কলাম: অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ঋণের ফাঁদ এড়ানো—রপ্তানি বহুমুখীকরণ ছাড়া মুক্তি নেই
একটি উদীয়মান উন্নয়নশীল দেশের প্রকৃত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক আত্মমর্যাদা সরাসরি নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের ওপর। বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে এগিয়ে চলেছে, তখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈদেশিক ঋণের দায় পরিশোধ, রাজস্ব আয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং একক তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত রপ্তানি নির্ভরতা। এই ত্রিবিধ চ্যালেঞ্জকে যদি এখনই গভীর দূরদর্শিতা ও আর্থিক শৃঙ্খলার সাথে মোকাবেলা করা না যায়, তবে আন্তর্জাতিক অর্থবাজারের অস্থিরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর সংকটে নিমজ্জিত করতে পারে।
বিগত বছরগুলোতে যেসব মেগা অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, তাদের অর্থনৈতিক উপযোগিতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ঋণ ও দ্বিপাক্ষিক ঋণের সুদের হার এবং কিস্তির পরিমাণ এখন রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে। অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল প্রকল্পে নতুন ঋণ গ্রহণ বন্ধ করে ঋণের গুণগত মান যাচাই করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, প্রতিটি ডলার ঋণ যেন কেবল এমন প্রকল্পে ব্যয় হয় যা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পারে অথবা আমদানির বিকল্প তৈরি করে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটায়।
আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দুর্বলতা হলো এর একক পোশাক নির্ভরতা। দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে কেবল একটি খাত থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো কারণে পোশাকের চাহিদা বা বাণিজ্য নীতিমালায় পরিবর্তন ঘটলে পুরো জাতীয় অর্থনীতি চরম ঝুঁকিতে পড়ে। এই ঝুঁকি থেকে বাঁচতে হলে চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স এবং সফটওয়্যার খাতের মতো উচ্চ সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে পোশাক শিল্পের সমপরিমাণ শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি ও প্রণোদনা সুবিধা প্রদান করতে হবে।
আভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন অপরিহার্য। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত (মাত্র ৮ শতাংশ) দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বনিম্ন। এর মূল কারণ হলো উচ্চবিত্ত কর ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং কর প্রশাসনকে শতভাগ ডিজিটাল না করা। সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর নতুন কর চাপানোর পরিবর্তে শীর্ষ ধনকুবের ও মেগা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর ফাঁকি বন্ধ করা গেলে রাজস্ব বাজেট দ্বিগুণ করা সম্ভব, যা দেশকে বিদেশি ঋণের ভিক্ষার হাত থেকে চিরতরে মুক্ত করবে।
পরিশেষে বলতে হয়, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা কোনো অলীক স্বপ্ন নয়; এটি সুপরিকল্পিত নীতির সাহসী বাস্তবায়ন। যদি আমরা অর্থ পাচার চিরতরে বন্ধ করতে পারি, জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারি এবং বিশ্ববাজারে নিজস্ব ব্র্যান্ডের বৈচিত্র্যময় পণ্য নিয়ে দাঁড়াতে পারি, তবেই বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
