স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় পূর্ণ বিকেন্দ্রীকরণ: ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলায় সরাসরি বরাদ্দ এবং প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান
তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করা এবং কেন্দ্রমুখী আমলাতান্ত্রিক জটিলতা চিরতরে নিরসনের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় একটি ব্যাপক প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালার খসড়া অনুমোদন করেছে। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের ৪ হাজার ৫০০টিরও বেশি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদকে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের (এডিপি) একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি ব্লক গ্রান্ট হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হবে। পূর্বে যেখানে স্থানীয় উন্নয়নের জন্য রাজধানীর সচিবালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় মাসের পর মাস ফাইল আটকে থাকত, এখন স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরাসরি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারবেন।
নতুন নীতিমালায় ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক স্বচ্ছতা ও নাগরিক নজরদারি নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য 'সোশ্যাল অডিট' বা গণশুনানি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, সুপেয় পানির নলকূপ স্থাপন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় সংস্কারের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে উন্মুক্ত ওয়ার্ড কমিটি গঠিত হবে। ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি আয়ের উৎস ও ব্যয়ের বিবরণী ডিজিটাল বোর্ডে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে, যা দুর্নীতির সুযোগ বহুলাংশে বন্ধ করবে।
উপজেলা পরিষদগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানের কার্যপরিধিতে সুস্পষ্ট ভারসাম্য আনা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কৃষি সেবা এবং প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসনিক তদারকির মূল দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ের জনসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে এবং গ্রামীণ নাগরিকরা দ্রুত সেবা লাভ করতে সক্ষম হবেন।
স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে গ্রামীণ রূপান্তরের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের গবেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকারকে আর্থিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা না দিয়ে টেকসই জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্থানীয় পর্যায়ে সম্পদ সংগ্রহ এবং কর আদায়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি করায় পরিষদগুলোর স্বনির্ভরতা বাড়বে এবং কেন্দ্রমুখী আর্থিক নির্ভরতা হ্রাস পাবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রথম পর্যায়ে দেশের নির্বাচিত ১০০টি উপজেলা ও ১ হাজার ইউনিয়ন পরিষদে এই মডেলের পাইলট কার্যক্রম শুরু হবে। পাইলট প্রকল্পের সফলতার ভিত্তিতে আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই সারাদেশে একযোগে এই পূর্ণাঙ্গ বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালা বাস্তবায়িত হবে, যা বাংলাদেশের তৃণমূল গণতন্ত্র ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
সম্পর্কিত সংবাদ

