মুক্ত জ্ঞানের মহাজাগরণ: 'জাতীয় উন্মুক্ত ডিজিটাল লাইব্রেরি' চালু—সকলের জন্য বিনামূল্যে লাখ লাখ বই ও ভিডিও লেকচার উন্মুক্ত
শিক্ষায় বৈষম্য দূর করতে এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তে জ্ঞানের আলো সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে চালু হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ উন্মুক্ত ডিজিটাল শিক্ষার ভাণ্ডার 'ন্যাশনাল ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্সেস (ওইআর) ও ই-লাইব্রেরি পোর্টাল'। এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সকল পাঠ্যবই, আন্তর্জাতিক রেফারেন্স বুক, দেশীয় সাহিত্যের অমূল্য ক্লাসিক এবং শীর্ষ অধ্যাপকদের হাজার হাজার ইন্টারেক্টিভ ভিডিও লেকচার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে যে কোনো নাগরিকের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত করা হয়েছে।
নতুন এই ডিজিটাল পোর্টালে যুক্ত করা হয়েছে উচ্চগতির সার্চ ইঞ্জিন এবং আধুনিক এআই বুক রিকমেন্ডেশন সিস্টেম। একজন শিক্ষার্থী তার স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারের সাহায্যে মাত্র এক ক্লিকে যেকোনো বিষয়ের ওপর প্রয়োজনীয় বই, গবেষণাপত্র কিংবা লেকচার নোট ডাউনলোড করে অফলাইনে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ইন্টারনেটের ডেটা খরচ সাশ্রয়ে দেশের সকল মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক থেকে এই সরকারি শিক্ষামূলক পোর্টালে ব্রাউজিং সম্পূর্ণ 'জিরো-রেটেড' বা ডেটা চার্জমুক্ত রাখা হয়েছে, যা প্রত্যন্ত চরাঞ্চল ও পাহাড়ের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য এক পরম আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি বইকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেইল ডিসপ্লে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জীবন্ত বাংলা ভয়েস অডিও বুকে রূপান্তর করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিক জার্নাল প্রকাশক—যেমন স্প্রিঙ্গার, সায়েন্সডিরেক্ট এবং জেস্টোর—এর সাথে রাষ্ট্রীয় সাবস্ক্রিপশন চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় দেশের যেকোনো শিক্ষার্থী ও গবেষক বিনামূল্যে বিশ্বের সবচেয়ে দামি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পেপারগুলো পড়তে ও গবেষণা কাজে ব্যবহার করতে পারছেন।
স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা এই প্ল্যাটফর্মটিকে নিজেদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির প্রধান মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। পোর্টালে রয়েছে শিক্ষকদের জন্য আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি, লেসন প্ল্যান এবং মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন তৈরির প্রস্তুতকৃত উপকরণ। ফলে গ্রামের একটি প্রত্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকও রাজধানীর শীর্ষ ক্যাডেট কলেজের সমমানের আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে সক্ষম হচ্ছেন, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে শহর-গ্রামের বৈষম্য চিরতরে দূর করছে।
শিক্ষা গবেষকরা বলছেন, জ্ঞানকে যখন পণ্যের কারাগার থেকে মুক্ত করে একটি সর্বজনীন মৌলিক অধিকারে রূপান্তর করা হয়, তখনই কেবল একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি ঘটে। ন্যাশনাল ওইআর পোর্টাল কেবল একটি ওয়েবসাইট নয়; এটি বাংলাদেশের কোটি শিক্ষার্থীর স্বপ্নপূরণের এক অফুরন্ত জ্ঞানের আলোকবর্তিকা, যা একটি স্বাবলম্বী, বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রগতিশীল সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণে আজীবন নেতৃত্ব দিয়ে যাবে।
