জাতীয় শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন: মুখস্থবিদ্যার চিরতরে অবসান ঘটিয়ে প্র্যাকটিক্যাল বিজ্ঞান ও সৃজনশীল মেধা বিকাশ
দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মুখস্থবিদ্যার দাসত্ব ও পরীক্ষার ভয়াবহ মানসিক চাপ থেকে মুক্ত করে একটি আনন্দময়, প্রায়োগিক ও একুশ শতকের আন্তর্জাতিক উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর করতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী শিক্ষাক্রম সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে। শিক্ষাবিদ, শিশু মনোবিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞান গবেষকদের দীর্ঘদিনের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণীত এই নতুন পাঠ্যক্রমে মুখস্থ করে খাতায় লেখার সনাতন পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে প্রজেক্টভিত্তিক শিখন, দলগত সমস্যা সমাধান (প্রবলেম সলভিং) এবং অনুসন্ধিৎসু বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিকাশকে মূল ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন শিক্ষাক্রমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক সূত্রগুলোকে মুখস্থ করার পরিবর্তে হাতে-কলমে পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝার সুযোগ সৃষ্টি। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি করে 'বেসিক সায়েন্স অ্যান্ড ক্রিয়েটিভিটি ল্যাব' স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে সৌরশক্তি, উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং রোবোটিক্সের প্রাথমিক নীতিগুলো সরাসরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শিখছে। এতে শিশুদের মনে বিজ্ঞানের প্রতি অসীম কৌতূহল ও উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটছে, যা বিজ্ঞান ভীতির স্থায়ী অবসান ঘটাচ্ছে।
গণিত ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় আনা হয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। শুকনো সংখ্যা ও সূত্রের পরিবর্তে কম্পিউটার কোডিংয়ের লজিক, অ্যালগরিদমিক চিন্তা এবং দৈনন্দিন জীবনে গণিতের বাস্তব প্রয়োগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য মৌলিক কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, ডেটা হ্যান্ডলিং এবং ইন্টারনেটে সাইবার নিরাপত্তার প্রাথমিক পাঠ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার সাধারণ ভোক্তা না হয়ে প্রযুক্তির নির্মাতা হওয়ার মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে।
মূল্যায়ন পদ্ধতিতে আনা হয়েছে আমূল সংস্কার। বছরের শেষে কেবল একটি লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর ভবিষ্যৎ ভাগ্য নির্ধারণের বদলে সারাবছরের ক্লাসের সক্রিয় অংশগ্রহণ, দলগত প্রজেক্টের মান, মানবিক আচরণ ও সৃজনশীল কাজকে ভিত্তি করে 'ধারাবাহিক মূল্যায়ন' (কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্ট) চালু করা হয়েছে। এর ফলে প্রাইভেট টিউশন ও নোটবই বা গাইডবইয়ের ওপর কোচিং সেন্টারের নির্ভরতা প্রায় শতভাগ হ্রাস পেয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও খেলার সময় সুরক্ষিত হয়েছে।
শিক্ষা উপদেষ্টা এক জাতীয় সেমিনারে বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য কেবল সনদধারী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা নয়; আমাদের লক্ষ্য হলো একজন সৎ, মানবিক, যুক্তিবাদী ও বিশ্বমানের দক্ষ নাগরিক গড়ে তোলা। এই নতুন শিক্ষাক্রম বাংলাদেশকে একটি মেধাভিত্তিক আধুনিক জ্ঞান অর্থনীতিতে রূপান্তর করার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।' শিক্ষক ও অভিভাবকদের ইতিবাচক সাড়া প্রমাণ করছে যে, এই শিক্ষাক্রম দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক সোনালী রূপান্তরের পথে নিয়ে চলেছে।
