সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা: চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে নিঃস্ব হওয়ার হাত থেকে জনগণকে রক্ষার নৈতিক দায়িত্ব
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের আসল পরিচয় প্রকাশ পায় তার নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য ও অসুস্থতার সময় তাদের পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের গভীরতায়। বাংলাদেশে বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থার সবচেয়ে নির্মম ও বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো যে, একজন নাগরিকের চিকিৎসার ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি অর্থ তাকে নিজের পকেট থেকে (আউট-অব-পকেট এক্সপেনডিচার) সরাসরি পরিশোধ করতে হয়। প্রতি বছর পরিবারের কোনো সদস্যের ক্যান্সার, কিডনি ডায়ালাইসিস, হৃদরোগ কিংবা জটিল অস্ত্রোপচারের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে লাখ লাখ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার তাদের সহায়-সম্বল বিক্রি করে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে পতিত হচ্ছে। এটি কেবল একটি চিকিৎসা সংকট নয়; এটি একটি গভীর মানবিক ও সামাজিক অবিচার।
এই বিপর্যয় থেকে দেশের কোটি কোটি পরিবারকে রক্ষা করতে হলে একটি জাতীয় সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি (ইউএইচসি) এবং বাধ্যতামূলক 'জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা' চালু করা রাষ্ট্রের এক নম্বর অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যেভাবে কর-অর্থায়ন ও সামাজিক স্বাস্থ্যবীমার সমন্বয়ে প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছে, সেই সফল মডেলের আলোকে আমাদের একটি শক্তিশালী জাতীয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে গঠিত এই তহবিলের মাধ্যমে যেকোনো নাগরিকের জরুরি ও জটিল চিকিৎসা খরচ সরাসরি রাষ্ট্রীয় বীমা থেকে পরিশোধ করা হবে।
জাতীয় স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সর্বাগ্রে প্রয়োজন তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে শতভাগ সক্রিয় ও বিশ্বমানের করা। প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার আধুনিক ল্যাবরেটরি, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ব্যাকআপ এবং শতভাগ জীবনরক্ষাকারী ওষুধের বিনামূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকদের উপজেলা পর্যায়ে পদায়ন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন, সন্তানদের আধুনিক শিক্ষার সুযোগ এবং উচ্চতর প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো হাসপাতাল চিকিৎসকবিহীন না থাকে।
ওষুধের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অতিরিক্ত ফি আদায় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্বাধীন 'স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক কমিশন' গঠন করা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় মেডিকেল টেস্ট করিয়ে রোগীদের আর্থিক রক্তক্ষরণ ঘটানো কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। রোগ নির্ণয়ের প্রতিটি ফি এবং হাসপাতালের প্রতিটি সেবার খরচ সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট করে প্রকাশ্য চার্টে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা উচিত।
স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ বর্তমানে জিডিপির মাত্র ১ শতাংশেরও কম, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (কমপক্ষে ৫ শতাংশ) থেকে অনেক নিচে। স্বাস্থ্য খাতের এই বরাদ্দকে কোনো দয়া বা অনুদান নয়, বরং দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ রক্ষার সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একজন নাগরিক যখন জানবেন যে অসুস্থ হলে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে, তখন তার আত্মবিশ্বাস ও জাতীয় উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করাই হোক আমাদের আগামী বাংলাদেশের প্রধান অঙ্গীকার।
