জনমিতিক লভ্যাংশ ও তরুণ শক্তি: জনসংখ্যাকে বিশ্বমানের মানবসম্পদে রূপান্তরের শেষ সুযোগ
একটি দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে 'জনমিতিক লভ্যাংশ' বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হলো এক দুর্লভ ও সোনালী আশীর্বাদ, যা কোনো জাতির জীবনে শতাব্দীতে কেবল একবারই আসে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই তরুণ, যাদের বয়স পঁচিশ বছরের নিচে। এই বিশাল, উদ্যমী ও প্রাণবন্ত তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যেকোনো দেশের জন্য একটি অভাবনীয় অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। তবে ইতিহাস অত্যন্ত কঠোরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জনমিতিক লভ্যাংশ কোনো চিরস্থায়ী সুযোগ নয়। আগামী দুই দশকের মধ্যে এই তরুণ জনগোষ্ঠী যখন প্রবীণ হতে শুরু করবে, তখন যদি তাদের সঠিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত না করা যায়, তবে এই আশীর্বাদটিই এক ভয়াবহ সামাজিক বোঝা ও জনমিতিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে।
আমাদের তরুণদের অমিত মেধা ও সক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। বিশ্বজুড়ে ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার কোডিং, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড থেকে শুরু করে উদ্ভাবনী স্টার্টআপে আমাদের তরুণরা প্রতিনিয়ত নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি এই মেধার বিকাশে পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে পেরেছে? আমাদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও যুগোপযোগী বিশ্বমানের পাঠ্যক্রমের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় মুখস্থবিদ্যার পেছনে তরুণদের সোনালী সময় নষ্ট করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, বায়োটেকনোলজি এবং ডেটা সায়েন্সের এই আধুনিক যুগে যদি আমাদের তরুণদের গ্লোবাল স্কিলস বা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা না দেওয়া যায়, তবে তারা বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।
তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে রাষ্ট্রকে সর্বাগ্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা সহায়তায় বৈপ্লবিক বিনিয়োগ করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন স্বল্প সুদে স্টার্টআপ ক্যাপিটাল, মেন্টরশিপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রশাসনিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ করে একটিমাত্র ডিজিটাল ক্লিকের মাধ্যমে যাতে একজন তরুণ তার প্রতিষ্ঠান চালু করতে পারেন, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য হ্রাস করে দেশের প্রতিটি প্রত্যন্ত চরাঞ্চলেও নিরবচ্ছিন্ন ব্রডব্যান্ড নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গ্রামের একজন তরুণও ঘরে বসে গ্লোবাল আইটি বাজারে নিজের মেধা বিক্রি করতে পারেন।
একই সাথে মানসিক স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মুক্ত ক্রীড়াচর্চার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে তরুণদের সৃজনশীল ও শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। মাদকাসক্তি, অপরাধপ্রবণতা এবং সামাজিক হতাশার হাত থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় খেলার মাঠ, আধুনিক লাইব্রেরি এবং উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করতে হবে, যাতে তারা নিজেদের দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সরাসরি অংশীদার হতে পারেন।
সময় দ্রুত বয়ে চলেছে। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যখন কাজের ধরন চিরতরে বদলে দিচ্ছে, তখন আমাদের তরুণ প্রজন্মই হতে পারে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্রের মর্যাদায় পৌঁছে দেওয়ার প্রধান সেনানী। এই ঐতিহাসিক সুযোগ হেলায় হারালে ভবিষ্যৎ ইতিহাস আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। তরুণদের মেধা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং অদম্য দেশপ্রেমের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে তাদের পাশে দাঁড়ানোই হোক আজকের বাংলাদেশের প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার।
