মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক ও ভাষা সংরক্ষণ প্রকল্প
ভাষার মর্যাদা রক্ষায় রক্ত দেওয়ার সুমহান ঐতিহ্যের অধিকারী বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি সুরক্ষায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতলে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল এবং সাদ্রি সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য তাদের নিজস্ব বর্ণমালা ও মাতৃভাষায় প্রণীত নতুন পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের পরিধি সফলভাবে সম্প্রসারণ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর ফলে শিশুরা এখন নিজের মাতৃভাষায় প্রথম পাঠ গ্রহণ করে আনন্দঘন পরিবেশে প্রাথমিক শিক্ষার শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলছে।
অতীতে নিজেদের মাতৃভাষায় বই না থাকায় এবং বাংলা ভাষায় পর্যাপ্ত দক্ষতা না থাকায় বিদ্যালয়ের প্রথম কয়েক বছর পাহাড়ি ও প্রান্তিক আদিবাসী শিশুদের জন্য এক ভয়াবহ মানসিক ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়াত। ভাষা না বোঝার কারণে ঝরে পড়ার (ড্রপআউট) হার ছিল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এবং নৃবিজ্ঞানীদের গভীর গবেষণার মাধ্যমে প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা পুনরুদ্ধার করে রঙিন ও আকর্ষণীয় পাঠ্যবই রচনা করা হয়েছে। এতে শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বেড়ে প্রায় শতভাগে পৌঁছেছে এবং ঝরে পড়ার হার শূন্যে নেমে এসেছে।
প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কয়েক হাজার শিক্ষিত তরুণ-তরুণীকে বিশেষায়িত মাতৃভাষা শিক্ষক হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সরাসরি নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। তারা শিশুদের নিজেদের ভাষায় ছড়া, লোকগাথা এবং ঐতিহ্যের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করছেন। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এখন শিশুরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে কোনো প্রকার সংকোচ ছাড়া স্বগৌরবে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে, যা তাদের মধ্যে গভীর আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করেছে।
শুধু পাঠ্যবই মুদ্রণই নয়; এই বিপন্ন ভাষাগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ডিজিটাল আর্কাইভে অমর করে রাখতে চালু করা হয়েছে 'ন্যাশনাল ইন্ডিজেনাস ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাউড রিপোজিটরি'। সেখানে প্রতিটি ভাষার প্রাচীন গান, লোককাহিনি, প্রবাদ-প্রবচন এবং ব্যাকরণ ডিজিটাল অডিও ও টেক্সট আকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভাষাভাষী কম এমন চরম বিপন্ন ভাষাগুলোর (যেমন রেংমিটচা, খিয়াং ও লুসাই) জন্য এআই-চালিত ডিজিটাল অনুবাদক টুল তৈরি করা হচ্ছে, যা ভাষাগুলোকে চিরতরে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করবে।
ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক ভাষাবিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের এই উদ্যোগকে বিশ্বের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণে এক অনুকরণীয় মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইউনেস্কোর প্রতিনিধিরা মন্তব্য করেছেন যে, ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য আত্মদানকারী জাতি হিসেবে বাংলাদেশ যেভাবে নিজের দেশের সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার অধিকার নিশ্চিত করেছে, তা সমগ্র বিশ্বের সামনে এক অনুপম আদর্শ। প্রতিটি শিশুর মাতৃভাষায় কথা বলা ও পড়ার অধিকার সুরক্ষার মাধ্যমেই একটি প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।
