রাজধানী ঢাকার ভবিষ্যৎ: অতি-কেন্দ্রীভবনের অবসান ঘটিয়ে বাসযোগ্য ও সবুজ মেগাসিটি বিনির্মাণের রূপরেখা
বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি রাজধানী ঢাকা আজ এক চরম অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুঃসহ যানজট, নদী দখল এবং বায়ুদূষণের শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতার মুখোমুখি। দেশের মোট ভূখণ্ডের মাত্র এক শতাংশ আয়তন নিয়ে ঢাকা আজ সমগ্র জাতীয় অর্থনীতির অর্ধেকেরও বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আড়াই কোটিরও বেশি মানুষের বোঝা বহন করছে। সচিবালয় থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষ বিশেষায়িত হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক সদর দপ্তর এবং আদালতের সবই এই একক শহরের ওপর পুঞ্জীভূত। এই অতি-কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে এবং একই সাথে অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোকে সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে।
ঢাকাকে একটি স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য আধুনিক শহরে রূপান্তর করতে হলে প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো কার্যকর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। সরকারি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর অপ্রয়োজনীয় দপ্তর, পাইকারি কাঁচাবাজার, কেমিক্যাল গুদাম এবং চামড়া ও টেক্সটাইলের মতো ভারী বাণিজ্যিক কার্যক্রমগুলোকে অবিলম্বে ঢাকার বাইরে সুপরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহরে স্থানান্তর করতে হবে। বিভাগীয় শহরগুলোতে আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল ও আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে উন্নত চিকিৎসা বা শিক্ষার আশায় প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের ঢাকায় ছুটে আসার প্রবণতা স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে।
শহরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত গাড়ির প্রাধান্য কমিয়ে গণপরিবহন ও রেলভিত্তিক ম্যাস ট্রানজিটকে প্রধান নেটওয়ার্ক করতে হবে। মেট্রোরেলের নেটওয়ার্ককে শহরের প্রতিটি কোনায় বিস্তৃত করার পাশাপাশি হাজার হাজার পুরনো ও ফিটনেসবিহীন বাসের বদলে সুশৃঙ্খল বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি (ই-বাস নেটওয়ার্ক) চালু করা জরুরি। ফুটপাতগুলোকে হকার ও দখলমুক্ত করে পথচারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং নিরাপদ সাইকেল লেন নির্মাণ করা গেলে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে মানুষ ব্যক্তিগত মোটরযানের ওপর নির্ভরতা ত্যাগ করবে, যা যানজট ও দূষণ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনবে।
ঢাকার প্রাকৃতিক ফুসফুস ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীকে দখল ও শিল্প বর্জ্যের বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্ত করে জীবন্ত নদী হিসেবে ফিরিয়ে আনতে হবে। শহরের বিলুপ্তপ্রায় খালগুলোকে উদ্ধার করে একটি নিরবচ্ছিন্ন জলজ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও আধুনিক ওয়াকওয়ে নির্মাণ করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে উন্মুক্ত পার্ক, খেলার মাঠ এবং ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করে সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি করতে হবে, যা শহরের অতিরিক্ত উত্তাপ (হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট) কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।
একটি মেগাসিটি কেবল ইট, রড আর কংক্রিটের জঙ্গল হতে পারে না; শহরকে হতে হয় মানুষের বেঁচে থাকার আনন্দময় আশ্রয়স্থল। ঢাকা কোনো পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ নয়; এটি আমাদের গৌরবময় ইতিহাস ও সংস্কৃতির রাজধানী। সঠিক নগর পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে ঢাকাকে একটি আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই মেগাসিটি হিসেবে পুনর্জন্ম দেওয়া এখনও সম্ভব। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে; এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক ভয়াবহ নাগরিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।
