জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও পূর্ণ মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সর্বসম্মত অনুমোদন
দীর্ঘ কয়েক মাসের তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও বৈশ্বিক উদ্বেগের পর অবশেষে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ মধ্যপ্রাচ্যে অবিলম্বে একটি স্থায়ী ও টেকসই যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং গাজা উপত্যকায় সর্বাত্মক মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর ঐতিহাসিক প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করেছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত জরুরি অধিবেশনে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রই এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের পক্ষে ইতিবাচক ভোট প্রদান করে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক সনদ সমুন্নত রাখতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের এই সর্বসম্মত অবস্থানকে বৈশ্বিক কূটনীতির এক ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গৃহীত প্রস্তাবনায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ দলের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে অবিলম্বে সকল ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে রাফাহ সীমান্ত ও কেরেম শালোম ক্রসিং দিয়ে খাদ্যশস্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও জ্বালানিবাহী শত শত ট্রাককে কোনো প্রকার তল্লাশির নামে অযথা কালক্ষেপণ না করে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবেশের অনুমতি দিতে বলা হয়েছে। হাসপাতাল, শরণার্থী শিবির এবং জাতিসংঘের ত্রাণকেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অবিলম্বে পুনর্স্থাপনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নিরাপত্তা পরিষদকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, 'এটি কেবল একটি কাগুজে প্রস্তাব নয়; এটি লাখ লাখ নিরপরাধ শিশু, নারী ও বেসামরিক মানুষের বাঁচার আকুল আকুতির প্রতি বিশ্ববিবেকের সাড়া। অবিলম্বে এই প্রস্তাবের প্রতিটি ধারা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া আহত মানুষদের কাছে জরুরি চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।'
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফ তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন তদারকিতে মাঠে নামার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। যুদ্ধাহত হাজার হাজার শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে জরুরি ভিত্তিতে স্থানান্তর এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা দ্রুত মেরামতে আন্তর্জাতিক প্রকৌশলী ও স্বেচ্ছাসেবী দলগুলোকে মোতায়েন করা হচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডে সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে পোলিও ও কলেরার গণটিকাদান কর্মসূচি অবিলম্বে শুরু করা হবে।
বিশ্বের প্রধান প্রধান রাজধানীগুলো—লন্ডন, প্যারিস, বেইজিং ও আঙ্কারা—এই প্রস্তাবকে শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাময়িক যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুই-রাষ্ট্রীয় সমাধানের (টু-স্টেট সলিউশন) স্থায়ী রাজনৈতিক রূপরেখা বাস্তবায়নই কেবল এই দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংকটের চিরস্থায়ী অবসান ঘটাতে পারে।


