জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ পুনর্গঠনে নজিরবিহীন ঐকমত্য: উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য স্থায়ী সদস্যপদ ও ভেটো সংস্কারের রূপরেখা চূড়ান্ত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতি ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে ঘটে যাওয়া বৈপ্লবিক রূপান্তরকে প্রতিফলিত করতে এবং জাতিসংঘকে একুশ শতকের আন্তর্জাতিক সংকটে কার্যকর ও গণতান্ত্রিক রূপ দিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (ইউএনএসসি) পুনর্গঠনে ঐতিহাসিক এক ঐকমত্যে পৌঁছেছে সাধারণ পরিষদ। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত বিশেষ সাধারণ অধিবেশনে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির শক্তিশালী অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২৫-এ উন্নীত করার ঐতিহাসিক খসড়া প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে।
গৃহীত সংস্কার রূপরেখার সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হলো উন্নয়নশীল বিশ্বের (গ্লোবাল সাউথ) দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটানো। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে দুটি, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে দুটি এবং ল্যাটিন আমেরিকা থেকে একটি দেশকে নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ প্রদানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। এছাড়া অস্থিতিশীল সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয় রোধে বিদ্যমান স্থায়ী পাঁচ সদস্যের (পি-৫) বিতর্কিত একক 'ভেটো ক্ষমতা' প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে; গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো দেশ একক ভেটো প্রয়োগ করতে পারবে না।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি এই অর্জনকে বিশ্ব কূটনীতির এক ঐতিহাসিক পুনর্জন্ম বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, '১৯৪৫ সালের বিশ্ব আর ২০২৬ সালের বিশ্ব এক নয়। আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার মতো বিশাল ভূখণ্ড এবং বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের কোনো স্থায়ী প্রতিনিধি না রেখে নিরাপত্তা পরিষদ তার আন্তর্জাতিক নৈতিক বৈধতা ধরে রাখতে পারছিল না। এই ঐতিহাসিক পুনর্গঠন জাতিসংঘকে পুনরায় বিশ্ব মানবতার এক অবিসংবাদিত মিলনমেলায় পরিণত করল।'
ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া এবং জাপানসহ সংস্কারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসা 'জি-ফোর' জোট ও আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতারা এই সিদ্ধান্তকে বিপুল বিজয়ের সংবর্ধনা দিয়েছেন। তারা মন্তব্য করেছেন যে, নিরাপত্তা পরিষদের এই গণতান্ত্রিক রূপান্তর বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তিগুলোর দ্বিমুখী নীতি ও অন্যায্য আধিপত্যের চিরতরে অবসান ঘটাবে এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে একটি সুষম ও ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তা পরিষদের এই সংস্কার কার্যকর হলে বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচার, দারিদ্র্য বিমোচন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ সর্বোচ্চ সুরক্ষা পাবে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রান্তের কণ্ঠস্বর যখন আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ টেবিলে সমান মর্যাদা পাবে, তখন বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘ এক অনন্য অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হবে।


