শিক্ষকদের মর্যাদা ও পেশাগত প্রশিক্ষণে নবযুগ: প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল ও আন্তর্জাতিক পেডাগজি ফেলোশিপ
একটি জাতির শিক্ষার গুণগত মান তার শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত যোগ্যতার ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল—এই শাশ্বত সত্যকে অনুধাবন করে দেশের শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও প্রশিক্ষণে এক ঐতিহাসিক রূপান্তর এনেছে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে দেশের সাড়ে তিন লাখেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য 'জাতীয় শিক্ষক মর্যাদা ও পদোন্নতি নীতিমালা' বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর আওতায় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র উচ্চতর বেতন স্কেল এবং আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞানের ওপর বাধ্যতামূলক বিশ্বমানের পেশাগত ডিপ্লোমা চালু করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোর আওতায় প্রাথমিক শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করে তাদের বেতন গ্রেড সরাসরি দশম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে এবং প্রধান শিক্ষকদের জন্য দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী মেধাবী তরুণ-তরুণীরা এখন শিক্ষকতাকে কোনো খণ্ডকালীন চাকরি হিসেবে না দেখে এক অনন্য সম্মানজনক ও দীর্ঘমেয়াদী আজীবন পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের নতুন পরীক্ষায় লক্ষ লক্ষ উচ্চশিক্ষিত স্নাতক অংশ নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করছেন।
শিক্ষক প্রশিক্ষণে আনা হয়েছে আমূল ও বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন। দেশের সকল প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই) এবং টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিসি)-কে আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, সাইকোলজি রিসার্চ রুম এবং মাইক্রো-টিচিং স্টুডিওতে রূপান্তর করা হয়েছে। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মুখস্থ করানোর পরিবর্তে কীভাবে ক্লাসরুমে আনন্দময় ও সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি করতে হয়, শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ অনুধাবন করে সহানুভূতিশীল পাঠদান করতে হয় এবং মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহার করতে হয়—সে বিষয়ে প্রতিটি শিক্ষককে নিবিড় বাস্তব প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির আওতায় চালু করা হয়েছে মর্যাদাপূর্ণ 'জাতীয় পেডাগজি মাস্টার ফেলোশিপ'। প্রতি বছর দেশজুড়ে বাছাইকৃত সেরা এক হাজার শিক্ষককে ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং যুক্তরাজ্যের শীর্ষ টিচার ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলোতে তিন মাসের বিশেষায়িত উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভের জন্য সম্পূর্ণ সরকারি খরচে প্রেরণ করা হচ্ছে। বিদেশে অর্জিত সেই অভিজ্ঞতা তারা দেশে ফিরে এসে নিজ নিজ জেলার অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষকতার মানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
জাতীয় শিক্ষক ফোরামের নেতৃবৃন্দ এবং অভিভাবকরা এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্বাগত জানিয়েছেন। শিক্ষাবিদরা মন্তব্য করেছেন, শিক্ষকদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক উদ্বেগ থেকে মুক্ত করে যদি শ্রেণীকক্ষে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, তবেই জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বমানের হয়ে ওঠে। শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং মেধার সঠিক মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি আলোকিত, নৈতিক ও প্রগতিশীল সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তোলার শ্রেষ্ঠতম জাতীয় বিনিয়োগ।
