দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মুখস্থবিদ্যার দাসত্ব ও পরীক্ষার ভয়াবহ মানসিক চাপ থেকে মুক্ত করে একটি আনন্দময়, প্রায়োগিক ও একুশ শতকের আন্তর্জাতিক উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর করতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী শিক্ষাক্রম সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে। শিক্ষাবিদ, শিশু মনোবিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞান গবেষকদের দীর্ঘদিনের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণীত এই নতুন পাঠ্যক্রমে মুখস্থ করে খাতায় লেখার সনাতন পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে প্রজেক্টভিত্তিক শিখন, দলগত সমস্যা সমাধান (প্রবলেম সলভিং) এবং অনুসন্ধিৎসু বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিকাশকে মূল ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক সূত্রগুলোকে মুখস্থ করার পরিবর্তে হাতে-কলমে পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝার সুযোগ সৃষ্টি। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি করে 'বেসিক সায়েন্স অ্যান্ড ক্রিয়েটিভিটি ল্যাব' স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে সৌরশক্তি, উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং রোবোটিক্সের প্রাথমিক নীতিগুলো সরাসরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শিখছে। এতে শিশুদের মনে বিজ্ঞানের প্রতি অসীম কৌতূহল ও উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটছে, যা বিজ্ঞান ভীতির স্থায়ী অবসান ঘটাচ্ছে। গণিত ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় আনা হয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। শুকনো সংখ্যা ও সূত্রের পরিবর্তে কম্পিউটার কোডিংয়ের লজিক, অ্যালগরিদমিক চিন্তা এবং দৈনন্দিন জীবনে গণিতের বাস্তব প্রয়োগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য মৌলিক কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, ডেটা হ্যান্ডলিং এবং ইন্টারনেটে সাইবার নিরাপত্তার প্রাথমিক পাঠ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার সাধারণ ভোক্তা না হয়ে প্রযুক্তির নির্মাতা হওয়ার মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে। মূল্যায়ন পদ্ধতিতে আনা হয়েছে আমূল সংস্কার। বছরের শেষে কেবল একটি লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর ভবিষ্যৎ ভাগ্য নির্ধারণের বদলে সারাবছরের ক্লাসের সক্রিয় অংশগ্রহণ, দলগত প্রজেক্টের মান, মানবিক আচরণ ও সৃজনশীল কাজকে ভিত্তি করে 'ধারাবাহিক মূল্যায়ন' (কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্ট) চালু করা হয়েছে। এর ফলে প্রাইভেট টিউশন ও নোটবই বা গাইডবইয়ের ওপর কোচিং সেন্টারের নির্ভরতা প্রায় শতভাগ হ্রাস পেয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও খেলার সময় সুরক্ষিত হয়েছে। শিক্ষা উপদেষ্টা এক জাতীয় সেমিনারে বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য কেবল সনদধারী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা নয়; আমাদের লক্ষ্য হলো একজন সৎ, মানবিক, যুক্তিবাদী ও বিশ্বমানের দক্ষ নাগরিক গড়ে তোলা। এই নতুন শিক্ষাক্রম বাংলাদেশকে একটি মেধাভিত্তিক আধুনিক জ্ঞান অর্থনীতিতে রূপান্তর করার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।' শিক্ষক ও অভিভাবকদের ইতিবাচক সাড়া প্রমাণ করছে যে, এই শিক্ষাক্রম দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক সোনালী রূপান্তরের পথে নিয়ে চলেছে।
উচ্চশিক্ষাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে খাঁটি মৌলিক গবেষণার জীবন্ত কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য গবেষণা ও উদ্ভাবন বাজেটে সর্বকালের রেকর্ড পরিমাণ বরাদ্দ প্রদান করেছে। বিগত অর্থবছরগুলোর তুলনায় এ বছর গবেষণা তহবিলের পরিমাণ প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি করে সরাসরি প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বিশেষায়িত গবেষণা গ্রান্ট ঘোষণা করা হয়েছে। এই বিশাল বিনিয়োগের সুফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জগতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত অর্ধশতাধিক উচ্চমানের মৌলিক গবেষণাপত্র সম্প্রতি নেচার, সায়েন্স, দ্য ল্যানসেট এবং আইইইই-এর মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ক্যানসারের নির্ভুল জিনোমিক সিকোয়েন্সিং, ডেঙ্গু ভাইরাসের ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট উদ্ভাবন, নতুন সুপারকন্ডাক্টিং উপাদান আবিষ্কার এবং চরম জলবায়ু-সহনশীল ফসলের উদ্ভাবনে বাংলাদেশি গবেষকদের এই সাফল্য আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে এক অনন্য আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ইউজিসি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, গবেষণার এই জোয়ার অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনার জন্য গবেষকদের সরাসরি সম্মানজনক অর্থ পুরস্কার এবং পেটেন্ট ফাইলিংয়ের পূর্ণাঙ্গ ব্যয় রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বহনের বিধান কার্যকর করা হয়েছে। যে সকল শিক্ষক বিশ্বমানের গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের প্রশাসনিক কাজের চাপ কমিয়ে সার্বক্ষণিক ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত থাকার জন্য বিশেষ 'ডিস্টিংগুইশড প্রফেসরশিপ' চালু করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে দেশের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে 'ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন সেল' সক্রিয় করা হয়েছে। ঔষধ কোম্পানিগুলো এখন বিদেশে কাঁচামাল পরীক্ষার পরিবর্তে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেক ল্যাবরেটরি থেকে গবেষণা সেবা গ্রহণ করছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল যেমন সমৃদ্ধ হচ্ছে, তেমনি মেধাবী মাস্টার্স ও পিএইচডি গবেষকরা উচ্চ বেতনের দেশীয় ফেলোশিপ সুবিধা লাভ করে গবেষণায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছেন। শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে পর্যাপ্ত বাজেট ও আধুনিক ল্যাব যন্ত্রপাতির অভাবে বহু প্রতিভাবান বিজ্ঞানী বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হতেন। দেশে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিবেশ তৈরি হওয়ায় এখন সেই মেধা পাচার বন্ধ হতে শুরু করেছে; এমনকি অনেক প্রবাসী বিজ্ঞানী আবার স্বদেশে ফিরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবগুলোতে যোগদান করছেন। এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থাকলে আগামী দশকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবনী কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে স্বগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
শিল্পায়নের যুগে দক্ষ প্রকৌশলী ও আন্তর্জাতিক মানের টেকনিশিয়ান তৈরির লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে তুলতে মেগা আধুনিকায়ন প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত 'ডুয়েল ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং' (ডিভিইটি) মডেলের আলোকে পলিটেকনিকগুলোর কারিকুলাম সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানো হয়েছে। এর ফলে একজন পলিটেকনিক শিক্ষার্থী এখন কেবল ক্লাসরুমে বই পড়ে নয়; বরং তার শিক্ষাবর্ষের অর্ধেক সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় আধুনিক শিল্প কারখানায় বাস্তব ইন্টার্ন হিসেবে প্রশিক্ষণ লাভ করছে। প্রকল্পটির আওতায় দেশের ৬৪টি জেলার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক সিএনসি মেশিন ল্যাব, রোবোটিকস ও অটোমেশন সেন্টার, অটোমোবাইল মেকাট্রনিক্স ওয়ার্কশপ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইওটি ল্যাবরেটরি। পুরোনো ও অপ্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক বিষয়গুলো বাদ দিয়ে আধুনিক শিল্প কারখানায় যেসব অত্যাধুনিক সফটওয়্যার ও যন্ত্র ব্যবহার করা হয়—যেমন পিএলসি প্রোগ্রামিং, সলিডওয়ার্কস থ্রি-ডি ক্যাড এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়্যারিং—সেগুলো শিক্ষাদানে শতভাগ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা চলাকালীনই আয়ের চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। শিল্প কারখানায় ইন্টার্নশিপ চলাকালীন প্রতিটি শিক্ষার্থীকে মাসিক সম্মানজনক স্টাইপেন্ড বা ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) এবং বাংলাদেশ মোটর পার্টস ও টেক্সটাইল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে নিশ্চিত করেছে যে, পলিটেকনিক থেকে সাফল্যের সাথে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা