বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নারী শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব বিপ্লব: স্টেম শিক্ষায় রেকর্ড সংখ্যক তরুণীর অংশগ্রহণ ও স্কলারশিপ
প্রযুক্তির চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে দেশের নারীদের নেতৃত্ব ও মেধার অসামান্য মেলবন্ধন ঘটিয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) শিক্ষায় এক বৈপ্লবিক অগ্রযাত্রা সূচিত হয়েছে। অতীতে যেখানে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি বিভাগগুলোতে ছাত্রীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত নগণ্য, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ সরকারি প্রণোদনা, মেয়েদের জন্য সম্পূর্ণ অবৈতনিক কোডিং বুটক্যাম্প এবং মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের ফলে ছাত্রীদের ভর্তির হার প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে শতকরা ৪৫ ভাগে পৌঁছেছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং শীর্ষস্থানীয় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে 'উইমেন ইন টেক' ফ্ল্যাগশিপ ফেলোশিপ প্রোগ্রাম। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রতিটি জেলা শহর থেকে মেধাবী নারী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে ক্লাউড কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি এবং মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের ওপর আন্তর্জাতিক সার্টিফাইড প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করা হাজার হাজার তরুণী এখন দেশি-বিদেশি শীর্ষ সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোতে রিমোট সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও এআই ডেভলপার হিসেবে কাজ করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন।
বুয়েট, রুয়েট, কুয়েট ও চুয়েটসহ দেশের প্রধান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধার ভিত্তিতে প্রথম সারির স্থানগুলো দখল করছেন নারী শিক্ষার্থীরা। বৈশ্বিক আইইইই রোবোটিক্স কম্পিটিশন, নাসার স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের নারী প্রকৌশলীদের দল বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তিগুলোকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য গৌরব অর্জন করেছে। তাদের উদ্ভাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত স্তন ক্যানসার শনাক্তকরণ অ্যালগরিদম এবং অগ্নিনির্বাপক রোবট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর প্রশংসা কুড়িয়েছে।
নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে একটি বিশেষায়িত 'জাতীয় নারী স্টেম ট্রাস্ট ফান্ড' গঠন করা হয়েছে। এই তহবিলের আওতায় যেসব ছাত্রী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন, তাদের টিউশন ফি মওকুফের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গবেষণা সম্মেলনে অংশগ্রহণের পূর্ণাঙ্গ বিমান ভাড়া ও আবাসন খরচ প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া ক্যাম্পাসগুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বিশেষায়িত স্মার্ট আবাসিক হোস্টেল নির্মাণ করা হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বাইরে রেখে কোনো দেশ স্মার্ট ও উন্নত হতে পারে না। প্রযুক্তি শিক্ষায় মেয়েদের এই ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ কেবল তাদের ব্যক্তিগত স্বাবলম্বিতা ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই বৃদ্ধি করছে না; বরং এটি দেশের সামগ্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রগতিশীল করে তুলছে। বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনে আত্মবিশ্বাসী এই নারীরাই আগামী দিনের সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন।
