জেনেভায় ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক এআই চুক্তি স্বাক্ষরিত: শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ফ্রন্টিয়ার লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোর দ্রুতগতির বিকাশ মানবজাতির নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যাতে কোনো অস্তিত্বগত সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্বের ৮০টিরও বেশি শীর্ষ অর্থনীতির দেশ প্রথম ঐতিহাসিক 'গ্লোবাল এআই গভর্নেন্স অ্যান্ড সেফটি ট্রিটি' স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) এবং জাতিসংঘের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বনেতারা এআই গবেষণায় কড়া নৈতিক মানদণ্ড এবং স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের সুরক্ষা অডিট বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
চুক্তির অন্যতম প্রধান ধারা অনুযায়ী, যেকোনো বাণিজ্যিক বা সামরিক প্রতিষ্ঠান যদি ফ্রন্টিয়ার মডেল (যেসব এআই মডেলের কম্পিউটেশনাল ক্ষমতা ১০ টু দ্য পাওয়ার ২৬ ফ্লোটিং-পয়েন্ট অপারেশনের বেশি) প্রশিক্ষণ দিতে চায়, তবে তাদের সরকারি অনুমোদন ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পূর্বেই বিস্তারিত ঝুঁকি মূল্যায়ন রিপোর্ট প্রদান করতে হবে। পারমাণবিক প্রযুক্তি, জৈব রাসায়নিক অস্ত্রের নকশা তৈরি কিংবা জাতীয় সাইবার অবকাঠামোতে আক্রমণ চালাতে সক্ষম এমন কোনো অ্যালগরিদম বিকাশ কঠোরভাবে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড, মাইক্রোসফট এবং অ্যানথ্রপিকের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই রিসার্চ ল্যাবগুলোর প্রধান নির্বাহীরা এই আন্তর্জাতিক রূপরেখাকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়েছেন। শীর্ষ প্রযুক্তিবিদরা বলেছেন, অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতার বদলে যদি একটি বৈশ্বিক অভিন্ন সুরক্ষা কাঠামো থাকে, তবে বিজ্ঞান ও চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই-এর বিস্ময়কর ক্ষমতা মানবজাতির কল্যাণে নিরাপদভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে ক্যানসার গবেষণা, আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং পরিবেশবান্ধব উপাদান আবিষ্কারে এআই বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।
চুক্তিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণে একটি বিশেষায়িত 'গ্লোবাল এআই কম্পিউট অ্যান্ড ট্যালেন্ট ফান্ড' গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গবেষক ও শিক্ষার্থীরা উন্নত সুপারকম্পিউটার ক্লাস্টার ব্যবহারের সুযোগ পাবেন, যাতে এআই-এর সুফল কেবল ধনী দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র মানবজাতির যৌথ সম্পদে পরিণত হয়। ডিপফেক ভিডিও ও নির্বাচন প্রভাবিত করার অপপ্রচার ঠেকাতে কৃত্রিম মাধ্যমে তৈরি প্রতিটি কনটেন্টে ক্রিপ্টোগ্রাফিক ওয়াটারমার্কিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জেনেভা চুক্তিকে ১৯৫০-এর দশকের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) প্রতিষ্ঠার মতো এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। একটি যৌথ আন্তর্জাতিক এআই নজরদারি সংস্থা গঠনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা মানবজাতির ভবিষ্যৎকে এক নিরাপদ ও প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ আলোর দিশা দেখাবে।


