শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও শিল্পাঞ্চলের চলমান অস্থিরতা নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ। তাঁর অভিযোগ, অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত এবং শিল্পমালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করায় সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চলমান মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন, শিল্প রক্ষা এবং মালিক-শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানাতে জাতীয় শ্রমিক শক্তি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে হান্নান মাসউদ বলেন, তাঁরা কোনো পক্ষের হয়ে নয়, বরং দেশের শ্রমজীবী মানুষ ও সামগ্রিক স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর দাবি, সরকার শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে অতীতের কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতি অনুসরণ করছে।
সরকারের গত নয় মাসের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, দেশ পরিচালনার সুস্পষ্ট পরিকল্পনার পরিবর্তে ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার, দুর্নীতি, লুটপাট, টেন্ডারবাজি এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিরোধী মত দমন ও সমালোচকদের কারাগারে পাঠানোর পরিকল্পনাও সরকারের ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
শিল্পাঞ্চলের সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, পোশাকশিল্প, সার উৎপাদন ও চাল উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের অপরিপক্ক সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে। বারবার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এতে উৎপাদন ও অর্ডার কমার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি
শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিকে যৌক্তিক উল্লেখ করে হান্নান মাসউদ ২০২৩ সালের একটি ঘটনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ওই বছর শ্রমিকরা ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা মজুরির দাবি জানিয়েছিলেন। তখন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও দাবিটিকে যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছিলেন এবং শেখ হাসিনার সরকারকে তা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তাঁর প্রশ্ন, তখন যে দাবিকে যৌক্তিক বলা হয়েছিল, এখন ক্ষমতায় এসে সেটিকে অযৌক্তিক বলা হচ্ছে কেন? ২০২৩ সালের তুলনায় বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কয়েক গুণ বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্য মজুরি নির্ধারণের আহ্বান জানান।
গ্যাস সিলিন্ডার, অকটেন, চাল, ডাল, তেল, ডিম, বিদ্যুৎ ও যাতায়াতের ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব খরচ বিবেচনায় নিয়েই শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে হবে।
উৎপাদন ব্যয় কমানোর পরামর্শ
শ্রমিকদের বেতন বাড়ালে শিল্পমালিকদের লোকসান হবে—এমন যুক্তির বিরোধিতা করেন হান্নান মাসউদ। তাঁর মতে, বন্দরে ঘুষ বাণিজ্য, পরিবহনে চাঁদাবাজি এবং পথে পথে হয়রানি বন্ধ করা গেলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। এতে মালিকদের পাশাপাশি শ্রমিক ও সরকারও উপকৃত হতে পারে।
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অর্ডার ভিয়েতনাম, ভারত ও মালয়েশিয়াসহ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের মজুরি অনেক কম। মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারতের শ্রমিকেরা বাংলাদেশের শ্রমিকদের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেশি বেতন পান বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আন্দোলনে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ সংগঠন বা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি থাকতে পারে—এমন বিষয় পুরোপুরি অস্বীকার করছেন না জানিয়ে হান্নান মাসউদ বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা থাকার পরও বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা কীভাবে অবস্থান করতে পারছে, তা সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে।
তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের গ্রেপ্তার না করে শ্রমিক আন্দোলনে তাঁদের উপস্থিতির দায় শ্রমিকদের ওপর চাপানো হচ্ছে।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে অভিযোগ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ রাখা, পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ এবং যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাদের লাঠিসোঁটা ও অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নামার অভিযোগের বিষয়ে সরকারের জবাবদিহি চান।
মজুরি কমিশনে শ্রমিক প্রতিনিধিত্বের দাবি
মজুরি কমিশনে শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন হান্নান মাসউদ। শ্রমিকদের ওপর লাঠিচার্জ ও গুলি চালানোর পরিবর্তে তাঁদের দাবিগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি সতর্ক করে বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা হলে দেশের বিভিন্ন খাতের মানুষও প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে পারেন। সরকার শ্রমিক, রিকশাচালক ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে এনসিপি তাঁদের পাশে দাঁড়াবে বলেও জানান তিনি।
শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘাতের পরিবর্তে সুসম্পর্ক ও আলোচনার পরিবেশ দেখতে চান উল্লেখ করে তিনি শিল্পমালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে চলমান সংকট সমাধানের আহ্বান জানান।




