পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর আধুনিকায়ন: জার্মান ডুয়েল ভোকেশনাল মডেলে কারিগরি শিক্ষায় বৈপ্লবিক রূপান্তর
শিল্পায়নের যুগে দক্ষ প্রকৌশলী ও আন্তর্জাতিক মানের টেকনিশিয়ান তৈরির লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে তুলতে মেগা আধুনিকায়ন প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত 'ডুয়েল ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং' (ডিভিইটি) মডেলের আলোকে পলিটেকনিকগুলোর কারিকুলাম সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানো হয়েছে। এর ফলে একজন পলিটেকনিক শিক্ষার্থী এখন কেবল ক্লাসরুমে বই পড়ে নয়; বরং তার শিক্ষাবর্ষের অর্ধেক সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় আধুনিক শিল্প কারখানায় বাস্তব ইন্টার্ন হিসেবে প্রশিক্ষণ লাভ করছে।
প্রকল্পটির আওতায় দেশের ৬৪টি জেলার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক সিএনসি মেশিন ল্যাব, রোবোটিকস ও অটোমেশন সেন্টার, অটোমোবাইল মেকাট্রনিক্স ওয়ার্কশপ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইওটি ল্যাবরেটরি। পুরোনো ও অপ্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক বিষয়গুলো বাদ দিয়ে আধুনিক শিল্প কারখানায় যেসব অত্যাধুনিক সফটওয়্যার ও যন্ত্র ব্যবহার করা হয়—যেমন পিএলসি প্রোগ্রামিং, সলিডওয়ার্কস থ্রি-ডি ক্যাড এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়্যারিং—সেগুলো শিক্ষাদানে শতভাগ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা চলাকালীনই আয়ের চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। শিল্প কারখানায় ইন্টার্নশিপ চলাকালীন প্রতিটি শিক্ষার্থীকে মাসিক সম্মানজনক স্টাইপেন্ড বা ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) এবং বাংলাদেশ মোটর পার্টস ও টেক্সটাইল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে নিশ্চিত করেছে যে, পলিটেকনিক থেকে সাফল্যের সাথে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা প্রতিটি দক্ষ শিক্ষার্থীকে সরাসরি স্থায়ী প্রকৌশলী ও সুপারভাইজার পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। ফলে পাস করার পর চাকরি খোঁজার কোনো অনিশ্চয়তা আর থাকছে না।
আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারেও বাংলাদেশি ডিপ্লোমাধারীদের বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সনদপত্রকে ইউরোপিয়ান কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (ইকিউএফ) এবং অস্ট্রেলিয়ান স্কিলস কোয়ালিটি অথরিটির সাথে সমমান ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে দক্ষ পলিটেকনিক গ্র্যাজুয়েটরা এখন জার্মানি, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যে উচ্চ বেতনের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান লাভ করছেন, যা দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক রেমিট্যান্স অর্জনে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের প্রকৃত টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মেরুদণ্ড হলো তার দক্ষ কারিগরি মানবসম্পদ। পলিটেকনিক শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদায় সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করা এবং মেধাবী তরুণদের এই প্রায়োগিক লাইনে আগ্রহী করে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ শিল্পায়িত ও উৎপাদনশীল রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