প্রতিটি দক্ষ শিক্ষার্থীকে সরাসরি স্থায়ী প্রকৌশলী ও সুপারভাইজার পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। ফলে পাস করার পর চাকরি খোঁজার কোনো অনিশ্চয়তা আর থাকছে না। আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারেও বাংলাদেশি ডিপ্লোমাধারীদের বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সনদপত্রকে ইউরোপিয়ান কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (ইকিউএফ) এবং অস্ট্রেলিয়ান স্কিলস কোয়ালিটি অথরিটির সাথে সমমান ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে দক্ষ পলিটেকনিক গ্র্যাজুয়েটরা এখন জার্মানি, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যে উচ্চ বেতনের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান লাভ করছেন, যা দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক রেমিট্যান্স অর্জনে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের প্রকৃত টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মেরুদণ্ড হলো তার দক্ষ কারিগরি মানবসম্পদ। পলিটেকনিক শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদায় সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করা এবং মেধাবী তরুণদের এই প্রায়োগিক লাইনে আগ্রহী করে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ শিল্পায়িত ও উৎপাদনশীল রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
প্রযুক্তির চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে দেশের নারীদের নেতৃত্ব ও মেধার অসামান্য মেলবন্ধন ঘটিয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) শিক্ষায় এক বৈপ্লবিক অগ্রযাত্রা সূচিত হয়েছে। অতীতে যেখানে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি বিভাগগুলোতে ছাত্রীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত নগণ্য, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ সরকারি প্রণোদনা, মেয়েদের জন্য সম্পূর্ণ অবৈতনিক কোডিং বুটক্যাম্প এবং মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের ফলে ছাত্রীদের ভর্তির হার প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে শতকরা ৪৫ ভাগে পৌঁছেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং শীর্ষস্থানীয় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে 'উইমেন ইন টেক' ফ্ল্যাগশিপ ফেলোশিপ প্রোগ্রাম। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রতিটি জেলা শহর থেকে মেধাবী নারী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে ক্লাউড কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি এবং মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের ওপর আন্তর্জাতিক সার্টিফাইড প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করা হাজার হাজার তরুণী এখন দেশি-বিদেশি শীর্ষ সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোতে রিমোট সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও এআই ডেভলপার হিসেবে কাজ করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন। বুয়েট, রুয়েট, কুয়েট ও চুয়েটসহ দেশের প্রধান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধার ভিত্তিতে প্রথম সারির স্থানগুলো দখল করছেন নারী শিক্ষার্থীরা। বৈশ্বিক আইইইই রোবোটিক্স কম্পিটিশন, নাসার স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের নারী প্রকৌশলীদের দল বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তিগুলোকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য গৌরব অর্জন করেছে। তাদের উদ্ভাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত স্তন ক্যানসার শনাক্তকরণ অ্যালগরিদম এবং অগ্নিনির্বাপক রোবট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর প্রশংসা কুড়িয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে একটি বিশেষায়িত 'জাতীয় নারী স্টেম ট্রাস্ট ফান্ড' গঠন করা হয়েছে। এই তহবিলের আওতায় যেসব ছাত্রী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন, তাদের টিউশন ফি মওকুফের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গবেষণা সম্মেলনে অংশগ্রহণের পূর্ণাঙ্গ বিমান ভাড়া ও আবাসন খরচ প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া ক্যাম্পাসগুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বিশেষায়িত