বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ বিপ্লব: প্রতিটি ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক প্রফেশনাল কাউন্সেলিং ও ওয়েলনেস সেন্টার স্থাপন
শিক্ষার্থীদের ওপর পড়াশোনার অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, একাকীত্ব এবং পারিবারিক প্রত্যাশার বোঝাজনিত মানসিক সংকট কাটিয়ে সুস্থ ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে দেশের সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ 'ক্যাম্পাস মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টার' স্থাপন শতভাগ বাধ্যতামূলক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। অতীতে মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা ও সামাজিক ট্যাবু মনে করার যে ক্ষতিকর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা চিরতরে ভেঙে দিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেশাদার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও সাইকিয়াট্রিস্টদের বিশেষজ্ঞ সেবা প্রদানের সুব্যবস্থা করা হয়েছে।
নতুন এই আধুনিক ওয়েলনেস সেন্টারগুলোতে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ পরিচয় গোপন (কনফিডেন্সিয়াল) রেখে ওয়ান-অন-ওয়ান কাউন্সেলিং সেশনের সুযোগ রাখা হয়েছে। যে কোনো শিক্ষার্থী গভীর বিষণ্ণতা, পরীক্ষার উদ্বেগ, প্যানিক অ্যাটাক কিংবা পারিবারিক সংকটে পড়লে কোনো প্রকার সংকোচ ছাড়াই অনলাইনে বা সরাসরি এসে থেরাপিস্টের সাথে কথা বলতে পারছেন। সেন্টারগুলোতে নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্কশপ, মাইন্ডফুলনেস সেশন এবং মেডিটেশন ক্লাস, যা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্থিতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাসকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করছে।
ক্যাম্পাসে আত্মহত্যা ও মানসিক বিপর্যয় প্রতিরোধে সহপাঠীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে প্রতিটি আবাসিক হল ও বিভাগে একদল নির্বাচিত শিক্ষার্থীকে নিয়ে 'পিয়ার সাপোর্ট ভলান্টিয়ার্স' দল গঠন করা হয়েছে। এই তরুণ ভলান্টিয়ারদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রটোকল অনুযায়ী সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইডের নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সহপাঠীদের কারো মধ্যে অস্বাভাবিক নীরবতা, হতাশা বা কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলেই তারা তাৎক্ষণিকভাবে সহানুভূতিশীল বন্ধু হিসেবে এগিয়ে আসছেন এবং প্রয়োজনে প্রফেশনাল সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার আওতায় আনতে বিশেষ ওরিয়েন্টেশন কোর্স চালু করা হয়েছে। ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের সাথে অতিরিক্ত কঠোর বা অপমানজনক আচরণ পরিহার করে কীভাবে সহানুভূতিশীল ও অনুপ্রেরণাদায়ী মেন্টরিং প্রদান করতে হয়, সে বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পরীক্ষা ও গ্রেডিং পদ্ধতিতে অতিরিক্ত চাপ কমানোর জন্য সুনির্দিষ্ট একাডেমিক গাইডলাইন প্রদান করা হয়েছে।
মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা ইউজিসির এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে উচ্চশিক্ষা খাতের অন্যতম মানবিক অর্জন হিসেবে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা বলছেন, একজন শিক্ষার্থীর সিজিপিএ যতই ভালো হোক না কেন, যদি তার মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থ না থাকে, তবে সে সমাজ বা দেশকে কিছুই দিতে পারে না। ক্যাম্পাসগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা প্রদান করায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিণত হয়েছে আনন্দময় জ্ঞানার্জনের এক নিরাপদ ও প্রশান্তিময় আশ্রয়ে।
