মুক্ত গণমাধ্যম ও সুশাসন: সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রাষ্ট্রের শত্রু নয়, বরং জাতীয় সুরক্ষার সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রহরী
একটি সভ্য, দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণমাধ্যম হলো সমাজের আয়না এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু যখন কোনো রাষ্ট্রে সত্য প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, সাংবাদিকদের হয়রানিমূলক আইনের জালে আবদ্ধ করা হয় এবং গণমাধ্যমের ওপর অদৃশ্য সেন্সরশিপের ছায়া চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার ভুল সংশোধনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যে সমাজে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, সেখানেই দুর্নীতি অপ্রতিরোধ্য হয়েছে, ব্যাংকিং খাত ধসে পড়েছে এবং সমাজে বৈষম্যের বিষবৃক্ষ ডালপালা মেলেছে। মুক্ত গণমাধ্যম কোনো রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়; বরং তা জাতীয় সুরক্ষার অন্যতম প্রধান ঢাল।
সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো তথ্যপ্রবাহের অবাধ স্বাধীনতা। সরকার বা প্রশাসনের কোনো স্তরে যদি কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটে, তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের কাজের মাধ্যমেই তা প্রথম প্রকাশ্যে আসে। একজন সৎ সাংবাদিক যখন সমাজ বা রাষ্ট্রের কোনো ত্রুটি তুলে ধরেন, তখন তিনি কোনো শত্রুতা করেন না; বরং তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রকে সেই ত্রুটি সংশোধন করার একটি অনন্য সুযোগ উপহার দেন। যে সকল শাসক সত্য উদঘাটনকারী সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেন, তারা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের পায়ের নিচের মাটিকেই দুর্বল করে তোলেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষায় সর্বাগ্রে প্রয়োজন সাংবাদিকদের আইনি ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অতীতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা নিবর্তনমূলক ও কঠোর ডিজিটাল আইনগুলো বাতিল করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্পন্ন বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কোনো সাংবাদিকের ওপর শারীরিক আক্রমণ বা হুমকি প্রদানকে কঠোর শাস্তিযোগ্য রাষ্ট্রীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। একই সাথে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে সাংবাদিক হত্যার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাধীনতার পাশাপাশি গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ দায়িত্বশীলতা ও বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষা করাও অত্যন্ত জরুরি। কোনো প্রকার দলীয় বা করপোরেট এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার না হয়ে গণমাধ্যমকে শতভাগ জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। পক্ষপাতহীন ও সঠিক তথ্য যাচাইয়ের (ফ্যাক্ট-চেকিং) সর্বোচ্চ মানদণ্ড মেনে সংবাদ প্রকাশ করলেই কেবল পাঠকদের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব। সাংবাদিকদের জন্য সম্মানজনক বেতন কাঠামো ও নিয়মিত ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন করা জরুরি, যাতে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কোনো সাংবাদিক আপস করতে বাধ্য না হন।
গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি যদি স্বাধীনভাবে ও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে রাষ্ট্রের বাকি তিনটি স্তম্ভ—আইনসভা, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ—তাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হয়। মুক্ত চিন্তার বিকাশ, মত প্রকাশের অবাধ পরিবেশ এবং সাংবাদিকদের সত্য বলার সাহসের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ, সুন্দর ও স্বৈরাচারমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ।
