আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (আফসিএফটিএ) পূর্ণাঙ্গ কার্যকর: বিশ্বের সর্ববৃহৎ একক অর্থনৈতিক বাজারের আত্মপ্রকাশ
আফ্রিকা মহাদেশের ৫৪টি দেশের ১.৩ বিলিয়ন মানুষের জন্য এক অর্থনৈতিক নবদিগন্তের সূচনা করে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য ও সমন্বিত ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থার আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ যাত্রা শুরু করেছে 'আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া' (আফসিএফটিএ)। ঘানার আক্রায় অবস্থিত আফসিএফটিএ সচিবালয়ে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অর্থনৈতিক সম্মেলনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ও আফ্রিকান ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা এই ঐতিহাসিক অর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতিষ্ঠার পর সদস্য দেশের সংখ্যার বিচারে এটিই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য বাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
নতুন কার্যকর হওয়া চুক্তির মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শিল্পপণ্য, কাঁচামাল এবং কৃষিপণ্যের আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের ওপর বিদ্যমান প্রায় ৯০ শতাংশ শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে আফ্রিকা মহাদেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য, যা পূর্বে ইউরোপ বা এশিয়ার সাথে বাণিজ্যের তুলনায় মাত্র ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল, তা আগামী ৫ বছরের মধ্যে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ শতাংশের ওপরে পৌঁছাবে। আন্তঃদেশীয় অর্থ লেনদেন সহজ করতে চালু করা হয়েছে প্যান-আফ্রিকান পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেম (প্যাপস), যা স্থানীয় মুদ্রায় তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক দায় মেটানোর সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
আফ্রিকার বৃহৎ অর্থনীতিগুলো—নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, কেনিয়া এবং ঘানা—এই অর্থনৈতিক একীভূতকরণের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। মহাদেশটির নিজস্ব খনিজ সম্পদ, যেমন কোবাল্ট, লিথিয়াম, তামা ও প্লাটিনাম এখন বিদেশে নামমাত্র মূল্যে কাঁচামাল হিসেবে রপ্তানি না করে আফ্রিকার নিজস্ব কারখানায় বৈদ্যুতিক ব্যাটারি, সোলার প্যানেল ও অটোমোবাইলে রূপান্তর করা হচ্ছে। এতে মহাদেশজুড়ে লাখ লাখ নতুন শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, আফসিএফটিএ বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ৩ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে এবং প্রায় ৭ কোটি মানুষের জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটবে। দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক সীমানা ও শুল্ক বাধার কারণে যে অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে ছিল, এই একক বাজার ব্যবস্থা আফ্রিকাকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক নতুন শক্তিশালী কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করল।
বাংলাদেশ, চীন ও ভারতের মতো প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলো আফ্রিকার এই ঐতিহাসিক অগ্রগতিকে এক বিশাল রপ্তানি ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ শিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য আফ্রিকার এই সুবিশাল সমন্বিত বাজারে সরাসরি শিল্প কারখানা স্থাপন ও যৌথ উদ্যোগের এক স্বর্ণালী সুযোগ তৈরি হলো, যা দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।


