নদীমাতৃক বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষা: নদী দখল ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনের আপসহীন প্রয়োগের সময় এসেছে
নদীমাতৃক বাংলাদেশ কেবল একটি ভৌগোলিক উক্তি নয়; নদীই হলো এই জনপদের জীবন, সভ্যতা, কৃষি ও অর্থনীতির মূল ধমনী। শত শত নদী জালের মতো ছড়িয়ে থেকে এই ব-দ্বীপকে উর্বর ও সমৃদ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার দাপট, প্রভাবশালী দখলদারদের আগ্রাসন এবং অনিয়ন্ত্রিত বিষাক্ত শিল্প বর্জ্যের কারণে আমাদের নদীগুলো আজ ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা থেকে শুরু করে কর্ণফুলী পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নদী আজ দূষণের বিষবাষ্পে জর্জরিত এবং দখলদারদের তৈরি অবৈধ বহুতল ভবন, ইটভাটা আর কলকারখানায় সংকুচিত হয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদী হত্যা মানে প্রকারান্তরে দেশের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বকেই খুন করা।
নদী রক্ষার লড়াইয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ঐতিহাসিক রায় দিয়ে নদীকে 'জীবন্ত সত্তা' বা লিগ্যাল পারসন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। নদীগুলোর সুরক্ষায় গঠিত হয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। কিন্তু আদালতের যুগান্তকারী আদেশ এবং কমিশনের সুস্পষ্ট তালিকা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আমলাতান্ত্রিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে শীর্ষ দখলদারদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি। ছোটখাটো টং দোকান উচ্ছেদ করে বাহবা নেওয়া হলেও প্রভাবশালী শিল্পপতি ও রিয়েল এস্টেট চক্রের দখলে থাকা নদীর শত শত একর জমি উদ্ধারে প্রশাসন প্রায়শই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এই অসম ও আপসকামী দৃষ্টিভঙ্গির অবসান ঘটাতে হবে এখনই।
নদী সুরক্ষায় শূন্য সহনশীলতার (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করতে হবে। নদীর সীমানা নির্ধারণে ডিজিটাল জিআইএস ম্যাপিং এবং সিএস রেকর্ডের ভিত্তিতে স্থায়ী পিলার স্থাপন করতে হবে। নদীর জায়গায় গড়ে ওঠা যে কোনো অবৈধ স্থাপনা—তা যত প্রভাবশালী ব্যক্তিরই হোক না কেন—বিনা দ্বিধায় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি যেসব কারখানা অপরিশোধিত বিষাক্ত কেমিক্যাল সরাসরি নদীতে ফেলছে, তাদের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ তাৎক্ষণিক বিচ্ছিন্ন করাসহ কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে কঠোর মামলা দায়ের করতে হবে।
নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারে বৈজ্ঞানিক ও দীর্ঘমেয়াদী ড্রেজিং মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া জরুরি। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। নদীর দুই তীর দখলমুক্ত করে সবুজ বৃক্ষরোপণ এবং দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করতে হবে, যাতে নাগরিকরা সরাসরি নদীর সাথে সংযুক্ত হতে পারেন। যখন জনগণ নদীর পাড়ে হাঁটবেন এবং নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করবেন, তখন তারাই নদীর সবচেয়ে শক্তিশালী পাহারাদারে পরিণত হবেন।
নদী বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ, নদী মরলে মরবে দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক অভিঘাত যখন আমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে, তখন আমাদের নিজস্ব নদীগুলোকে রক্ষা করা জাতীয় টিকে থাকার প্রধান লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত দৃঢ়তায় নদী দখলদার ও দূষণকারীদের চিরতরে পরাজিত করে বাংলার নদীগুলোকে তাদের চিরন্তন সজীবতা ও অবাধ প্রবাহে ফিরিয়ে দিতে হবে।
