জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ঐতিহাসিক ক্ষতিপূরণ: ব-দ্বীপ বাংলাদেশের অধিকার বিশ্ববিবেকের কাছে কোনো করুণা নয়
বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের কোনো দায় নেই বললেই চলে। বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্র ০.৪৭ শতাংশের কম নির্গমন করে বাংলাদেশ। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান ও নিচু ব-দ্বীপ প্রকৃতির কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সবচেয়ে বিধ্বংসী ও প্রাণঘাতী আঘাতের শিকার হচ্ছে আমাদের উপকূলের লাখ লাখ নিরপরাধ প্রান্তিক মানুষ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার ভয়াল থাবা, ঘন ঘন প্রলয়ঙ্করী সুপার সাইক্লোন এবং নদীভাঙনে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে উন্নত ধনী দেশগুলো দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অর্থায়নের নানা চটকদার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসলেও বাস্তবে তার অতি সামান্য অংশই ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে পৌঁছেছে। আরও লজ্জাজনক বিষয় হলো, জলবায়ু ক্ষতিপূরণের নামে উন্নত বিশ্ব আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অনুদানের পরিবর্তে উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। যে সংকট উন্নত বিশ্বের অতি-ভোগবাদ ও জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্টি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ মেটাতে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র দেশকে কেন নতুন ঋণের জালে আবদ্ধ হতে হবে? এই দ্বিচারিতা ও অন্যায় নীতিকে আন্তর্জাতিক ফোরামে অবিলম্বে রুখে দিতে হবে।
জলবায়ু অর্থায়ন কোনো আন্তর্জাতিক করুণা বা অনুকম্পা নয়; এটি জলবায়ু ন্যায়বিচার (ক্লাইমেট জাস্টিস) এবং ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। 'পলিউটার পেইজ প্রিন্সিপল' বা দূষণকারীর ক্ষতিপূরণ প্রদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত নীতি অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোকে নিঃশর্তভাবে শতভাগ অনুদানভিত্তিক 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের হাতে তুলে দিতে হবে। এই তহবিলের অর্থ আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত হতে হবে, যাতে তা সরাসরি উপকূলীয় স্থায়ী সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, টেকসই বেড়িবাঁধ সুরক্ষা এবং জলবায়ু শরণার্থীদের মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনে ব্যয় করা যায়।
বাংলাদেশ তার নিজস্ব সীমিত সামর্থ্যে অভিযোজন প্রযুক্তিতে বিশ্বে এক অনন্য রোল মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। লবণাক্ততা-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, ভাসমান সবজি চাষ এবং কমিউনিটি সাইক্লোন প্রস্তুতিতে এ দেশের মানুষের বীরত্বপূর্ণ লড়াই আজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। কিন্তু বৈশ্বিক তাপমাত্রা যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করে, তবে কেবল স্থানীয় অভিযোজন দিয়ে লাখ লাখ উপকূলীয় মানুষকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। শিল্পোন্নত দেশগুলোকে তাদের কার্বন নির্গমন অবিলম্বে কঠোরভাবে কমিয়ে আনতে হবে।
আন্তর্জাতিক আদালতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে বাংলাদেশ ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর যৌথ আইনি লড়াইকে আরও জোরদার করতে হবে। আমরা করুণা চাই না, আমরা আমাদের বাঁচার অধিকার চাই। বিশ্ব বিবেককে বুঝতে হবে, যদি বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশগুলো ডুবে যায়, তবে সেই বিপর্যয় কেবল এই ব-দ্বীপে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক শরণার্থী সংকট ও খাদ্য নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে পুরো মানবসভ্যতাকে চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।
