সম্পাদকীয়: রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও টেকসই গণতন্ত্রের রূপরেখা—প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনই জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি
একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়, যখন কেবল সরকার বা ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র, প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হয়। বাংলাদেশ আজ ঠিক তেমনই এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তন যতই ঘটুক না কেন, যদি নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মতো মৌলিক সাংবিধানিক স্তম্ভগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না করা যায়, তবে একটি টেকসই ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।
গণতন্ত্র কোনো কেবল পাঁচ বছর পর পর একটি আনুষ্ঠানিক ভোট প্রদানের মহোৎসব নয়। গণতন্ত্র হলো নাগরিকের অবিসংবাদিত বাকস্বাধীনতা, ভীতিহীন পরিবেশে মতপ্রকাশের অধিকার, আইনের চোখে সর্বজনীন সমতা এবং প্রতিটি সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বচ্ছ জবাবদিহিতা। যখন কোনো রাষ্ট্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে দুর্বল করে ফেলা হয়, তখন সমাজে চরম বৈষম্য, সীমাহীন দুর্নীতি এবং পুঁজি পাচারের মতো সর্বনাশা ক্ষত তৈরি হয়। বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এই প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য বা 'চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস' চিরতরে সংবিধানে এমনভাবে প্রোথিত করা, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করতে না পারে।
জাতীয় ঐক্য বিনির্মাণে সকল রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক খোলামেলা ও আন্তরিক সংলাপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অতীতে বিভাজন ও পারস্পরিক শত্রুতার যে অন্ধ রাজনীতি দেশকে বারংবার পেছনে ঠেলে দিয়েছে, সেই আত্মঘাতী পথ পরিহার করার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। একটি সর্বসম্মত 'জাতীয় গণতান্ত্রিক সনদ' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকবে যে, মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও জাতীয় সার্বভৌমত্ব, মৌলিক মানবাধিকার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।
বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে দেশের তরুণ সমাজের কথা। যে স্বপ্ন ও আদর্শ বুকে ধারণ করে এ দেশের তরুণরা বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে, তাদের সেই রক্ত ও ত্যাগকে অর্থবহ করতে হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধা, সততা ও যোগ্যতার নিঃশর্ত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে যদি মেধার শাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে মেধা পাচার ঠেকানো যাবে না এবং একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞানভিত্তিক বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত স্থান দখল করতে ব্যর্থ হবে।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যেসব জাতি সুযোগের সঠিক মূল্যায়ন করে সাহসী কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করেছে, তারাই পৃথিবীতে মর্যাদা ও সমৃদ্ধির শীর্ষে আরোহণ করেছে। সাময়িক ক্ষমতা বা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা একটি স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সার্বজনীন মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা একটি নিরাপদ, গর্বিত ও সমৃদ্ধ স্বদেশ হস্তান্তর করে যেতে পারব। পরিবর্তনের এই ঐতিহাসিক ডাক যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়—এটাই আজ সমগ্র জাতির একান্ত প্রার্থনা।
