শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: মুখস্থবিদ্যার অবসান ঘটিয়ে বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা ও কারিগরি দক্ষতার বিপ্লব
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান ও অক্ষয় সম্পদ হলো তার মানবসম্পদ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের বিদ্যমান সনাতন শিক্ষা ব্যবস্থা যুগের পর যুগ ধরে লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে কেবল পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উগড়ে দেওয়ার এক যান্ত্রিক সনদনির্ভর কেরানি তৈরিতে নিয়োজিত রেখেছে। এর ফলে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও কর্মক্ষেত্রে তাদের ব্যবহারিক দক্ষতার চরম ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে দেশের লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের হতাশায় নিমজ্জিত, অন্যদিকে দেশীয় শিল্প কারখানাগুলোকে উচ্চ বেতনে বিদেশ থেকে কারিগরি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে হচ্ছে।
এই আত্মঘাতী প্যারাডক্স থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হলে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষাক্রমের আমূল পরিবর্তন অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করানোর পরিবর্তে তাদের মনে অনুসন্ধিৎসু প্রশ্ন করার অভ্যাস, বৈজ্ঞানিক যুক্তি বিচার, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (প্রবলেম সলভিং) এবং সৃজনশীল বিশ্লেষণ ক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষাকে ভীতিপ্রদ না করে হাতে-কলমে প্র্যাকটিক্যাল ল্যাবরেটরি ও প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে আনন্দময় করে তুলতে হবে। একই সাথে নৈতিক শিক্ষা, দেশপ্রেম এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে পাঠ্যক্রমে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাতে প্রতিটি শিশু একজন আলোকিত মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাকে প্রধান ধারার সমকক্ষ মর্যাদা দিতে হবে। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও জাপানের 'ডুয়েল ভোকেশনাল ট্রেনিং' মডেল অনুসরণ করে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক কোডিং, রোবোটিক্স, মেকানিক্যাল ড্রাফটিং, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির বাস্তব প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। কোনো শিক্ষার্থী যেন ডিগ্রি শেষ করে সনদ হাতে নিয়ে চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে না ঘোরে; বরং তার অর্জিত বাস্তব দক্ষতা যেন তাকে তাৎক্ষণিকভাবে কর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা হওয়ার আত্মবিশ্বাস জোগায়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল স্নাতক তৈরির কারখানা না রেখে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও উদ্ভাবনের জীবন্ত গবেষণাগারে রূপান্তর করতে হবে। উচ্চশিক্ষা বাজেটের সিংহভাগ গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়া এবং দেশীয় শিল্প খাতের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি যৌথ গবেষণা চুক্তি সম্পাদন করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানের পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশনা এবং গবেষণার মৌলিকত্বকে একমাত্র মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং জাতির ভবিষ্যতের সবচেয়ে লাভজনক দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষায় জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করে যদি আমরা শিক্ষকদের মর্যাদা, বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক ক্লাসরুম নিশ্চিত করতে পারি, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম বিশ্বমঞ্চে যেকোনো উন্নত দেশের বিজ্ঞানীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।