স্মার্ট আবাসিক হোস্টেল নির্মাণ করা হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বাইরে রেখে কোনো দেশ স্মার্ট ও উন্নত হতে পারে না। প্রযুক্তি শিক্ষায় মেয়েদের এই ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ কেবল তাদের ব্যক্তিগত স্বাবলম্বিতা ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই বৃদ্ধি করছে না; বরং এটি দেশের সামগ্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রগতিশীল করে তুলছে। বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনে আত্মবিশ্বাসী এই নারীরাই আগামী দিনের সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কোনো শিশু যেন সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বা উপেক্ষিত না থাকে, সেই মহান সাংবিধানিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে বাংলাদেশের বিশেষ শিক্ষা (স্পেশাল এডুকেশন) অবকাঠামোতে এক ঐতিহাসিক ও আধুনিক রূপান্তর সাধিত হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে দেশের প্রতিটি জেলা সদরে অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, সেরিব্রাল পলসি এবং দৃষ্টি ও বাকপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আধুনিক সেন্সর সমৃদ্ধ 'ইনক্লুসিভ ডিজিটাল লার্নিং অ্যান্ড থেরাপি সেন্টার' সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই অত্যাধুনিক কেন্দ্রগুলোতে সাধারণ একঘেয়ে ক্লাসরুমের পরিবর্তে স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের মাল্টি-সেন্সরি থেরাপি রুম, অকুপেশনাল থেরাপি জোন, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাবরেটরি এবং সমন্বিত সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিং ডেস্ক। অটিস্টিক শিশুদের অতিরিক্ত উদ্দীপনা বা ভীতি দূর করতে শান্ত আলো ও নরম অ্যাকোস্টিক ডিজাইনে রুমগুলো সাজানো হয়েছে। উন্নত এআই ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর) প্রযুক্তির সাহায্যে শিশুদের রং চেনা, বর্ণমালা শেখা, হাত-চোখের সমন্বয় এবং সামাজিক যোগাযোগের মৌলিক দক্ষতাগুলো অত্যন্ত আনন্দময় খেলার ছলে শেখানো হচ্ছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল ব্রেইল ডিসপ্লে এবং টেক্সট-টু-স্পিচ স্ক্রিন রিডার প্রযুক্তিসম্পন্ন কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। বাংলা একাডেমি ও এনসিটিবির সকল পাঠ্যবইকে উচ্চমানের অডিও বুক ও ডিজিটাল ব্রেইল ফরম্যাটে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য উন্নত সাংকেতিক ভাষা (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ) প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি ক্লাসরুমে সার্বক্ষণিক স্বয়ংক্রিয় সাইন-টু-স্পিচ অনুবাদক ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যা শিক্ষকদের লেকচার তাৎক্ষণিক সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে স্ক্রিনে রূপান্তর করে। প্রকল্পটির আওতায় দেশের সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রতি সংবেদনশীল আচরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাদানের ওপর বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক ডিপ্লোমা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ ক্লাসরুমেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা তাদের সহপাঠীদের সাথে সমান মর্যাদায় বসে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে, যা সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা ও গভীর সহমর্মিতার সুস্থ পরিবেশ গড়ে তুলছে। বিশেষ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং অভিভাবকদের সংগঠনগুলো সরকারের এই মানবিক উদ্যোগকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতায় স্বাগত জানিয়েছে। মায়েরা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে জানিয়েছেন, অতীতে যেখানে সমাজের কটূক্তি ও অবহেলার শিকার হতে হতো, আজ তাদের বিশেষ সন্তানরা ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে ছবি আঁকছে, কোডিং শিখছে এবং খেলাধুলায় অংশ নিচ্ছে। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতাই একটি সমতাভিত্তিক, সুন্দর ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের সবচেয়ে উজ্জ্বল ভিত্তিপ্রস্তর।
