪টি জেলায় আদালতগুলোতে জমে থাকা লাখ লাখ মামলাজট নিরসনে 'ন্যাশনাল ই-জুডিশিয়ারি' প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রোলআউট শুরু হয়েছে। এখন থেকে মামলার আবেদন, সমন জারি, এভিডেন্স আপলোড এবং জামিন শুনানি সম্পূর্ণ অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বিচারপ্রার্থী মানুষ ঘরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাদের মামলার সর্বশেষ অবস্থা, শুনানির তারিখ এবং আদেশের অনুলিপি তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পাচ্ছেন, যা মধ্যস্বত্বভোগী ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করেছে। দেশের শীর্ষ আদালত প্রাঙ্গণে ভার্চুয়াল কোর্টরুমের সফলতার পর এখন প্রত্যন্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতগুলোতেও হাই-ডেফিনিশন ভিডিও কনফারেন্সিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। কারাগার থেকে আসামিদের ঝুঁকিপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ আনা-নেওয়া ছাড়াই সরাসরি জেলখানা থেকেই ভার্চুয়ালি শুনানি সম্পন্ন হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকার জ্বালানি ও নিরাপত্তা ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে আসামিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে এবং মামলার বিচার কার্যক্রম দ্রুততর হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এবং জেলা আইনজীবী সমিতিগুলো এই রূপান্তরকে আইন অঙ্গনের এক ঐতিহাসিক বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেছে। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ডিজিটাল কজ-লিস্ট ও ই-ফাইলিংয়ের ফলে আদালতের সময় ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল হয়েছে। একই দিনে অপ্রয়োজনীয় মুলতবি করার প্রবণতা বন্ধ হয়েছে এবং বিচারকগণ মেধার ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে রায় প্রদানে সক্ষম হচ্ছেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হতে পারে না। বিচার বিভাগের এই ঐতিহাসিক স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল উদ্ভাবন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আইনি নিরাপত্তা সম্পর্কে সুদৃঢ় আস্থা তৈরি করবে, যা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্ত করে একটি আধুনিক, জনবান্ধব, মানবিক ও পেশাদার পুলিশ বাহিনীতে রূপান্তর করতে জাতীয় আইনসভায় পাস হয়েছে যুগান্তকারী 'পুলিশ সার্ভিস রিফর্ম অ্যাক্ট'। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন কমিশনের যৌথ সুপারিশে প্রণীত এই আইনে পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব পালনকালে নাগরিকদের মানবাধিকার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, হেফাজতে নির্যাতন এবং হয়রানিমূলক আচরণ চিরতরে বন্ধে প্রতিটি থানায় সার্বক্ষণিক স্বাধীন নজরদারি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আইনের অন্যতম প্রধান বিধান হিসেবে মাঠপর্যায়ে টহলরত প্রতিটি পুলিশ সদস্য এবং ট্রাফিক সার্জেন্টের পোশাকে হাই-রেজোলিউশন ও নাইট-ভিশন সক্ষমতার 'বডি-ওর্ন ক্যামেরা' পরিধান শতভাগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো নাগরিকের সাথে কথোপকথন, তল্লাশি কিংবা গ্রেপ্তারের সময় এই ক্যামেরা চালু রাখা বাধ্যতামূলক। ক্যামেরার রেকর্ড করা অডিও ও ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেন্ট্রাল ক্লাউড সার্ভারে সংরক্ষিত হবে, যা পরিবর্তন বা মুছে ফেলার কোনো সুযোগ থাকবে না। আদালতে কোনো ঘটনার প্রমাণ হিসেবে এই ফুটেজ সরাসরি ডিজিটাল সাক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হবে। পুলিশের বিরুদ্ধে যেকোনো নাগরিকের অভিযোগ তদন্তের জন্য হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত 'পুলিশ কমপ্লেইন্টস কমিশন' (পিসিসি) গঠনের বিধান কার্যকর হয়েছে। এখন থেকে কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ তদন্তের পরিবর্তে সরাসরি এই স্বাধীন কমিশন তদন্ত করবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতি ও নিয়মিত আদালতে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, প্রতিটি থানায় সেবাপ্রত্যাশী নাগরিকদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ডেস্ক চালু করা হয়েছে এবং সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও এফআইআর দায়েরের পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা হয়েছে। কোনো নাগরিক চাইলে সরাসরি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেই জিডি করতে পারছেন, যার জন্য থানায় গিয়ে কোনো অর্থ খরচ বা পুলিশি ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষের সাথে পুলিশের সম্পর্কের দূরত্ব দূর হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ এই আইনকে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কোনো সভ্য রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। জনসেবক হিসেবে পুলিশের এই নতুন যাত্রা সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমাতে এবং নাগরিক জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করবে।
