ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং: জামানত ছাড়াই সহজ শর্তে ঋণ পাচ্ছেন প্রান্তিক উদ্যোক্তারা
দেশের তৃণমূল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের মূলধনের দীর্ঘদিনের হাহাকার দূর করতে বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং শীর্ষস্থানীয় ফিনটেক প্ল্যাটফর্মগুলোর যৌথ উদ্যোগে সফলভাবে চালু হয়েছে 'ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং'। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার কঠোর স্থাবর জামানতের শর্ত, দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক যাচাই-বাছাই এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের হয়রানির অবসান ঘটিয়ে এখন কেবল ডিজিটাল ইনভয়েস এবং লেনদেনের ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যবসায়িক চলতি মূলধন সরাসরি উদ্যোক্তাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাচ্ছে।
প্রকল্পটির মূল কারিগরি ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে অত্যাধুনিক এআই-ভিত্তিক অল্টারনেটিভ ক্রেডিট স্কোরিং (এসিএস) সিস্টেম। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষুদ্র মুদি দোকানদার, তাঁতশিল্পী, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকারী এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল লেনদেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধের নিয়মিততা এবং ইনভেন্টরি টার্নওভার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণযোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। কোনো প্রকার জমি বা ফ্ল্যাটের দলিল বন্ধক না রেখেই সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন স্বল্প সুদের ঋণ সরাসরি মোবাইল ওয়ালেটে বিতরণ করা হচ্ছে।
এসএমই ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই স্কিমে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নারী পরিচালিত ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলোতে মাত্র ৪ শতাংশ নামমাত্র সুদে এই তহবিল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে রাজধানী থেকে শুরু করে রংপুর, যশোর, সিলেট এবং বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তা তাদের বুটিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হস্তশিল্পের পরিধি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হচ্ছেন।
দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট ম্যানুফ্যাকচারিং জায়ান্টগুলো—যেমন প্রাণ, স্কয়ার, এসিআই ও আকিজ গ্রুপ—এই ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে। ফলে তাদের সরবরাহকারী ক্ষুদ্র কৃষক ও পরিবেশকদের বকেয়া বিলের বিপরীতে ব্যাংকগুলো তাৎক্ষণিক ক্যাশ ডিসকাউন্টিং সুবিধা প্রদান করছে। এতে সরবরাহ চেইনে তারল্যের কোনো ঘাটতি তৈরি হচ্ছে না এবং বড় কারখানাগুলোর কাঁচামাল প্রবাহ শতভাগ নিরবচ্ছিন্ন থাকছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশের উৎস হলো এই এসএমই খাত। ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে এই বিশাল উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা জাতীয় প্রবৃদ্ধির জন্য এক ঐতিহাসিক আশীর্বাদ। এর মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায়ে অর্থের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হচ্ছে এবং শহরের ওপর মানুষের অভিবাসনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যা দেশকে একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
