চাঁদে স্থায়ী মানব বসতি গড়ার পথে ঐতিহাসিক অগ্রগতি: চন্দ্রপৃষ্ঠে পানির বরফ থেকে সফলভাবে অক্সিজেন ও জ্বালানি উৎপাদনের পরীক্ষা সম্পন্ন
মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন সোনালী দিগন্তের সূচনা করে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফলভাবে পানির বরফ থেকে উচ্চ বিশুদ্ধতার অক্সিজেন ও তরল হাইড্রোজেন রকেট জ্বালানি নিষ্কাশনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে নাসা ও আর্টেমিস আন্তর্জাতিক মহাকাশ জোট। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর চির-অন্ধকারাচ্ছন্ন খাঁদ 'শ্যাকেলটন ক্রেটার'-এ প্রেরিত অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক এক্সপ্লোরার 'ভাইপার' এবং সংযুক্ত কেমিক্যাল প্রসেসিং ল্যাবরেটরি এই যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে চাঁদে মানুষের স্থায়ী ঘাঁটি বা পার্মানেন্ট লুনার বেস স্থাপনের প্রধান বৈজ্ঞানিক বাধা অপসারিত হলো।
ওয়াশিংটনে নাসার সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আর্টেমিস প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ইএসএ) শীর্ষ প্রকৌশলীরা এই গবেষণার অভূতপূর্ব ফলাফল বিশদভাবে প্রকাশ করেন। চাঁদের রেগোলিথ বা মাটির নিচে জমাট বাঁধা বরফকে তাপীয় লেজার রশ্মির সাহায্যে বাষ্পীভূত করে আধুনিক ইলেক্ট্রোলাইসিস পদ্ধতিতে অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেনে রূপান্তর করা হয়েছে। উৎপাদিত অক্সিজেন ভবিষ্যতের নভোচারীদের শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজে ব্যবহার করা যাবে এবং হাইড্রোজেন ও তরল অক্সিজেনকে একত্রিত করে তৈরি হবে স্পেসক্রাফটের গভীর মহাকাশ জ্বালানি।
নাসা প্রশাসক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'পৃথিবী থেকে চাঁদে জল বা অক্সিজেন পরিবহন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রায় অসম্ভব ছিল। চাঁদের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে সেখানেই বাঁচার উপকরণ এবং রকেটের জ্বালানি তৈরির এই সক্ষমতা (ইন-সিটু রিসোর্স ইউটিলাইজেশন) মানবজাতিকে চিরতরে বহু-গ্রহীয় প্রজাতিতে রূপান্তর করার প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ। চাঁদ এখন কেবল অবতরণের স্থান নয়; এটি হবে মঙ্গল গ্রহে মানুষের যাত্রার প্রধান রিফুয়েলিং স্টেশন।'
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলো—স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিন—আর্টেমিসের এই সফলতাকে ভিত্তি করে চাঁদের বুকে স্থায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আবাসন মডিউল প্রেরণের প্রস্তুতি জোরদার করেছে। চাঁদের মেরু অঞ্চলে সার্বক্ষণিক সূর্যালোকিত শৃঙ্গগুলোতে স্থাপন করা হচ্ছে আল্ট্রা-লাইটওয়েট সোলার অ্যারে এবং ক্ষুদ্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি (সারফেস পাওয়ার ফিশন সিস্টেম), যা রাতের চরম শীতল তাপমাত্রাতেও নভোচারীদের জন্য উষ্ণতা ও শক্তির নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করবে।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইন ও নীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, চাঁদে সফলভাবে সম্পদ নিষ্কাশনের এই ঐতিহাসিক ঘটনা 'আর্টেমিস অ্যাকর্ডস' এর অধীনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। জাপান, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অংশীদার দেশগুলোর বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চাঁদের মাটিতে প্রথম স্থায়ী মানব বসতি 'আর্টেমিস বেস ক্যাম্প' স্থাপন সম্পন্ন করবেন, যা মানবসভ্যতার অনন্ত মহাবিশ্ব জয়ের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেবে।