একটি সুস্থ, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের প্রধান পূর্বশর্ত হলো মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম। এই লক্ষ্য অর্জনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় দেশের সাংবাদিক ইউনিয়ন, সম্পাদক পরিষদ এবং মানবাধিকার প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে 'জাতীয় স্বাধীন মিডিয়া কমিশন' গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এই কমিশনকে কোনো প্রকার সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়েছে, যার মূল দায়িত্ব হবে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেন্সরশিপ বন্ধ করা এবং গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে স্বাধীনভাবে কাজ করা। একই সাথে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের যে সকল নিবর্তনমূলক ধারা সাংবাদিকদের সত্য প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করত এবং মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধ করত, সেগুলো সংসদীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা মতামতের জন্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা বা বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের বিধান চিরতরে বিলুপ্ত করা হয়েছে। কোনো প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা নিষ্পত্তির জন্য প্রথমে স্বাধীন মিডিয়া কমিশনে শুনানির জন্য উপস্থাপন করতে হবে। সাংবাদিকদের কর্মক্ষেত্রে আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতে ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। যেসব পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদান করবে না, তাদের সরকারি বিজ্ঞাপন ও সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত থাকবে। এছাড়া তরুণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের গবেষণামূলক কাজের জন্য একটি বিশেষায়িত সরকারি 'ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম ফেলোশিপ ফান্ড' চালু করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিকতা বিকাশে উৎসাহ জোগাবে। সম্পাদক পরিষদ ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) সরকারের এই সাহসী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলেছেন, ভয়ের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে সত্য প্রকাশের অবাধ সুযোগ তৈরি হওয়ায় দেশের গণমাধ্যম এখন দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি অপ্রতিরোধ্য প্রহরী হিসেবে কাজ করতে পারবে। এটি সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে সাহায্য করবে। মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় মুক্ত গণমাধ্যমের সূচকে বাংলাদেশ যে পিছিয়ে পড়েছিল, এই ঐতিহাসিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশ বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সাংবাদিকদের তথ্য অধিকার সুরক্ষা এবং সরকারি নথিপত্র প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক নতুন যুগের শুভ সূচনা হলো।
দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলে আসা দলীয় ক্যাডারভিত্তিক অপরাজনীতি, গেস্টরুম নির্যাতন ও সহিংস দখলদারিত্বের চিরতরে অবসান ঘটিয়ে সুস্থ, সৃজনশীল ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস সংস্কৃতি বিনির্মাণে সরকার একটি যুগান্তকারী 'ক্যাম্পাস গণতন্ত্র ও ছাত্র সংসদ নীতিমালা' আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এবং দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের সমন্বিত সুপারিশে প্রণীত এই নীতিমালায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর নিয়মিত ও নির্ধারিত সময়ে মুক্ত ছাত্র সংসদ (ডাকসু, চাকসু, রাকসু ইত্যাদি) নির্বাচন আয়োজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন নীতিমালার আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে কোনো প্রকার অবৈধ আসন দখল বা রাজনৈতিক দলের তথাকথিত গণরুম কালচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মেধা ও অর্থনৈতিক চাহিদার ভিত্তিতে শতভাগ ডিজিটালাইজড সিট বণ্টন ব্যবস্থা চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি এবং ওয়ার্ডেন কাউন্সিলের সরাসরি তদারকি থাকবে। কোনো ছাত্রসংগঠন বা ব্যক্তি যদি কাউকে ভয়ভীতি বা জোরপূর্বক দলীয় কর্মসূচিতে বাধ্য করার চেষ্টা করে, তবে তার ছাত্রত্ব সরাসরি আজীবনের জন্য বাতিলসহ ফৌজদারি আইনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের অধিকার, খাদ্যমান উন্নয়ন, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। নির্বাচন পরিচালনা করবেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং সম্মানিত শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ সরকারের এই নীতিকে আনন্দিত চিত্তে বরণ করে নিয়েছে। তারা বলছেন, অস্ত্র ও লাঠির রাজনীতির বিপরীতে ব্যালট ও বিতর্কের রাজনীতি ফিরে এলে ক্যাম্পাসে প্রকৃত মেধাবী, নীতিবান ও দূরদর্শী ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। এর ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে সেশনজট থাকবে না এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও উদ্ভাবনের এক অপূর্ব মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে। শিক্ষা উপদেষ্টা জানিয়েছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশের প্রতিটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তফসিল ঘোষণা করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা জাতীয় রাজনীতিতেও এক দূরদর্শী ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে, যা দেশকে একটি আধুনিক মেধাভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।