দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক সহায়তা: বিদেশে পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন
রাষ্ট্রের সকল স্তর থেকে দুর্নীতি ও অনিয়ম সমূলে উৎপাটন এবং বিগত বছরগুলোতে দেশ থেকে বিদেশে অবৈধভাবে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানো হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশের আওতায় দুদককে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও বিচারিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কোনো হস্তক্ষেপর সুযোগ থাকবে না। কমিশনের চেয়ারম্যান এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে ঘোষণা করেছেন যে, শীর্ষ দুর্নীতিবাজ এবং অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে।
বিদেশে পাচারকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা (বিএফআইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সিআইডির দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি 'বিশেষায়িত সম্পদ পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্স' গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে ইন্টারপোল, বিশ্বব্যাংকের স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিশিয়েটিভ (স্টার) এবং মার্কিন বিচার বিভাগের ফিনান্সিয়াল ক্রাইমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্কের (ফিনসেন) সাথে সরাসরি যৌথ তদন্ত চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এর মাধ্যমে সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও দুবাইয়ে পাচার হওয়া গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও রিয়েল এস্টেট সম্পদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
কমিশন জানিয়েছে, দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ মিললেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, দেশি-বিদেশি সকল ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং অপরাধলব্ধ স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শীর্ষ অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লিগ্যাল ও ফরেনসিক অডিট ফার্ম নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থের প্রতিটি ডলার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনার প্রক্রিয়াকে অপ্রতিরোধ্য করা হবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি সেবা প্রদান ব্যবস্থাকে শতভাগ ক্যাশলেস ও ডিজিটাল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভূমি নিবন্ধন, পাসপোর্ট প্রদান, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং কাস্টমস শুল্কায়নের মতো নাগরিক সেবায় কোনো প্রকার কায়িক নগদ লেনদেন থাকবে না। আধুনিক ব্লকচেইন প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিটি ফাইলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে কোনো কর্মকর্তা ফাইল আটকে ঘুষ দাবি করতে না পারেন। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি অত্যাধুনিক মোবাইল অ্যাপ ও টোল-ফ্রি ২৪/৭ হটলাইন সক্রিয় করা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দুদকের এই নবরূপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, আইনের চোখে সবাই সমান—এই মূলনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল জনগণের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বিপুল শক্তি জোগাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে বৈদেশিক ঋণের হাত থেকে স্বস্তি এনে দেবে।
সম্পর্কিত সংবাদ

