ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ টাস্কফোর্সের অভিযান: অনাদায়ী ঋণের সফল আদায় শুরু
দেশের আর্থিক খাতের মূল চালিকাশক্তি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, অনৈতিক ঋণ বিতরণ এবং খেলাপি ঋণের (এনপিএল) পাহাড় ধসিয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একযোগে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স। করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বিতর্কিত ঋণখেলাপিদের অপসারণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দেশি-বিদেশি সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার লক্ষ্যে কঠোর আইন প্রয়োগ শুরু হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আদায়ে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো সাফল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সাথে আয়োজিত বিশেষ বৈঠকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক সুপারিশ বা আত্মীয়তার সূত্রে ঋণ নবায়ন ও অবলোপন করার দিন চিরতরে শেষ হয়েছে। প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে স্বাধীন সম্পদ পুনরুদ্ধার ও স্পেশাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট (এসএএমইউ) গঠন করা হয়েছে, যা প্রতিদিন সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ডে আদায়কৃত অর্থের বিবরণ রিপোর্ট করছে। শীর্ষ ৫০ জন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালত এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে।
ব্যাংক রেজোলিউশন অ্যাক্ট এবং সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর একীভূতকরণ (মার্জার) এবং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের কাজ সফলভাবে এগিয়ে চলেছে। কোনো আমানতকারী যাতে তাদের কষ্টার্জিত জমানো টাকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় না পড়েন, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স স্কিমের আওতায় বিমার পরিমাণ দ্বিগুণ করে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত শতভাগ নিশ্চিত গ্যারান্টি প্রদান করা হয়েছে।
সুশাসনের এই দৃশ্যমান পদক্ষেপের ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের আস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়েছে। গত এক প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবাহের হার প্রায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। খেলাপি ঋণ কমে আসার কারণে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিএআর) ব্যাসেল-৩ মানদণ্ডের সাথে সংগতিপূর্ণ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আউটলুক নেতিবাচক থেকে উন্নীত করে স্থিতিশীল (স্টেবল) ঘোষণা করেছে।
আর্থিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শক্তিশালী ব্যাংকিং খাতই যেকোনো অর্থনীতির সমৃদ্ধির মেরুদণ্ড। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে এই আপসহীন আইনানুগ অবস্থান দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। ব্যাংকগুলোতে অলস তারল্য কমে উৎপাদনশীল শিল্প ও কৃষি খাতে সুলভ সুদে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় জাতীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
