পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে 'পুলিশ সার্ভিস রিফর্ম অ্যাক্ট': মাঠপর্যায়ে শতভাগ বডি-ওর্ন ক্যামেরা বাধ্যতামূলক
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্ত করে একটি আধুনিক, জনবান্ধব, মানবিক ও পেশাদার পুলিশ বাহিনীতে রূপান্তর করতে জাতীয় আইনসভায় পাস হয়েছে যুগান্তকারী 'পুলিশ সার্ভিস রিফর্ম অ্যাক্ট'। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন কমিশনের যৌথ সুপারিশে প্রণীত এই আইনে পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব পালনকালে নাগরিকদের মানবাধিকার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, হেফাজতে নির্যাতন এবং হয়রানিমূলক আচরণ চিরতরে বন্ধে প্রতিটি থানায় সার্বক্ষণিক স্বাধীন নজরদারি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
আইনের অন্যতম প্রধান বিধান হিসেবে মাঠপর্যায়ে টহলরত প্রতিটি পুলিশ সদস্য এবং ট্রাফিক সার্জেন্টের পোশাকে হাই-রেজোলিউশন ও নাইট-ভিশন সক্ষমতার 'বডি-ওর্ন ক্যামেরা' পরিধান শতভাগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো নাগরিকের সাথে কথোপকথন, তল্লাশি কিংবা গ্রেপ্তারের সময় এই ক্যামেরা চালু রাখা বাধ্যতামূলক। ক্যামেরার রেকর্ড করা অডিও ও ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেন্ট্রাল ক্লাউড সার্ভারে সংরক্ষিত হবে, যা পরিবর্তন বা মুছে ফেলার কোনো সুযোগ থাকবে না। আদালতে কোনো ঘটনার প্রমাণ হিসেবে এই ফুটেজ সরাসরি ডিজিটাল সাক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হবে।
পুলিশের বিরুদ্ধে যেকোনো নাগরিকের অভিযোগ তদন্তের জন্য হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত 'পুলিশ কমপ্লেইন্টস কমিশন' (পিসিসি) গঠনের বিধান কার্যকর হয়েছে। এখন থেকে কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ তদন্তের পরিবর্তে সরাসরি এই স্বাধীন কমিশন তদন্ত করবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতি ও নিয়মিত আদালতে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, প্রতিটি থানায় সেবাপ্রত্যাশী নাগরিকদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ডেস্ক চালু করা হয়েছে এবং সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও এফআইআর দায়েরের পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা হয়েছে। কোনো নাগরিক চাইলে সরাসরি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেই জিডি করতে পারছেন, যার জন্য থানায় গিয়ে কোনো অর্থ খরচ বা পুলিশি ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষের সাথে পুলিশের সম্পর্কের দূরত্ব দূর হচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ এই আইনকে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কোনো সভ্য রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। জনসেবক হিসেবে পুলিশের এই নতুন যাত্রা সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমাতে এবং নাগরিক জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করবে।
সম্পর্কিত সংবাদ

