চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পরিবেশবান্ধব গ্রিন শিপব্রেকিং বিপ্লব: হংকং কনভেনশন সনদে বিশ্ববাজারে সুনাম পুনরুদ্ধার
একসময় তীব্র পরিবেশগত বিতর্ক ও কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্প এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব পরিবেশবান্ধব রূপান্তর সাধন করেছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) কঠোর 'হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অব শিপস' এর সকল শর্ত শতভাগ পূরণ করে সীতাকুণ্ডের অর্ধশতাধিক আধুনিক ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি কর্তৃক 'গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ড' হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
নতুন মানদণ্ড বাস্তবায়নের ফলে জাহাজ ভাঙার প্রাচীন ও বিপজ্জনক পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রিন ইয়ার্ডে এখন স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক কংক্রিট ইন্টারলকড ফ্লোরিং, ক্রেন পরিচালিত সেফ ট্রলি সিস্টেম, অয়েল স্পিল ইন্টারসেপ্টর এবং ভারী শিল্প বর্জ্য শোধনাগার। সাগরে কোনোপ্রকার বিষাক্ত তেল, অ্যাসবেস্টস বা সীসা মিশ্রিত বর্জ্য যাতে না মেশে, সে জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে ডিকনটামিনেশন চেম্বারে বিপজ্জনক পদার্থগুলো সম্পূর্ণ নিরাপদে অপসারণ করে বিশেষায়িত সেন্ট্রাল ট্রিটমেন্ট ফ্যাসিলিটিতে ধ্বংস করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) জানিয়েছে, গ্রিন ইয়ার্ডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের ফলে নরওয়ে, জার্মানি, গ্রিস ও জাপানের শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানিগুলো এখন তাদের মেয়াদোত্তীর্ণ বিশাল বাণিজ্যিক জাহাজ ভাঙার জন্য সীতাকুণ্ডকে তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। পূর্বে যেসব ইউরোপীয় জাহাজ মালিক পরিবেশগত কারণে বাংলাদেশে জাহাজ পাঠাতেন না, তারা এখন সরাসরি চুক্তি সম্পাদন করছেন। এর ফলে উচ্চমানের স্ক্যাপ স্টিল আমদানির খরচ অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।
শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও অধিকার রক্ষায় ইয়ার্ডগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল, ফায়ার রেসকিউ স্টেশন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন্দ্র। শ্রমিকদের জন্য পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই), ফ্লেম-প্রুফ স্যুট, হাই-টেক হেলমেট এবং সেফটি বুট ব্যবহার শতভাগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার হার শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) সীতাকুণ্ডের এই নিরাপত্তা মানদণ্ডকে বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজভাঙা শিল্প কেবল একটি পুনর্ব্যবহার শিল্প নয়; এটি দেশের নির্মাণ খাতের লাইফলাইন। দেশের মোট রড ও ইস্পাত চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ হয় এই শিল্পের উচ্চমানের রিনিউয়েবল স্টিল থেকে। সাশ্রয়ী মূল্যে দেশীয় কাঁচামাল পাওয়ায় দেশের রড ও সিমেন্ট শিল্পের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকছে, যা মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ব্যয় সাশ্রয়ে সরাসরি অপরিহার্য ভূমিকা রাখছে।
