বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন রেকর্ড: প্রণোদনা ও ডিজিটাল ফিনটেক সেবায় প্রবাসীদের আস্থা বৃদ্ধি
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মূল ভিত্তি প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) ঐতিহাসিক উল্লম্ফন ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে আড়াই বিলিয়ন ডলারের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ায় কর্মরত কোটি বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী অবৈধ হুন্ডির পথ পরিহার করে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ পাঠানোয় এই চমকপ্রদ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির পেছনে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কিছু সময়োপযোগী পদক্ষেপ মূল ভূমিকা পালন করেছে। সরকার ঘোষিত আড়াই শতাংশ নগদ আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিজেদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত প্রণোদনা যুক্ত করায় প্রবাসীরা প্রতি ডলারে আকর্ষণীয় ও বাজারভিত্তিক বিনিময় মূল্য পাচ্ছেন। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে ক্রলিং পেগ ব্যবস্থার কারণে খোলা বাজারের সাথে ব্যাংকিং দরের ব্যবধান পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে, যার ফলে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের অনৈতিক প্রলোভন পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
প্রবাসীদের সুবিধার্থে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং শীর্ষস্থানীয় ফিনটেক অ্যাপগুলোর সাথে আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর সরাসরি ডিজিটাল এপিআই সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে একজন প্রবাসী দুবাই, রিয়াদ বা লন্ডনে বসে তার স্মার্টফোনের মাধ্যমেই দেশে থাকা পরিবারের বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সম্পূর্ণ বিনা খরচে টাকা পাঠিয়ে দিতে পারছেন। তাত্ক্ষণিক কনফার্মেশন এসএমএস ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে প্রবাসীরা এখন শতভাগ নির্ভরযোগ্যতার সাথে অর্থ পাঠাতে পারছেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় রেমিট্যান্স প্রেরণকারী শীর্ষ প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে 'সিআইপি' (বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) মর্যাদা প্রদান এবং তাদের জন্য বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ সুবিধা, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিত করেছে। এছাড়া তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় বিনিয়োগের জন্য বিশেষায়িত 'প্রবাসী সঞ্চয়পত্র' এবং আকর্ষণীয় সুদে বৈদেশিক মুদ্রা বন্ডের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মন্তব্য করেছেন, আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী জোয়ার দেশের সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে অভাবনীয় স্বস্তি এনে দিয়েছে। আমদানির দায় মেটানো, বৈদেশিক দেনা পরিশোধ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্রস রিজার্ভ পুনর্গঠনে এই প্রবাসী আয় এক শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহকে ধরে রাখতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য দেশে আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
