মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) পার্ক পূর্ণাঙ্গ চালু: ওষুধ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা
দেশের গর্বিত ওষুধ শিল্পকে শতভাগ কাঁচামাল নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী করতে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত সুবিশাল 'অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) শিল্পপার্ক' পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে প্রবেশ করেছে। প্রায় ২০০ একর জমির ওপর নির্মিত এই মেগা প্রকল্পে দেশের শীর্ষস্থানীয় ২০টিরও বেশি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি—যেমন বেক্সিমকো, স্কয়ার, ইনসেপ্টা, রেনেটা ও একমি—তাদের নিজস্ব আধুনিক মলিকুলার সিন্থেসিস প্ল্যান্ট স্থাপন সম্পন্ন করেছে। এর ফলে প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিক, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের জটিল ওষুধের মূল উপাদান এখন দেশেই শতভাগ বিশুদ্ধতার সাথে সংশ্লেষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বিএপিআই) জানিয়েছে, পূর্বে দেশের ওষুধ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের প্রায় ৯০ শতাংশ চীন ও ভারত থেকে চড়া মূল্যে আমদানি করতে হতো। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে বা সাপ্লাই চেইনে ব্যাঘাত ঘটলে দেশে জরুরি ওষুধের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হতো। গজারিয়া এপিআই পার্ক পুরোদমে চালু হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ ওষুধ শিল্পের বার্ষিক কাঁচামাল চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। এর ফলে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন নিশ্চিত করতে শিল্পপার্কটিতে স্থাপন করা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধুনিক সেন্ট্রাল কেমিক্যাল বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ডেডিকেটেড ইনসিনারেটর এবং রিয়েল-টাইম কোয়ালিটি কন্ট্রোল অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরি। মার্কিন এফডিএ (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন), ইউরোপিয়ান ইএমএ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) জিএমপি মানদণ্ড মেনে প্রতিটি উপাদান সংশ্লেষিত হচ্ছে, যা উৎপাদিত ওষুধের গুণগত মানকে বিশ্বমানের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশে সফলভাবে ওষুধ রপ্তানি করছে। নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত সাশ্রয়ী কাঁচামাল ব্যবহার করায় ওষুধের উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তুলনায় বাংলাদেশি জেনেরিক ওষুধ অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে আন্তর্জাতিক দরপত্রে জয়লাভ করতে সক্ষম হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাঁচামাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের ফলে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মূল্য সহনশীল রাখা সম্ভব হবে। এছাড়া এপিআই পার্ককে কেন্দ্র করে কেমিক্যাল সায়েন্স ও ফার্মাসিউটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কয়েক হাজার তরুণ গবেষকের উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা বাংলাদেশকে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ বায়ো-ফার্মা গবেষণা ও উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বদরবারে অধিষ্ঠিত করল।
