চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলে শতভাগ ডিজিটাল ইলেকট্রনিক চা নিলাম চালু: আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার পথে বাংলাদেশ
শতবর্ষের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী হাতুড়ি পেটানো উন্মুক্ত নিলাম ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশের চা শিল্পে এক যুগান্তকারী আধুনিকায়নের সূচনা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলের দুটি প্রধান চা নিলাম কেন্দ্রকে শতভাগ ডিজিটাল ও ইন্টারনেটভিত্তিক 'ইলেকট্রনিক টি অকশন' (ই-অকশন) প্ল্যাটফর্মে সফলভাবে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ চা বোর্ডের সমন্বিত উদ্যোগে উদ্ভাবিত এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি নিবন্ধিত ক্রেতারা এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে নিজেদের ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনের মাধ্যমে সরাসরি লাইভ নিলামে অংশগ্রহণ করে চা পাতা ক্রয় করতে পারছেন।
ই-অকশন ব্যবস্থার ফলে চা বাণিজ্যে দীর্ঘদিনের কারসাজি, সিন্ডিকেট এবং অনৈতিক দরপতনের অপসংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ হয়েছে। পূর্বে যেখানে নির্দিষ্ট কিছু মধ্যস্বত্বভোগী একত্রিত হয়ে যোগসাজশের মাধ্যমে দাম কমিয়ে রাখত, এখন সম্পূর্ণ গোপন ও নিরাপদ বিডিংয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চা পাতার লট বরাদ্দ পাচ্ছেন। ফলে বাগান মালিকরা তাদের উৎপাদিত অর্থোডক্স ও সিটিসি চায়ের প্রতিটি লটের জন্য প্রকৃত বাজারমূল্য পাচ্ছেন, যা চা শিল্পের লাভজনকতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে।
প্ল্যাটফর্মটির সাথে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক ল্যাবরেটরি টেস্ট কোয়ালিটি স্কোরিং এবং কিউআর কোড ট্র্যাকিং ব্যবস্থা। প্রতিটি নিলাম লটের বিপরীতে চা পাতার রাসায়নিক বিশুদ্ধতা, আর্দ্রতা, লিকারের ঘনত্ব এবং ফ্লেভার প্রোফাইলের আন্তর্জাতিক সার্টিফাইড রিপোর্ট ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত থাকে। এর ফলে যুক্তরাজ্যের লন্ডন, জার্মানির হামবুর্গ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের প্রিমিয়াম চা আমদানিকারকরা শতভাগ নিশ্চিত হয়ে উচ্চমূল্যে বাংলাদেশি চা কেনার অর্ডার দিচ্ছেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সফল ই-অকশন সিস্টেমের ওপর ভিত্তি করে চট্টগ্রামে দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ 'জাতীয় পণ্য বিনিময় কেন্দ্র' বা কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খুব শীঘ্রই চায়ের পাশাপাশি পাট, চাল, গম, তুলা এবং ভোজ্য তেলের মতো প্রধান প্রধান নিত্যপণ্যও এই ডিজিটাল কমোডিটি এক্সচেঞ্জের আওতায় লেনদেন করা হবে। এতে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লোটার সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হবে এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য স্থিতিশীল থাকবে।
অর্থনীতিবিদরা এই উদ্যোগকে দেশের বাণিজ্যিক আধুনিকায়নের এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন। ডিজিটাল কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর ফলে পণ্যের ভবিষ্যতের মূল্য নির্ধারণে কৃষকরা আগাম পূর্বাভাস পাবেন এবং সেই অনুযায়ী ফসল উৎপাদনে পরিকল্পনা করতে পারবেন। এটি কৃষিবাজারের অপচয় কমিয়ে দেশের খাদ্য ও অর্থকরী ফসলের বাণিজ্যকে বিশ্বমানের আধুনিক পর্যায়ে পৌঁছে দেবে।
