কর্ণফুলী টানেলের সুফল: আনোয়ারায় বহুজাতিক বিনিয়োগে গড়ে উঠছে বিশ্বমানের অর্থনৈতিক ও শিল্প করিডোর
দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নদীগর্ভস্থ সুড়ঙ্গপথ 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্ণফুলী টানেল' কেবল বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার মানচিত্রকেই বদলে দেয়নি, বরং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সাথে আনোয়ারা এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক মেলবন্ধনে এক ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটিয়েছে। নদী দ্বারা বিভক্ত দুই ভূখণ্ডের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন চার লেনের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে এখন দেশি-বিদেশি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বিনিয়োগের মহোৎসব চলছে। সাংহাই শহরের আদলে গড়ে ওঠা 'ওয়ান সিটি টু টাউন' মডেল আজ চট্টগ্রামে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, আনোয়ারায় স্থাপিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দেশের শীর্ষ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত একর জমি বরাদ্দ নিয়েছে। সেখানে ইতোমধ্যে আধুনিক টেক্সটাইল ডায়িং ও ফিনিশিং প্ল্যান্ট, অটোমোবাইল ও মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলি কারখানা, হাই-টেক কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স এবং ফার্মাসিউটিক্যালস উৎপাদন ইউনিটের অবকাঠামো নির্মাণ পুরোদমে চলছে। টানেলের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি মাত্র ২০ মিনিটে এসব কারখানায় কাঁচামাল পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস হাউসের সাথে আনোয়ারার নতুন শিল্প করিডোরের ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশন সম্পন্ন হয়েছে। ফলে পণ্যবাহী কনটেইনারের চলাচল কোনোপ্রকার ট্রাফিক জটের মুখে পড়ছে না। এর আগে কর্ণফুলী সেতুর ওপর তীব্র যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হতো ভারী যানবাহনগুলোকে। এখন মাত্র ৩ থেকে ৪ মিনিটে নদীর তলদেশ দিয়ে সুড়ঙ্গ পাড়ি দিয়ে যানবাহনগুলো ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়কের সাথে যুক্ত হচ্ছে। এতে লজিস্টিকস ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ কমে এসেছে।
স্থানীয় অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় এই প্রকল্পের গভীর ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আনোয়ারা, বাঁশখালী ও পটিয়ায় জমি ও আবাসন খাতে ব্যাপক গতি এসেছে। স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের জন্য আধুনিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে তারা আসন্ন শিল্প কারখানাগুলোতে দক্ষ টেকনিশিয়ান ও প্রকৌশলী হিসেবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্যাটারিং, পরিবহন এবং সাপোর্ট সার্ভিসে যুক্ত হয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্ণফুলী টানেল ও আনোয়ারা শিল্প করিডোরের পূর্ণ বিকাশ ঘটলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। ভবিষ্যতে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরের সাথে এই করিডোরটি পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হলে চট্টগ্রাম পুরো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারে পরিণত হবে।

