তৈরি পোশাক খাতে সার্কুলার ফ্যাশন ও গ্রিন ফ্যাক্টরি রূপান্তর: ইউরোপের বাজারে রেকর্ড রপ্তানি প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশের শীর্ষ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প পরিবেশবান্ধব সার্কুলার ফ্যাশন ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈশ্বিক নেতৃত্বে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। মার্কিন গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) কর্তৃক বিশ্বমানের লিড (এলইইডি) প্লাটিনাম ও গোল্ড সনদপ্রাপ্ত কারখানা স্থাপনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট দীর্ঘদিন ধরে ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এবার শতভাগ টেক্সটাইল বর্জ্য (ঝুট) পুনর্ব্যবহার করে উচ্চমূল্যের সুতা ও কাপড় উৎপাদনে অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত রূপান্তর সাধন করেছে দেশের শীর্ষ পোশাক কারখানাগুলো।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপের বাজারে চলতি প্রান্তিকে পোশাক রপ্তানিতে প্রায় ১৪.৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর পরিবেশ ও টেকসই সাপ্লাই চেইন কমপ্লায়েন্স নীতিমালার সাথে সংগতি রেখে দেশের প্রায় অর্ধশতাধিক কারখানা অত্যাধুনিক রোবোটিক মেকানিক্যাল রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। এর ফলে কোনো প্রকার নতুন তুলা বা রাসায়নিক ব্যবহার না করেই বর্জ্য কাপড় থেকে বিশ্বমানের টেক্সটাইল ফাইবার উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো—যেমন এইচঅ্যান্ডএম, জারা, সিঅ্যান্ডএ এবং ইন্ডিটেক্স—সার্কুলার ফ্যাশনে বাংলাদেশের এই নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সরাসরি ক্রয়াদেশের পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে। রিসাইকেলড কাপড়ে তৈরি পোশাকের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে সাধারণ কাপড়ের চেয়ে গড়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি দাম পাচ্ছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। এতে সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের মার্জিন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কারখানার শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষায় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পরিবেশবান্ধব সার্কুলার টেক্সটাইল প্ল্যান্টের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক রিসাইক্লিং যন্ত্রপাতি আমদানিতে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং বিশেষায়িত গ্রিন ফাইন্যান্সিং স্কিম প্রদান করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফর্মেশন ফান্ডের (জিটিএফ) আওতায় নামমাত্র সুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ পাওয়ায় মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোও দ্রুত টেকসই প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প গবেষকরা মন্তব্য করেছেন, বিশ্বের অনেক প্রতিযোগী দেশ যখন পরিবেশ বিধিমালার চাপে রপ্তানি কমাতে বাধ্য হচ্ছে, বাংলাদেশ তখন গ্রিন ফ্যাক্টরি ও সার্কুলার ইকোনমির হাত ধরে এক অপ্রতিরোধ্য ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের পোশাক রপ্তানি ৮০ বিলিয়ন ডলারের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে এক নম্বর টেকসই পোশাক প্রস্তুতকারক হিসেবে চিরতরে প্রতিষ্ঠিত করবে।