ভাষার মর্যাদা রক্ষায় রক্ত দেওয়ার সুমহান ঐতিহ্যের অধিকারী বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি সুরক্ষায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতলে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল এবং সাদ্রি সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য তাদের নিজস্ব বর্ণমালা ও মাতৃভাষায় প্রণীত নতুন পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের পরিধি সফলভাবে সম্প্রসারণ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর ফলে শিশুরা এখন নিজের মাতৃভাষায় প্রথম পাঠ গ্রহণ করে আনন্দঘন পরিবেশে প্রাথমিক শিক্ষার শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলছে। অতীতে নিজেদের মাতৃভাষায় বই না থাকায় এবং বাংলা ভাষায় পর্যাপ্ত দক্ষতা না থাকায় বিদ্যালয়ের প্রথম কয়েক বছর পাহাড়ি ও প্রান্তিক আদিবাসী শিশুদের জন্য এক ভয়াবহ মানসিক ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়াত। ভাষা না বোঝার কারণে ঝরে পড়ার (ড্রপআউট) হার ছিল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এবং নৃবিজ্ঞানীদের গভীর গবেষণার মাধ্যমে প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা পুনরুদ্ধার করে রঙিন ও আকর্ষণীয় পাঠ্যবই রচনা করা হয়েছে। এতে শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বেড়ে প্রায় শতভাগে পৌঁছেছে এবং ঝরে পড়ার হার শূন্যে নেমে এসেছে। প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কয়েক হাজার শিক্ষিত তরুণ-তরুণীকে বিশেষায়িত মাতৃভাষা শিক্ষক হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সরাসরি নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। তারা শিশুদের নিজেদের ভাষায় ছড়া, লোকগাথা এবং ঐতিহ্যের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করছেন। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এখন শিশুরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে কোনো প্রকার সংকোচ ছাড়া স্বগৌরবে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে, যা তাদের মধ্যে গভীর আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করেছে। শুধু পাঠ্যবই মুদ্রণই নয়; এই বিপন্ন ভাষাগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ডিজিটাল আর্কাইভে অমর করে রাখতে চালু করা হয়েছে 'ন্যাশনাল ইন্ডিজেনাস ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাউড রিপোজিটরি'। সেখানে প্রতিটি ভাষার প্রাচীন গান, লোককাহিনি, প্রবাদ-প্রবচন এবং ব্যাকরণ ডিজিটাল অডিও ও টেক্সট আকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভাষাভাষী কম এমন চরম বিপন্ন ভাষাগুলোর (যেমন রেংমিটচা, খিয়াং ও লুসাই) জন্য এআই-চালিত ডিজিটাল অনুবাদক টুল তৈরি করা হচ্ছে, যা ভাষাগুলোকে চিরতরে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করবে। ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক ভাষাবিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের এই উদ্যোগকে বিশ্বের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণে এক অনুকরণীয় মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইউনেস্কোর প্রতিনিধিরা মন্তব্য করেছেন যে, ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য আত্মদানকারী জাতি হিসেবে বাংলাদেশ যেভাবে নিজের দেশের সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার অধিকার নিশ্চিত করেছে, তা সমগ্র বিশ্বের সামনে এক অনুপম আদর্শ। প্রতিটি শিশুর মাতৃভাষায় কথা বলা ও পড়ার অধিকার সুরক্ষার মাধ্যমেই একটি প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে সরাসরি বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ স্তরে সংযুক্ত করতে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) এবং টোকিও ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একাধিক ঐতিহাসিক বহুপাক্ষিক দ্বৈত-ডিগ্রি ও যৌথ গবেষণা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ সমন্বয়ে এই মেগা আন্তর্জাতিক শিক্ষা কূটনীতি সফল রূপ পরিগ্রহ করেছে। চুক্তির অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের মেধাবী গবেষক ও শিক্ষার্থীরা এখন আন্তর্জাতিক ল্যাবে সরাসরি কাজ করার পূর্ণাঙ্গ অর্থায়ন লাভ করবেন। জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল স্মার্ট গ্রিড, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ন্যানোটেকনোলজি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণায় যৌথ ফেলোশিপের আওতায় উভয় দেশের বিজ্ঞানীরা একযোগে কাজ করছেন। শিক্ষার্থীরা দেশে থেকেই এমআইটি বা অক্সফোর্ডের শীর্ষ প্রফেসরদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণার সুযোগ পাচ্ছেন এবং সফলভাবে থিসিস সম্পন্ন করার পর উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ডিগ্রি লাভ করছেন। শিক্ষার্থীদের ক্রেডিট ট্রান্সফার বা ক্রেডিট রূপান্তরের জটিলতা নিরসনে একটি আন্তর্জাতিক সমমান ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীরা কোনো প্রকার শিক্ষাবর্ষ নষ্ট না করে একটি সেমিস্টার জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটিতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্কলারশিপ নিয়ে শেষ করতে পারছেন এবং সেখানকার অত্যাধুনিক সুপারকম্পিউটার ও ল্যাব সুবিধা ব্যবহারের অমূল্য বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। আন্তর্জাতিক এই অংশীদারিত্ব দেশের শিল্প খাতেও এক বিশাল আশীর্বাদ নিয়ে এসেছে। এমআইটির সহযোগিতায় দেশে স্থাপিত হয়েছে 'অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড সেমিকন্ডাক্টর ইনকিউবেটর', যেখানে মাইক্রোচিপ ডিজাইন এবং ক্লিন এনার্জি হার্ভেস্টিংয়ের ওপর অত্যাধুনিক পাইলট প্রজেক্ট পরিচালিত হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক টেকনোলজি কোম্পানিগুলোর সাথে সরাসরি প্রযুক্তিগত সংযোগ তৈরি হচ্ছে, যা দেশের মেধা পাচার রোধ করতে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখছে। ইউজিসি সচিব জানিয়েছেন, এই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কেবল কয়েকটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ধাপে ধাপে দেশের সকল পাবলিক ও শীর্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে এই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে। আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক সম্প্রদায়ের সাথে এই শক্তিশালী মেলবন্ধন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে এক বিশ্বমানের আলোকবর্তিকায় পরিণত করেছে, যা আগামী দিনে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নেতৃত্বকে সুদৃঢ় ও অপরাজেয় রাখবে।
শিক্ষার্থীদের ওপর পড়াশোনার অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, একাকীত্ব এবং পারিবারিক প্রত্যাশার বোঝাজনিত মানসিক সংকট কাটিয়ে সুস্থ ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে দেশের সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ 'ক্যাম্পাস মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টার' স্থাপন শতভাগ বাধ্যতামূলক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। অতীতে মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা ও সামাজিক ট্যাবু মনে করার যে ক্ষতিকর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা চিরতরে ভেঙে দিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেশাদার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও সাইকিয়াট্রিস্টদের বিশেষজ্ঞ সেবা প্রদানের সুব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন এই আধুনিক ওয়েলনেস সেন্টারগুলোতে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ পরিচয় গোপন (কনফিডেন্সিয়াল) রেখে ওয়ান-অন-ওয়ান কাউন্সেলিং সেশনের সুযোগ রাখা হয়েছে। যে কোনো শিক্ষার্থী গভীর বিষণ্ণতা, পরীক্ষার উদ্বেগ, প্যানিক অ্যাটাক কিংবা পারিবারিক সংকটে পড়লে কোনো প্রকার সংকোচ ছাড়াই অনলাইনে বা সরাসরি এসে থেরাপিস্টের সাথে কথা বলতে পারছেন। সেন্টারগুলোতে নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্কশপ, মাইন্ডফুলনেস সেশন এবং মেডিটেশন ক্লাস, যা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্থিতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাসকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করছে। ক্যাম্পাসে আত্মহত্যা ও মানসিক বিপর্যয় প্রতিরোধে সহপাঠীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে প্রতিটি আবাসিক হল ও বিভাগে একদল নির্বাচিত শিক্ষার্থীকে নিয়ে 'পিয়ার সাপোর্ট ভলান্টিয়ার্স' দল গঠন করা হয়েছে। এই তরুণ ভলান্টিয়ারদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রটোকল অনুযায়ী সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইডের নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সহপাঠীদের কারো মধ্যে অস্বাভাবিক নীরবতা, হতাশা বা কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলেই তারা তাৎক্ষণিকভাবে সহানুভূতিশীল বন্ধু হিসেবে এগিয়ে আসছেন এবং প্রয়োজনে প্রফেশনাল সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার আওতায় আনতে বিশেষ ওরিয়েন্টেশন কোর্স চালু করা হয়েছে। ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের সাথে অতিরিক্ত কঠোর বা অপমানজনক আচরণ পরিহার করে কীভাবে সহানুভূতিশীল ও অনুপ্রেরণাদায়ী মেন্টরিং প্রদান করতে হয়, সে বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পরীক্ষা ও গ্রেডিং পদ্ধতিতে অতিরিক্ত চাপ কমানোর জন্য সুনির্দিষ্ট একাডেমিক গাইডলাইন প্রদান করা হয়েছে। মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা ইউজিসির এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে উচ্চশিক্ষা খাতের অন্যতম মানবিক অর্জন হিসেবে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা বলছেন, একজন শিক্ষার্থীর সিজিপিএ যতই ভালো হোক না কেন, যদি তার মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থ না থাকে, তবে সে সমাজ বা দেশকে কিছুই দিতে পারে না। ক্যাম্পাসগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা প্রদান করায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিণত হয়েছে আনন্দময় জ্ঞানার্জনের এক নিরাপদ ও প্রশান্তিময় আশ্রয়ে।
শিক্ষায় বৈষম্য দূর করতে এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তে জ্ঞানের আলো সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে চালু হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ উন্মুক্ত ডিজিটাল শিক্ষার ভাণ্ডার 'ন্যাশনাল ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্সেস (ওইআর) ও ই-লাইব্রেরি পোর্টাল'। এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সকল পাঠ্যবই, আন্তর্জাতিক রেফারেন্স বুক, দেশীয় সাহিত্যের অমূল্য ক্লাসিক এবং শীর্ষ অধ্যাপকদের হাজার হাজার ইন্টারেক্টিভ ভিডিও লেকচার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে যে কোনো নাগরিকের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত করা হয়েছে। নতুন এই ডিজিটাল পোর্টালে যুক্ত করা হয়েছে উচ্চগতির সার্চ ইঞ্জিন এবং আধুনিক এআই বুক রিকমেন্ডেশন সিস্টেম। একজন শিক্ষার্থী তার স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারের সাহায্যে মাত্র এক ক্লিকে যেকোনো বিষয়ের ওপর প্রয়োজনীয় বই, গবেষণাপত্র কিংবা লেকচার নোট ডাউনলোড করে অফলাইনে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ইন্টারনেটের ডেটা খরচ সাশ্রয়ে দেশের সকল মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক থেকে এই সরকারি শিক্ষামূলক পোর্টালে ব্রাউজিং সম্পূর্ণ 'জিরো-রেটেড' বা ডেটা চার্জমুক্ত রাখা হয়েছে, যা প্রত্যন্ত চরাঞ্চল ও পাহাড়ের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য এক পরম আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি বইকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেইল ডিসপ্লে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জীবন্ত বাংলা ভয়েস অডিও বুকে রূপান্তর করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিক জার্নাল প্রকাশক—যেমন স্প্রিঙ্গার, সায়েন্সডিরেক্ট এবং জেস্টোর—এর সাথে রাষ্ট্রীয় সাবস্ক্রিপশন চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় দেশের যেকোনো শিক্ষার্থী ও গবেষক বিনামূল্যে বিশ্বের সবচেয়ে দামি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পেপারগুলো পড়তে ও গবেষণা কাজে ব্যবহার করতে পারছেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা এই প্ল্যাটফর্মটিকে নিজেদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির প্রধান মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। পোর্টালে রয়েছে শিক্ষকদের জন্য আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি, লেসন প্ল্যান এবং মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন তৈরির প্রস্তুতকৃত উপকরণ। ফলে গ্রামের একটি প্রত্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকও রাজধানীর শীর্ষ ক্যাডেট কলেজের সমমানের আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে সক্ষম হচ্ছেন, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে শহর-গ্রামের বৈষম্য চিরতরে দূর করছে। শিক্ষা গবেষকরা বলছেন, জ্ঞানকে যখন পণ্যের কারাগার থেকে মুক্ত করে একটি সর্বজনীন মৌলিক অধিকারে রূপান্তর করা হয়, তখনই কেবল একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি ঘটে। ন্যাশনাল ওইআর পোর্টাল কেবল একটি ওয়েবসাইট নয়; এটি বাংলাদেশের কোটি শিক্ষার্থীর স্বপ্নপূরণের এক অফুরন্ত জ্ঞানের আলোকবর্তিকা, যা একটি স্বাবলম্বী, বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রগতিশীল সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণে আজীবন নেতৃত্ব দিয়ে যাবে।
