চামড়া ও পাদুকা শিল্পে রপ্তানি বিপ্লব: সাভারের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে ইউরোপের বাজারে ১ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার
তৈরি পোশাকের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পে এক ঐতিহাসিক ও পরিবেশবান্ধব নবজাগরণের সূচনা হয়েছে। সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের ফলে দেশের শীর্ষস্থানীয় ৪০টি ট্যানারি আন্তর্জাতিক 'লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ' (এলডব্লিউজি) স্বর্ণমান সনদ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই বৈপ্লবিক কমপ্লায়েন্স অর্জনের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের শীর্ষ বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো সরাসরি বাংলাদেশ থেকে চামড়াজাত জুতো, ব্যাগ ও জ্যাকেট ক্রয়ের জন্য ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি নতুন ক্রয়াদেশ প্রদান করেছে।
বিগত কয়েক দশক ধরে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর প্রক্রিয়ার নানা কারিগরি ত্রুটি ও সিইটিপির অকার্যকারিতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি চামড়া নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হতো। অনেক পশ্চিমা ক্রেতা পরিবেশগত দূষণের কারণে এ দেশের চামড়া কেনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টাস্কফোর্সের সার্বক্ষণিক তদারকিতে নেদারল্যান্ডসের অত্যাধুনিক ক্রোম রিকভারি প্রযুক্তি এবং জৈব বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন করায় ধলেশ্বরী নদীর পানি এখন সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত হয়েছে এবং ট্যানারি পল্লী একটি পরিবেশবান্ধব গ্রিন পার্কে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্তির পর সাভার ও গাজীপুরের পাদুকা কারখানাগুলোতে উৎপাদনের নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত ফ্যাশন জায়ান্ট যেমন জারা, এইচঅ্যান্ডএম, ক্লার্কস এবং নাইকি বাংলাদেশি প্রস্তুতকারকদের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সরাসরি সরবরাহ চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এর ফলে পূর্বে যেখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অত্যন্ত কম দামে ফিনিশড চামড়া রপ্তানি করতে হতো, এখন দেশেই উচ্চমানের ব্র্যান্ডেড জুতো ও ফ্যাশন এক্সেসরিজ তৈরি করে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি মূল্যে সরাসরি পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে।
শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) যৌথভাবে সাভারে একটি আধুনিক 'ফুটওয়্যার ডিজাইন অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট' স্থাপন করেছে। সেখানে ইতালির শীর্ষ ডিজাইনারদের তত্ত্বাবধানে দেশীয় তরুণ ডিজাইনারদের আধুনিক ফুটওয়্যার আর্কিটেকচার, অর্থোপেডিক সোলের বিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক কালার ট্রেন্ডের ওপর নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের সাথে তাল মিলিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব ডিজাইনে প্রিমিয়াম জুতো তৈরি করে বিশ্ববাজারে নিজস্ব ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠিত করার পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কাটিয়ে জাতীয় রপ্তানি বহুমুখীকরণে চামড়া খাতই হলো সবচেয়ে প্রস্তুত ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। দেশের শতভাগ দেশীয় কাঁচামাল নির্ভর এই শিল্পের মূল্য সংযোজন (ভ্যালু এডিশন) হার প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি। সাভারের এই সফল সবুজ রূপান্তর আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চামড়া খাত থেকে বার্ষিক ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের জাতীয় স্বপ্ন পূরণে এক শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করল।
