মতামত: খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও ক্ষুদ্র কৃষকের অধিকার—জলবায়ু সংকটের মুখে কৃষিকে রক্ষার জাতীয় রণনীতি
আঠারো কোটি মানুষের প্রতিদিনের অন্ন সংস্থানকারী এ দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরাই হলেন বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত ও নিঃস্বার্থ বীর সেনানী। ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততার মতো চরম প্রতিকূলতার সাথে অবিরাম যুদ্ধ করে তারা এ দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলান, বাজারের মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের নির্মম শোষণে সেই কৃষকই তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। একদিকে ধান কাটার মৌসুমে ধানের পানির দর, অন্যদিকে বাজারে চাল কিনতে গিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত ভোক্তার নাভিশ্বাস—এই নিষ্ঠুর প্যারাডক্স আমাদের কৃষি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কলঙ্ক।
জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাত আজ সরাসরি আঘাত হানছে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তিতে। সমুদ্রের নোনা পানির অনুপ্রবেশের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ হেক্টর উর্বর ফসলি জমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় বোরো ধানের সেচ খরচ কৃষকদের জন্য এক অসহনীয় বোঝায় পরিণত হয়েছে। এই দ্বিমুখী সংকট থেকে কৃষিকে বাঁচাতে হলে প্রচলিত সনাতন কৃষি পদ্ধতির বদলে জলবায়ু-সহনশীল স্মার্ট প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের গবেষণাগারগুলোতে আবিষ্কৃত লবণাক্ততা, খরা ও জলমগ্নতা-সহনশীল আধুনিক ধানের জাতগুলোকে দ্রুত মাঠ পর্যায়ে কৃষকের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। কৃষিতে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক জৈব সার ও আইপিএম (সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা) পদ্ধতির প্রসার ঘটাতে হবে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে সেচ কাজে নদী ও খালের উপরিভাগের পানি (সারফেস ওয়াটার) ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। সোলার সেচ পাম্পের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করে ডিজেলচালিত সেচের ব্যয়বহুল ও দূষণকারী ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে হবে।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন খাদ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। সরকারি ধান-চাল সংগ্রহে মধ্যস্বত্বভোগী ও দলীয় ক্যাডারদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ওয়ালেটে টাকা পরিশোধের ডিজিটাল সিস্টেম চালু করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার এবং শস্য গুদাম স্থাপন করতে হবে, যাতে ফসল তোলার পরপরই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য না হয়ে কৃষক তার পণ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করতে পারেন এবং উপযুক্ত সময়ে ভালো দামে বিক্রি করতে পারেন।
খাদ্য নিরাপত্তা কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি সরাসরি রাষ্ট্রের জাতীয় সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে দেশ অন্যের খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল, তার স্বাধীনতা কখনোই নিরাপদ হতে পারে না। আমাদের কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো কোনো অনুকম্পা নয়, এটি আমাদের নিজেদের বেঁচে থাকার নৈতিক ও কৌশলগত দায়িত্ব। ক্ষুদ্র কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত করতে পারলেই বাংলাদেশ চিরকাল খাদ্য ও পুষ্টিতে স্বাবলম্বী হয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।