একটি জাতির শিক্ষার গুণগত মান তার শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত যোগ্যতার ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল—এই শাশ্বত সত্যকে অনুধাবন করে দেশের শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও প্রশিক্ষণে এক ঐতিহাসিক রূপান্তর এনেছে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে দেশের সাড়ে তিন লাখেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য 'জাতীয় শিক্ষক মর্যাদা ও পদোন্নতি নীতিমালা' বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর আওতায় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র উচ্চতর বেতন স্কেল এবং আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞানের ওপর বাধ্যতামূলক বিশ্বমানের পেশাগত ডিপ্লোমা চালু করা হয়েছে। নতুন কাঠামোর আওতায় প্রাথমিক শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করে তাদের বেতন গ্রেড সরাসরি দশম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে এবং প্রধান শিক্ষকদের জন্য দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী মেধাবী তরুণ-তরুণীরা এখন শিক্ষকতাকে কোনো খণ্ডকালীন চাকরি হিসেবে না দেখে এক অনন্য সম্মানজনক ও দীর্ঘমেয়াদী আজীবন পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের নতুন পরীক্ষায় লক্ষ লক্ষ উচ্চশিক্ষিত স্নাতক অংশ নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করছেন। শিক্ষক প্রশিক্ষণে আনা হয়েছে আমূল ও বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন। দেশের সকল প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই) এবং টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিসি)-কে আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, সাইকোলজি রিসার্চ রুম এবং মাইক্রো-টিচিং স্টুডিওতে রূপান্তর করা হয়েছে। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মুখস্থ করানোর পরিবর্তে কীভাবে ক্লাসরুমে আনন্দময় ও সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি করতে হয়, শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ অনুধাবন করে সহানুভূতিশীল পাঠদান করতে হয় এবং মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহার করতে হয়—সে বিষয়ে প্রতিটি শিক্ষককে নিবিড় বাস্তব প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। প্রকল্পটির আওতায় চালু করা হয়েছে মর্যাদাপূর্ণ 'জাতীয় পেডাগজি মাস্টার ফেলোশিপ'। প্রতি বছর দেশজুড়ে বাছাইকৃত সেরা এক হাজার শিক্ষককে ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং যুক্তরাজ্যের শীর্ষ টিচার ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলোতে তিন মাসের বিশেষায়িত উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভের জন্য সম্পূর্ণ সরকারি খরচে প্রেরণ করা হচ্ছে। বিদেশে অর্জিত সেই অভিজ্ঞতা তারা দেশে ফিরে এসে নিজ নিজ জেলার অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষকতার মানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। জাতীয় শিক্ষক ফোরামের নেতৃবৃন্দ এবং অভিভাবকরা এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্বাগত জানিয়েছেন। শিক্ষাবিদরা মন্তব্য করেছেন, শিক্ষকদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক উদ্বেগ থেকে মুক্ত করে যদি শ্রেণীকক্ষে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, তবেই জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বমানের হয়ে ওঠে। শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং মেধার সঠিক মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি আলোকিত, নৈতিক ও প্রগতিশীল সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তোলার শ্রেষ্ঠতম জাতীয় বিনিয়োগ।